পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন এবং কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন?


এম.  আ ব্দু ল  মো মি ন
পাহাড়ের ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সরকার একটি কমিশন গঠন করেছে যেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালীদের কোন প্রতিনিধিত্ব নেই। অথচ বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে মোট ১৬ লাখ অধিবাসীর মধ্যে প্রায় ৮ লাখের কাছাকাছি অধিবাসী বাঙালি। তাহলে ভূমি নিয়ে বিরোধপূর্ণ দুটি পক্ষের মধ্যে বিরোধ নিস্পত্তির জন্য গঠিত একচোখা! এই কমিশন নিয়ে প্রশ্ন তোলাই স্বাভাবিক। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালীদের সর্ম্পকে সরকারের এই বিমাতাসূলভ মনোভাব পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগণকে অস্বীকারেরই নামান্তর। একই ধরনের বিমাতাসূলভ মনোভাব ছিল ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তিতেও।

পার্বত্য এলাকায় সর্বক্ষেত্রে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার দিয়ে করা ওই চুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামে কতটা শান্তি এনেছে তা সবারই জানা। উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার দিয়ে করা পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০১৩ তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতায় সংঘাত, হানাহানি বৃদ্ধি করবে এটা একজন অবোধ শিশুরও বুঝবার কথা কিন্তু দূঃখের বিষয় হচ্ছে আমাদের আইন প্রণেতারাই কেবল তা বোঝেননা অথবা বুঝেও না বোঝার ভান করেন। প্রশ্ন হচ্ছে তারা আসলে চান কি? বিরোধ নিস্পত্তি করতে, না বিরোধ সৃষ্টি করতে? জটিলতা কমাতে, না জটিলতা বাড়াতে? সংঘাত-হানাহানি প্রশমন করতে, না তা আরো উস্কে দিতে?
সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদন হওয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন অনুযায়ী কমিশনে তিনজন উপজাতীয় প্রতিনিধি রাখা হলেও বাঙালি কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। সংশোধিত আইন অনুযায়ী ইতোপূর্বে বাঙালিদের কাছে বন্দোবস্ত দেওয়া জমি নিয়েও নতুন জটিলতা তৈরি হবে। আইনটি বাতিলের দাবিতে পার্বত্য জেলাগুলোতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে বাঙালীদের বিভিন্ন সংগঠন। ৩ জুন মন্ত্রিপরিষদে আইনটি পাস হওয়ার আগের দিন ২ জুন পার্বত্য তিন জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করে পার্বত্য বাঙালি ছাত্রপরিষদ (পিবিসিপি) ও ‘সমঅধিকার আন্দোলন’। এর আগে গত ২৭ মে এই আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়ার পর ৩০ মে একই দাবিতে সড়ক ও নৌ-পথ অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়। একই দাবিতে তিন পার্বত্য জেলায় গত রবিবার থেকে ৭২ ঘণ্টার সর্বাত্দক হরতাল কর্মসূচি গতকাল শেষ হয়েছে। বাঙালিদের পাঁচটি সংগঠন এই হরতালের ডাক দেয়। উপজাতীয়দের স্বার্থ রক্ষার একপেশে আইনটি বাতিলের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠছে পার্বত্য জনপদ।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ সমস্যা শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের মূল বাঁধা হওয়ায় এর সমাধানে সরকার ইতোমধ্যে চারটি ভূমি কমিশন গঠন করে। কিন্তু কমিশনই ভূমি বিরোধের নিস্পত্তি করতে পারেনি। ভূমি কমিশনকে আরও কার্যকরী করতে সরকার ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১ এর ১১টি সংশোধনী এনে ৩ জুন মন্ত্রিপরিষদে চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দেয় যা মূলত পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ কর্তৃক প্রস্তাবিত। সংশোধনীগুলো অনুমোদিত হওয়ার পর পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে এবং ভবিষ্যতে কঠোর কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি উপজাতি নির্বিশেষে সবার ন্যায্য ভূমির অধিকার নিশ্চিত করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার বিষয়টি সর্বশেষ সংশোধনীতে উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিদ্যমান ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১ অনুযায়ী কমিশনের মোট সদস্য সংখ্যা পাঁচজন। এর মধ্যে তিনজন সদস্যের পদ উপজাতীয়দের জন্য সংরক্ষিত এবং অপর দুজন সদস্যের মধ্যে একজন হলেন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে সুপ্রিমকোটের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও অপরজন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার বা তার মনোনীত একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার। এক্ষেত্রে কমিশনের বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামোতে মোট পাঁচজন সদস্যের মধ্যে উপজাতীয়দের জন্য তিনটি সদস্যপদ সংরক্ষিত থাকলেও বাঙালিদের কোনো প্রতিনিধি নেই। তাছাড়া কমিশনের চেয়ারম্যান এবং চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার বাঙালি হবেন এরও কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। সে কারণে বর্তমান বাস্তবতায় যেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক বাঙালি সেখানে ভূমি কমিশনের সংগঠনে বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় তাদের ভূমির অধিকার সংরক্ষিত হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়াই স্বাভাবিক।

তাছাড়াও সংশোধনী অনুযায়ী কমিশনের সচিব এবং অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এতে কমিশনের বিদ্যমান সাংগঠনিক কাঠামোতে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একদিকে উপজাতীয়দের স্বার্থ শতভাগ সংরক্ষিত রাখা এবং বাঙালিদের স্বার্থ পুরোপুরি উপেক্ষিত হবে এটা হলফ করে বলা যায়, কেননা একজন উপজাতীয় কখনোই বাঙালীদের প্রতিনিধি হতে পারবেন না। তাছাড়া ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন এবং রীতির কথা বলা হয়েছে। প্রচলিত আইনে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত উপজাতীয়দের ভূমি অধিকারের ক্ষেত্রে রীতির কোনো সুনির্দিষ্ট আওতা এবং ব্যাখ্যা নেই। সেক্ষেত্রে উপজাতি সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং বাঙালি প্রতিনিধিত্ববিহীন ভূমি কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে রীতি শব্দটির অপব্যাখ্যা এবং অপপ্রয়োগ হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।

সংশোধনীতে ভূমি কমিশনের কার্যসীমার কলেবর বাড়িয়ে পুনর্বাসিত শরণার্থীদের (ভারতে পালিয়ে গিয়ে শান্তি চুক্তির পর ফিরে আসা) ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে অবৈধ বন্দোবস্ত ও বেদখল হওয়া ভূমি এবং জলেভাসা ভূমিসহ যে কোনো ভূমিকে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। এর ফলে গত চার দশকে বাঙালিদের কাছে বন্দোবস্ত দেওয়া জমির বৈধতা নিয়েও অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা সৃষ্টি হবে এবং যে কোনো ভূমি শব্দটি যুক্ত হওয়ার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় ব্যবহৃত ভূমি অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। তাছাড়া সংশোধিত ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০১৩ এর বিধিমালা তৈরির কাজ ভূমি মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত হলেও এর খসড়া তৈরির দায়িত্ব পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হয়েছে। এতে বিধিমালা তৈরির প্রাথমিক কাঠামোতে বাঙালি এবং উপজাতি উভয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সমভাবে সংরক্ষণের ব্যাপারে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব প্রেক্ষাপটে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১ এর সংশোধনী বাস্তবায়ন হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিদের ভূমির অধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার মধ্য দিয়ে ভূমি-সংক্রান্ত সংঘাত-সহিংসতা আরো বেড়ে যাবে।

কিন্তু মন্ত্রিপরিষদে আইনটি অনুমোদন হওয়ার পর সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা সাংবাদিকদের জানান, ‘আইনটি সংশোধনে পার্বত্য এলাকা নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। সব মহলের বক্তব্য বিবেচনা করেই এই সংশোধনী আনা হয়েছে। এতে পাহাড়ি ও বাঙালি উভয়ে উপকৃত হবেন।’ কিন্তু মাননীয় সচিব মহোদয় কি একবারও চিন্তা করেছেন বাঙালি প্রতিনিধিহীন এই কমিশন দ্বারা কিভাবে বাঙালিরা উপকৃত হবেন? আর যদি সব মহলের বক্তব্য বিবেচনা করেই এই কমিশন গঠন করা হয় তাতে অর্ধেক জনগোষ্ঠীর কোন প্রতিনিধিত্ব কেন রাখা হলোনা তা বোধগম্য নয়। কমিশনে বাঙালির কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই, সাংগঠনিক কাঠামো, সচিবসহ অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগেও উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা আছে। স্বাভাবিকভাবেই এই কমিশন যখন সিদ্ধান্ত নেবে সেটা উপজাতীয়দের পক্ষেই যাবে। এ অবস্থায় বাঙালিরা জমি হারিয়ে পথে বসতে বাধ্য হবেন। তাছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব দুজনই উপজাতি সম্প্রদায়ের লোক! তাহলে বাঙালিদের আস্থার জায়গাটা কোথায় থাকলো?

 ♦ লেখক পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারী কর্মকর্তা

3 thoughts on “পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন এবং কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন?

  1. পার্বত্য চট্টগ্রামে ভুমির বিষয়টি আপনি যেভাবে লিখেছেন তা অত্যন্ত হাস্যকর।

    • Kon part ta hassokor Mr. Rizang bolben ki? Bhumi birod nispottir jonno equal participation dorkar setai ami bolte chesta koresi, anyway thanks for your patience reading my article

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *