পার্বত্য সঙ্কট মূল্যায়ন ও পরামর্শ


atikur-rahman
আতিকুর রহমান
বাংলাদেশ সংবিধান ও পার্বত্য চুক্তি সংকটের অনেকটাই সমাধান করে দিযেছে। বাকিটুকুও সমঝোতা ও সদিচ্ছার উপর নির্ভরশীল। উপজাতীয় পক্ষ অভিযোগ করছেন। চুক্তির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। কিন্তু সরকার পক্ষের উত্তর হলো হচ্ছে এবং হবে। আমরা তৃতীয় পক্ষ ভাবছি সমঝোতা ও মূল্যায়নের অভাবে সময় ক্ষেপণ চলছে।

চলমান সঙ্কটের কিছুটা সাংবিধানিক কিছুটা ভিন্ন মূল্যায়নজাত ও বাকিটা রাজনৈতিক। চুক্তির মুখবন্ধে উভয় পক্ষ একমত হয়ে বলছেনঃ

“বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখিয়া, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমূন্নত এবং আর্থ সামাজিক ও উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব-স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তরফ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীদের পক্ষ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নিম্নে বর্ণিত চারিখন্ড (ক,খ,গ,ঘ) সম্বলিত চুক্তিতে উপনীত হইলেন”।

উপরোক্ত বক্তব্যটি হলো চুক্তির মূলনীতি, যার ভিন্নতা চুক্তি খেলাপি বলে গণ্য হতে বাধ্য। অর্থাৎ খোদ চুক্তিটাই খণ্ডে খণ্ডে ও দফায় দফায় এই মূলনীতি বিরোধী বিধি ব্যবস্থায় পরিপূর্ণ। চুক্তির মূলনীতিভিত্তিক সুফল পেতে হলে সমূদয় ভিন্নতা নির্ণয় ও তার সংশোধন আবশ্যক। এজন্য উভয় পক্ষকে সরল মনে সমঝোতায় আসতে হবে। এই পরিস্থিতিতে এ ভাবা সঠিক হবে না যে, পুনর্বিচার মানে সব অগ্রগতি হারানো, বরং পুনর্বিচার মানে মূলনীতিভিত্তিক অধিক অগ্রগতি অর্জন ও শান্তির পথ প্রশস্তকরণ।

চুক্তি হলো উভয় পক্ষের পালনীয় বাধ্যবাধকতা। এর দোষত্রুটি স্বীকার্য হলে চুক্তি পূর্ব অরাজক পরিস্থিতির পুণরাবির্ভাব ঘটবে তথা কোন পালনীয় বাধ্য বাধকতার অস্তিত্ব থাকবে না, যে অরাজকতা কারো কাছে কাম্য নয়। সুতরাং মূলনীতি ও তার ভিন্নতার বিষয়ে পরিস্কার জ্ঞান থাকা সত্বেও, চুক্তিকারী পক্ষদ্বয় চুক্তি শূণ্যতার দায় নিতে ভীত। তাদের ধারণা সংশোধনকালের সাময়িক চুক্তি শূণ্যতা বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে স্থায়ী রূপ নিতে পারে। এই দায়টা হবে ভয়াবহ।

যেহেতু উভয়েরই শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ আছে, যারা এমন সুযোগের জন্য ওৎ পেতে রয়েছে। চুক্তিকারী পক্ষগণ নিজেরাও মিত্র নয়। ভারতসহ কিছু বিদেশী শক্তির চাপে তারা চুক্তিবদ্ধ। ক্ষমতাসীন পক্ষদ্বয়ের এমন বিরূপ ভাবা দূর্বল চিত্তের পরিচায়ক। আগে দৃঢ়ভাবে ত্রুটিহীন সমঝোতায় উপনীত হতে হবে যার লক্ষ্য হবে উন্নয়ন ও শান্তি এবং তার পক্ষে জনমত গঠন। সংশোধন ও গঠিত জনমত চুক্তি পক্ষীয়দের শক্তি যোগাবে ও প্রতিপক্ষদের দুর্বল করে দিবে। লক্ষ্য অর্জনে উভয়কে মিত্র হতে হবে। দুই অমিত্রের চুক্তি আচরণগত ভিন্নতা ঘোচাতে পারবে না। সরকার পক্ষ চাইছেন উপজাতি পক্ষ আত্মসমর্পন করুন। বিপরীতে উপজাতি পক্ষ ভাবছেন তাদের বিভিন্নমুখী আন্দোলনে ও স্বপক্ষীয় বিদেশী চাপে সরকার নমনীয় হোক। এই বিপরীতমুখী পরিস্থিতিসহ বিদেশ সংশ্লিষ্টতা উভয়কে মীমাংসায় পৌছাতে দিচ্ছে না।

আসলে চুক্তি মুখবন্ধটাই মীমাংসার উত্তম সূত্র। এটির বাস্তবায়ন হলেই দেশ, জাতি ও উপজাতি সবাই কাঙ্ক্ষিত উপকার লাভে সক্ষম হবে। এখানে দ্বি-জাতি তত্ব বাঁধার সৃষ্টি করছে। দ্বি-জাতি তাত্বিক বৈরিতাকে তাই প্রথমেই ঝেটিয়ে তাড়াতে হবে। আর এর প্রধান অস্ত্র হলো বাংলা চরিত্র সঞ্চার।

এখানকার মাটি ও মানুষের ৯৯% ই বাংলা চরিত্র সম্পন্ন। তাই এদেশ বাংলাদেশ নামে ভূষিত। এর ৯৯% মানুষ বাঙ্গালী, এই বাংলা চরিত্র গঠন করেছে বাংলাভাষা, লিপি, সংস্কৃতি, আচার, আচরণ, অভ্যাস ও প্রকৃতি। এখানে প্রকট কোন ভিন্নতা নেই। মাত্র ১০% ভূমি পাহাড় বন ও হ্রদ সম্বলিত, খানেক ভিন্ন প্রকৃতির আকর যা বৃহাদাংশে বসতিহীন জাতীয় সম্পদ। এর ক্ষুদ্রাংশে বাস করে জাতীয় জনতার অবাঙ্গালী লোক, যারা মূলতঃ বহিরাগত এবং সর্বাধিক বৃটিশ আমলের শরণার্থী। এদেরও এক বৃহদাংশ আঞ্চলিক বাংলা ভাষাভাষী এবং সংস্কার, সংস্কৃতি, আচার-আচরণ, অভ্যাস, নাম উপাধি, পোষাক অলংকারে যমজ বাঙ্গালী। এরা চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা নামে অভিহিত। এরা নিজেদের বাঙ্গালী স্বীকার করে না। এই অস্বীকৃতি রাজনৈতিক। আঞ্চলিক ক্ষমতা লাভের লক্ষ্যে এরা প্রতিবেশী অবাঙ্গালীদের সাথে মৈত্রী গড়ে নিয়েছে, যারা ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির ধারক।

‘বাঙ্গালীরা দেশের জনসংখ্যার ৯৯% এবং তারা সবক্ষেত্রে উপজাতিদের চেয়ে অগ্রসর। তাই চাকমাসহ উপজাতিরা প্রতিযোগীতায় সর্বক্ষেত্রে পরাজিত হবে’- এই ভয়ে জুম্মাজাতি সূত্রে ঐক্য গড়ে তুলেছে যাতে তাদের বসবাস ক্ষেত্র পার্বত্য চট্টগ্রামে আধিপত্য ও ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে এবং এই সূত্রে বাংলাদেশে ক্ষমতার অংশীদার হয়ে গুরুত্ব পায়। তাদের এই রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশ কর্তৃক পূরণের ব্যবস্থা হলে, তারা অচিরেই বাঙ্গালী পক্ষ হয়ে যেতে পিছপা হবে না বলে ধারণা করা যায়। আজ তাদের প্রধান মিত্র মারমা বা মগেরা অতীতে প্রধান শত্রুই ছিলো। চাকমা লোক গীতি বলেঃ
“ঘরত গেলে মগে পায়, ঝারত গেলে বাঘে খায়” ইত্যাদি।

বাঙ্গালী চাকমা মৈত্রি এমন একটি অনুকুল সূত্র হতে পারে, যা আস্তে আস্তে চাকমাদের রাজনৈতিক হতাশা কাটাতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উচ্চাশা পূরণে বাঙ্গালী সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পেলে, প্রতিবেশী অবাঙ্গালী সম্পৃক্ততার প্রয়োজন ফুরাবে। তখন বিদ্রোহ আর সন্ত্রাসের কার্যকারিতাও থাকবে না। অসাংবিধানিক পথে আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ, সার্কেল ইত্যাদি বায়বীয় ক্ষমতা কেন্দ্র সৃষ্টি করে অপ্রতিনিধিত্বশীল চেয়ারম্যান, রাজা, মহারাজা বানিয়ে দেয়া অর্থহীন। রাজা, চেয়ারম্যান, অনেকেই আছেন যাদের অস্তিত্ব ঠুনকো। তাদের ক্ষমতার পক্ষে সাংবিধানিক আইনী সংস্থান নেই। এগুলো গণতান্ত্রিক ও প্রতিনিধিত্বশীল নয়, তাই তারা টিকে থাকতে রাজনৈতিক ছলনায় অবতীর্ণ। এরা দেশ ও জাতির প্রতিনিধিত্ব করে না। প্রতিনিধিত্ব এমন একটি ব্যবস্থা যা নেতাদের জনগণের সমর্থন সম্পৃক্ত করে। আর সমর্থন হলো জনসেবা নির্ভর।

এই ক্ষেত্রে হিংসা-বিদ্বেষ, বিদ্রোহ, সন্ত্রাস কোন সুফলই দেয় না। সুতরাং মৈত্রী গড়তে হলে ক্ষমতা প্রত্যাশীদের জাতি-ধর্ম, বর্ণ, সমাজ, সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল সাধারণ মানুষের সমর্থন সম্পৃক্ত হতে হবে। তাতে ভিন্নতা, শত্রুতা ও বিদ্বেষ কাটবে, একতা ও মৈত্রীর সূত্রগুলো জোরদার হবে। বাঙ্গালী অধ্যুষিত দেশ ও সমাজে সমর্থন নির্ভর ক্ষমতা লাভে ভিন্ন মতালম্বীদের আকৃষ্ট হতে বাংলা ভাষা সংস্কৃতি, আচার-আচরণ, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। উগ্র বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তখন হয়ে পড়বে বিচ্ছিন্ন।

পার্বত্য চট্টগ্রামে চুক্তিবদ্ধ ক্ষমতায়নে গণতন্ত্র অনুপস্থিত। সরকারি ইচ্ছা খুশি আর বিদেশী সুপারিশেই পরিষদ গঠন ও ক্ষমতায়ন হচ্ছে। তাতে জন প্রতিনিধিত্ব উপেক্ষিত। এখানে সেবা ও মৈত্রীর স্থান নেই। জনমত ও জন আকাঙ্ক্ষা এই ক্ষেত্রে কোন ভূমিকা রাখতে পারছেনা। সাথে সাথে লঙ্ঘিত হচ্ছে সাংবিধানিক নির্বাচনী ব্যবস্থা। এর ফলে চরিত্র হচ্ছে বিদেশী ও সাম্প্রদায়িক তোষণ নীতি। যার ফলে সুযোগ সুবিধা ও ক্ষমতা বঞ্চিত বাঙ্গালী অধিবাসীরা ক্ষুব্ধ। তারা সরকার ও ক্ষমতাসীন উপজাতিদের কাছে জিম্মি। তাদের এই জিম্মি দশা ভয়ঙ্কর পরিবেশ সৃষ্টি করতে বাধ্য।

তারা দাবি জানাতে প্রস্তুত হচ্ছেঃ আমাদেরও পৃথক ক্ষমতা কেন্দ্র দরকার। রাজা, উজির, চেয়ারম্যান, হেডম্যান আর উন্নয়ন মূলক অর্থ সংস্থান প্রয়োজন। অসাংবিধানিক সাম্প্রদায়িক শাসন ও জিম্মি দশায় আমরা অতিষ্ঠ। এতে দেশ ও জাতি ক্ষতিগ্রস্ত। শান্তি-শৃঙ্খলা আর অখণ্ডতা রক্ষার প্রয়োজনে মৈত্রী ও মানবিক সৌহার্দ্য সৃষ্টি প্রয়োজন যা নির্বাচনী ক্ষমতা চর্চার অবর্তমানে সাম্প্রদায়িক হিংসা, বিদ্বেষ দেশ ও জাতি বিরোধী বিদ্রোহাবস্থার জন্ম দিচ্ছে। দেশ ও জাতির অখণ্ডতার ভিত্তি বাংলাদেশী চরিত্র। এই চরিত্র গঠন ও জোরদারে উপজাতিয়তার কোন ভূমিকা নেই। বিদ্রোহের ভিত্তি হলো এটা।

দ্বিজাতি তত্ত্বে ভারত বিভক্ত হয়েছে। পাকিস্তান দ্বিখণ্ডে পরিণত হয়েছে। এমনি ভিন্নতাকে অবলম্বন করেই বাংলাদেশের বিভক্তিও দ্বি-রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া উঁকি দিচ্ছে। বাংলাদেশের ৫০ হাজার বর্গমাইল বাঙ্গালী প্রধান হলেও তার ৫ হাজার বর্গমাইল অবাঙ্গালী প্রধান। এই চরিত্রগত ভিন্নতা নিয়ে এই দেশ ও জাতি নির্বিরোধ এক দেশ ও এক জাতি হয়ে থাকতে পারে না। এখানে দ্বিজাতিক চরিত্র সম্পন্ন অধিবাসী থাকাটাই বিরোধ বিদ্রোহের হেতু। মহান নেতা শেখ মুজিব এরই সমাধান রূপে ১৯৭৩ সালে রাঙ্গামাটির জনসভায় উপজাতিদের বাঙ্গালী হবার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তৎপর উপজাতিদের আপোসহীন বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় বাধ্য হয়ে বাঙ্গালী জনসংখ্যা বৃদ্ধি আর উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়া অগ্রসর হন।

কিন্তু তখন কারো জানা ছিলো না, প্রধান উপজাতীয় জনগোষ্টি চাকমারা ভাষা সংস্কার সংস্কৃতি, আচার-আচরণ, লেবাস ও অলংকারে বাঙ্গালী হলেও এই পরিচয় দিতে অস্বীকৃত। কেবল সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ পূরণে ব্যর্থ হবে, এই ভয়ে, ভিন্নভাষী উপজাতীয় প্রতিবেশীদের নিয়ে জোট গঠন করেছে। তাদের একতার সূত্র হলো- একটি মাত্র জুম চাষ পেশা যেটি আজকাল বিলীয়মান। শিক্ষা ও উন্নত পেশার বিস্তৃতি, তাদেরকে অচিরে জুমমুক্ত জীবিকা অবলম্বনে আকৃষ্ট করে তুলবে। সে সম্ভাবনা অগ্রসরমান। এই পরিস্থিতিতে বাংলাভিত্তিক চরিত্র চর্চা আর উন্নত জীবনমান গ্রহণে আকৃষ্ট করেই পশ্চাদপদ জুম্মা জীবন পরিহারে তাদেরকে উদ্ভূদ্ধ করা যাবে। তখন বাংলা চরিত্র হবে উন্নত জীবনমান অর্জনের মাধ্যম, সুতরাং আকর্ষণীয়।

আজকাল পাশ্চাত্যের উন্নত দেশসমূহের সমৃদ্ধ জীবনজীবিকা অনুন্নত দেশসমূহের লোকজনকে বিপুলভাবে আকর্ষণ করছে। সেটাই উদাহরণ- হয়ে দাঁড়াবে উন্নত বাংলাদেশে। সুতরাং উপজাতীয় অসন্তোষে হতাশ হবার কিছুই নেই। তাদের আস্থা অর্জনে ব্রতী হওয়া দরকার। এর উপায় হলো দেশ গড়া ও আত্ম উন্নয়ন। বিপুল সংখ্যক উপজাতীয় লোক বিশেষ করে চাকমারা চাকুরী, ব্যবসা, বাণিজ্য বিভিন্ন উন্নত পেশায় নিয়োজিত হয়ে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। তারা উন্নত জীবনযাপনের হাতছানিতে আবদ্ধ। তাদের জন্য জুম্ম জীবন আর আকর্ষনীয় নয়।

আশা করা যায় আগামী ২/৩ পুরুষের ভিতর বাংলাদেশের লোকজনও উন্নত জীবন জীবিকার ছোঁয়া পাবে। তখন তারা বিশেষত: চাকমারা উল্লসিত হবে ও ঘটা করে নিজেদের যমজ বাঙ্গালী পরিচয় দিতে অনীহ হবে না। ইতিহাস বলে, বৃটিশ আমল পর্যন্ত চাকমা অভিজাতরা মুসলিম নাম-খেতাবে ভূষিত হতেন। আজ পর্যন্ত তাদের আভিজাত্যের সূত্র এটাই। অতপর তারা হিন্দু নাম উপাধি ধারণে প্রলুব্ধ হয়েছে। বৃটিশ প্রভূই তাদের খান উপাধির স্থলে হিন্দু রায় উপাধির প্রবর্তক। সুতরাং নতুন পরিচিতিকে স্বাগত জানাতে তারা অভ্যস্ত।

বাংলাদেশ আমলে অন্যায়ভাবে বাংলাদেশীদের দমিয়ে রাখা হয়েছে। উপজাতিদের সমানতালে তাদের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হলে তারাও জমি, বাড়ি, ব্যবসা বাণিজ্য, উচ্চ পদ-পদবীর অধিকারী হতো। তাদের উন্নতিতে উপজাতিরাও উপকৃত হতো। দুই ভ্রাতৃপ্রতিম সমাজের কেউ কারো শত্রু নয়। সংবিধান তাদের সমানাধিকার দিয়েছে। উপজাতীয় পাঁচ দফা দাবীতে বাঙ্গালী বিরোধী কোন অভিযোগ নেই। অভিযোগের সবই সরকার ও সরকারী কর্মকর্তা ভিত্তিক। বাঙ্গালীরা উপাজাতীয় প্রতিপক্ষ নয়। তারা এই উভয়ের দয়া ও করুণার পাত্র।

চাষাবাদ, শিক্ষা-সংস্কৃতি, নির্মাণ কাজ, যাতায়াত, পরিবহন ইত্যাদি উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাঙ্গালীরা তাদের শ্রমদাতা ও পথিকৃত। এমন কোন উন্নয়ন কেউ দেখাতে পারবেনা যা একা উপজাতীয়দের দ্বারা সম্পন্ন হয়েছে। তবু বাঙ্গালীরা কেমন করে শত্রু আর অপ্রিয় হয? সরকারই বাঙ্গালীদের ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে নিজেদের নির্দোষ সাজান। সরকার আর উপজাতি পক্ষই সব ক্ষমতা আদেশ নিষেধ ও উন্নয়ন ক্ষমতার অধিকারী।

বাঙ্গালীরা মোসাহেব করুণা প্রার্থী ও ক্ষমতাহীন। মাত্রকিছু ব্যবসায়ী ও কর্তাভজা ভাগ্যবান ছাড়া সাধারণ বাঙ্গালীরা নিত্য আনে নিত্য খায় এমন দরিদ্র ও অসহায়। এরা অতি নিন্মআয়ের শ্রমজীবী লোক। উপজাতিদের ক্ষতি করার মত ক্ষমতা এদের কোথায়? উপজাতীয় জায়গা-জমি কেড়ে নেয়ার মত কায়িক, আর্থিক ও কৌশলগত শক্তিসামর্থ এদের নেই। সরকারী আবাসনে প্রাপ্ত জায়গা-জমির বন্দোবস্ত ত্রুটিও তাদের নিজেদের সৃষ্ট নয়। তার ও অধিকাংশ এখন তাদের হাত ছাড়া।

কারণ সরকারই তাদের বৈরী উপজাতীয় আক্রমণ থেকে বাঁচাতে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছেন। এরূপ ২৮ হাজার পরিবার এখন প্রায় ৫০ হাজার পরিবারে পরিণত, যাদের জনসংখ্যা এখন আড়াই লাখের অধিক। এদেরসহ মোট পর্বতবাসী বাঙ্গালীদের সংখ্যা ৬/৭ লাখই হবে। কায়িক শ্রম আর ইতর কর্মকাণ্ডেই তাদের জীবিকা নির্বাহ চলে। তাদের ছেলে-মেয়েরা প্রায়ই অভূক্ত থাকে ও লেখাপড়া করে না। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর উন্নত ভবিষ্যতের কোন আশাই নেই। সেই আইউব আমল থেকে এরা বাড়িঘর জায়গা-জমি হারা অনেকাংশে গুচ্ছ গ্রামবাসী।

এদের আবাসন ও পূনর্বাসনের কোন উদ্যোগ নেই। সরকার তাদের খাওয়া-পরা, কর্ম সংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ইত্যাদির দায়িত্ব নিলে গত তিরিশ-পয়ত্রিশ বছরে শক্তিশালী এক জনবল গড়ে উঠা সম্ভব ছিল, যারা দেশ রক্ষা, শান্তি, শঙ্খলা বজায় ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখা সহ নিজেদের জীবন জীবিকার ক্ষেত্রে অবদান রাখতে সক্ষম হতো। পর্বত অঞ্চলের স্বচ্ছল শিক্ষিত বাঙ্গালীরা হতো উপজাতিদের পাশাপাশি এমন এক শক্তি, যাদের উত্যক্ত করাকে উপজাতিরা সমীচিন মনে করত না, বরং তাদের সহায়তা নিতে আগ্রহী হতো। এই বিকল্প পরিবেশ সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি। নইলে অভিযোগ উঠবে, তারা সংবিধান প্রদত্ত অধিকার পাচ্ছে না। বিপরীতে উপজাতিদের একা রাজা, উজির, চেয়ারম্যান, হেডম্যন ইত্যাদি হওয়া দেশ বিভক্তির কারণ হচ্ছে। বিদ্রোহ করেছে উপজাতিরা আর বাঙ্গালীরা করেছে দেশ রক্ষা। এই বাঙ্গালীরা নিরস্ত্র সৈনিক। সুখের কথা চুক্তি মুখবন্ধে নিন্মোক্ত অধিকারগুলো ব্যক্ত হয়েছে, যথা:-

ক) সাংবিধানিক নীতি নির্দেশ অনুসরণ করা হবে।
খ) বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৈৗমত্ব আর অখণ্ডতার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শিত হবে।
গ) পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সকল নাগরিক সহ বাংলাদেশের সকল নাগরিকের রাজনৈতিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত আর্থসামাজিক ও উন্নয়ন প্রক্রিয়া তরান্বিত এবং তাদের স্ব-স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন সাধন করা হবে।
ঘ) পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল অধিবাসী তথা বাঙ্গালী অবাঙ্গালী নির্বিশেষে সবার দায়িত্বপ্রাপ্ত পক্ষ হলো পার্বত্য জন সংহতি সমিতি।

উপরোক্ত অঙ্গীকারের আলোকে, গৃহীত চুক্তিখন্ড দফা সমূহ ও কার্যক্রম বিশ্লেষন করা হলে হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। সিদ্ধান্তসমূহে ব্যাপকভাবে সাংবিধানিক নীতি নির্দেশ অমান্য করা হয়েছে। উদাহরণরূপে বলা যায় আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদ সমূহ গণতান্ত্রিক ও প্রতিনিধিত্বশীল হয়নি। এই ক্ষেত্রে ক্ষমতা হয়েছে উপজাতীয় কুক্ষিগত এবং মনোনয়নভিত্তিক। ১৯৫১ সাল থেকে দেশে সামন্ত ব্যবস্থা বিলুপ্ত, কিন্তু এই পার্বত্য অঞ্চলে হিলট্রাক্ট ম্যানুয়েল ও পার্বত্য চুক্তি বলে, তিন উপজাতীয় রাজা ও হেডম্যান পরিচালিত সামন্ত ব্যবস্থা বহাল আছে। তাতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বীকৃতি অনুপস্থিত।

এখানে সংবিধানের ১,৭,১১ ও ৫৯ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘিত হয়েছে। তৎপর ক্ষমতা কেন্দ্রিক পদায়নে বাঙ্গালী বর্জন প্রক্রিয়া জঘন্য রূপ অসাংবিধানিক, এটি মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। সংবিধানের অনুচ্ছেদ নম্বর ২৬, ২৭, ২৮ ও ২৯ এই ক্ষেত্রে এমনই অলঙ্ঘনীয় যে, প্রতিদন্ধী আইন বা বিধিবিধান নিজ বৈফরিত্ব হারাতে বাধ্য তথা বাতিল হয়ে যাবে। বাঙ্গালীরা ভোট দিতে পারবে কোন পরিষদের চেয়ারম্যান হতে পারবে না। তাদের সদস্য সংখ্যাও এক তৃতীয়াংশের বেশি হওয়া নিষিদ্ধ। তিন উপজাতীয় সার্কেল প্রধান ও ৩৭৩ মৌজার ৯০ শতাংশ হেডম্যান হচ্ছেন উপজাতীয়। এই ক্ষেত্রে বাঙ্গালীরা বেনামী বাধ্য প্রজা।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং-১, তা অনুমোদন করে না। এই ক্ষমতাহীন বাধ্য অনুগত বাঙ্গালী প্রজাদের উন্নয়ন বরাদ্দের অংশ তাদের ভাগ্য উন্নয়নে ব্যায়িত হয় না। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য কর্মসংস্থান ইত্যাদি উন্নয়ন ব্যবস্থা অনেকাংশে শূণ্য। ১০/২০ শতক জায়গার উপর একটি ঝুপড়িতে তাদের বসবাস, যেখানে হাস মুরগি, গরু-ছাগলও থাকে। এই জায়গাটুকুরও বরাদ্দ অধিকাংশের নামে নেই। ক্ষেত কৃষিযোগ্য আরও বেশি জায়গা জমি খুব কম বাঙ্গালীরই আছে। তবুও এরা বাংলাদেশের খুটি। এরা না থাকলে এখানে বাংলাদেশ হয়ে পড়বে সেনা নির্ভর।

দুঃখে দুর্দশায় পার্বত্য বাঙ্গালীদের মনোভাব বদলাচ্ছে, তারা উপজাতীয়দের সাথে জোটবদ্ধ হবার কথা ভাবছে। লক্ষ্য: ভাগ্য পরিবর্তনে উপজাতীদের সমর্থন আদায়। চুক্তিতে উপজাতীয় নেতৃপক্ষ স্থানীয় বাঙ্গালীদের নিজেদের পক্ষ বলেও স্বীকৃতি দিয়েছেন। তারা তাই নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয় মিত্ররূপী ভাগ্য উন্নয়ন প্রত্যাশী হওয়াকেই শ্রেয়: মনে করে। ১৯৭৮ সাল থেকে দীর্ঘদিন যাবৎ তাদের সরকারি মোসাহেবি বৃথা গেছে। এখন চাকমা মোসাহেবি ফলদায়ক হলে তাতে ক্ষতি কী? বিষয়টি উপাজাতীয় রাজনীতিকদের কাছে লোভনীয় হতে বাধ্য।

সরকার কিসের অপেক্ষায় সময় ক্ষেপণ করছেন। উপজাতীয়রা মিত্র হচ্ছে না, তাদের আত্মসমর্থনের আশাও বৃথা। এমতাবস্থায় নিজেদের পক্ষ শক্তি স্থানীয় বাঙ্গালীদের সমর্থন হারানো হবে মারাত্মক। আগামী ২০-৩০ বছরের ভিতর এদের ভাগ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী। নইলে বাঙ্গালী উপজাতি জোট গঠন অনিবার্য। যার লক্ষ্য হবে স্বায়ত্ত শাসন ক্ষমতা লাভ বা তারও কিছু বেশি।
সহায়ক গ্রন্থাবলী
১. পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস ও রাজনীতি- লেখক আতিকুর রহমান।
২. প্রান্তিক উপজাতি ও আদিবাসী- ঐ
৩. পার্বত্য চুক্তি ও ভূমি ঐ
৪. পর্বত প্রকাশ ঐ

আতিকুর রহমান: পার্বত্য গবেষক, গ্রন্থ প্রণেতা

image_pdfimage_print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *