পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি নিয়ে যত কথা

%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%9c%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%b2-%e0%a6%ae%e0%a7%8b%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%a6-%e0%a6%86%e0%a6%b2

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.)

গত ২ ডিসেম্বর ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির ১৯তম বর্ষপূতি। এদিন রাজধানীতে বেশ কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন অনুষ্ঠানে চুক্তির বাস্তবায়ন সম্পর্কে বক্তাদের কাছ থেকে কিছু মিশ্র, আবার কিছুটা বিপরীতমুখী কথাবার্তা ও মন্তব্য শোনা গেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পক্ষে চুক্তি স্বাক্ষরকারী জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা বলেছেন, সরকার প্রত্যাশা ও বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এনজিও ব্যবসায়রত দুয়েকজন আরও একটু বিপ্লবী কথাবার্তা বলেছেন। একজন বলেছেন, এই সরকারের চুক্তি বাস্তবায়নের কোনো রাজনৈতিক সদিচ্ছা নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামকে উপনিবেশ বানানোর পাঁয়তারা চলছে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে চুক্তির বেশিরভাগ ধারাই বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং বাকি অংশও দ্রুত বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চলছে।

প্রথমপক্ষের কথার মধ্যে উসকানিমূলক উচ্চারণ, অতিরঞ্জন এবং স্পষ্টত বাড়াবাড়ি লক্ষ্য করা যায়। আর সরকার পক্ষের অবাস্তবায়িত অংশের দ্রুত বাস্তবায়নের কথায় কতটুকু আস্থা রাখা যায় সে প্রশ্নটিও স্পষ্টভাবেই মানুষের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। কারণ, মানুষ মনে করে সরকার ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তিসংক্রান্ত আইনের সংশোধন এবং প্রয়োজনীয় বিধিমালা আরও দ্রুত করতে পারত। চুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং ১৫টির আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে বলে তথ্য বিবরণী থেকে জানা যায়।

তবে অসন্তোষের মূল জায়গা অর্থাৎ ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণেই মূলত বিতর্কের সৃষ্টি এবং পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আসছে। ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পূর্বের আইনটি ইতিমধ্যেই সংশোধন করা হয়েছে এবং তা পার্লামেন্টে পাস হয়ে গেছে। সংশোধিত আইনটি অধিকতর গণতান্ত্রিক এবং বাস্তবায়ানুগ হয়েছে বিধায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে বলে জানা গেছে। কিন্তু আইনের বিধিমালা না হওয়ায় ভূমি কমিশন এখনো কার্যক্রম শুরু করতে পারছে না। বিধিমালা দ্রুত প্রণয়ন করে সরকারকে সদিচ্ছার প্রমাণ রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত একটা প্যাগমেটিক ও ইউনিক শান্তিচুক্তি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অন্য কোনো দুরভিসন্ধির কবলে যাতে না পড়ে সে জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

এ কথা সবাই জানেন বাংলাদেশের একটি বড় রাজনৈতিক পক্ষ এই চুক্তির বাস্তবায়ন চায় না। শুধু চায় না বললে কম বলা হবে, তারা অপকৌশলে এই চুক্তি যাতে ব্যর্থ হয় সে প্রচেষ্টাই চালাচ্ছে। তাছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্তিকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি বহু সুবিধাভোগী এনজিও এবং অন্যান্য গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছে, যারা নিজেদের এনজিও ব্যবসা অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য চুক্তির বাস্তবায়ন ঝুলন্ত অবস্থায় রাখতে চায়। কারণ, চুক্তি পরিপূর্ণ বাস্তবায়িত হলে অনেকেরই এনজিও ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হবে এবং মোটা অঙ্কের মাসোয়ারা আর পাওয়া যাবে না।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্বের ভূরাজনৈতিক দুরভিসন্ধি এখন আর কারও অজানা নয়। পূর্বতিমুর এবং দক্ষিণ সুদানের কথা আমাদের সদা স্মরণে রাখতে হবে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ২১ বছরের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত এবং রক্তক্ষরণের অবসান ঘটে। শুধু তাই নয়, ছোট রাষ্ট্র বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে সব ধরনের হুমকি ও আশঙ্কা থেকে আমরা মুক্ত হই। এটা বাংলাদেশের জন্য বিশাল অর্জন। ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মাত্র দেড় বছরের মাথায় এত বড় একটা জাতীয় প্রাণঘাতী সমস্যার সমাধান, তাও আবার অন্য কোনো তৃতীয়পক্ষের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া, এটা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল উদাহরণ।

তাছাড়া শেখ হাসিনা সবেমাত্র প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার জন্য এটা ছিল বিরাট অগ্নিপরীক্ষা। তবে বাবা বঙ্গবন্ধুর মতো দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসার শক্তির বলেই শেখ হাসিনা এতবড় রাজনৈতিক সাহস দেখাতে পেরেছেন বলে মানুষ মনে করে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দুয়েকটি সশস্ত্র বিদ্রোহের ইতিহাস ও তার পরিণতির দিকে তাকালে বোঝা যায় কী অসাধ্য শেখ হাসিনা সাধন করেছেন। বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সশস্ত্র সংগ্রামেরত বিদ্রোহী সংগঠনের নাম দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার ফার্ক, অর্থাৎ রেভিউলুশনারি আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়া।

দীর্ঘ ৬০ বছর পর এই সবেমাত্র ২০১৬ সালে এসে কিউবার মধ্যস্থতায় গত ২৫ আগস্ট প্রথমবার তারা কলম্বিয়ান সরকারের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে। কিন্তু সরকার চুক্তিটিকে গণভোটে দিলে কলম্বিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভোটে তা বাতিল হয়ে যায়। দ্বিতীয়বার পুনরায় গত ২৪ নভেম্বর উভয়পক্ষের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এবার আর গণভোটে না দিয়ে পার্লামেন্ট থেকে অনুমোদন নিয়ে কলম্বিয়ান সরকার সেটি চূড়ান্ত করেছে। চুক্তির বাস্তবায়ন এখনো শুরু হয়নি।

তবে এর স্থায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্লেষকদের যথেষ্ট রিজার্ভেশন রয়েছে। আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কার কথা আমরা জানি। ১৯৭৫ সালে জন্ম হয় এলটিটিই নামের সশস্ত্র সংগঠনের, যার পূর্ণ নাম লিবারেশন অব তামিল টাইগারস ইলাম। শ্রীলঙ্কার উত্তর-পূর্ব তামিল জাতিগত মানুষের অধ্যুষিত অঞ্চলকে স্বাধীন করার উদ্দেশ্যে এলটিটিই পুরাদমে সশস্ত্র অভিযান শুরু করে ১৯৮৩ সালে। বিভিন্ন দেশের মধ্যস্থতায় এলটিটিই এবং শ্রীলঙ্কা সরকারের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা ব্যর্থ হয়, কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব হয় না। তারপর ২০০৯ সালে এসে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী একতরফা সর্বাত্মক সেনা অভিযান চালায়।

তাতে ব্যাপক সংখ্যক বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির মধ্য দিয়ে এলটিটিইর পরাজয় ঘটে এবং আপাতত শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের অবসান হয়। কিন্তু বিশ্বের সব অঙ্গন থেকে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের সিরিয়াস অভিযোগ ওঠে এবং সেখানে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করেছে বলে বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থা থেকে দাবি উত্থাপন করা হচ্ছে। তাছাড়া বিদ্রোহ যে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

তাই বিশ্বের অন্যান্য স্থানের সশস্ত্র বিদ্রোহের সমাধান ও মীমাংসার সঙ্গে তুলনা করলে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরের শান্তিচুক্তি বাংলাদেশের জন্য অসাধারণ সাফল্য। এই চুক্তির গুরুত্ব এবং অনন্যতার জন্যই শেখ হাসিনা ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কার পান। চুক্তি যারা বাস্তবায়ন করবেন এবং এ বিষয়ে যারা উচ্চবাচ্য করেন তাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে কোনো চুক্তিই রাষ্ট্রের সব পক্ষকে সন্তুষ্ট করতে পারে না।

১৯৭৮ সালে মিসর-ইসরায়েল ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি স্বাক্ষর করার ফলে মিসর ১১ বছর পর সম্পূর্ণ সিনাই অঞ্চল আবার ফেরত পায়। মিসরের জন্য এটা ছিল বিরাট অর্জন। মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এবং ইসরায়েল প্রধানমন্ত্রী বেগিন ১৯৭৮ সালে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। কিন্তু ১৯৮১ সালে চুক্তিবিরোধী একজন চরমপন্থির গুলিতে আনোয়ার সাদাত নিহত হন। প্রায় একই রকম ঘটনা ঘটে ১৯৯৩ সালে পিএলও এবং ইসরায়েলের মধ্যে অসলো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর। চুক্তি স্বাক্ষরকারী ইয়াসির আরাফাত এবং ইসরায়েল প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইমন পেয়ারস, তিনজন সম্মিলিতভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।

১৯৯৫ সালে চুক্তিবিরোধী একজন চরমপন্থি ইহুদির গুলিতে আইজ্যাক রবিন নিহত হন। সবাইকে ইতিহাস এবং সমসাময়িক ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। চুক্তির দ্রুত বাস্তবায়ন আবশ্যক। দিন যত যাবে ততই আরও বহুরকম স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সৃষ্টি হবে। চুক্তির ১৯ বছরের মাথায় এসে বলা যায় সমঅধিকার নিশ্চিত করার জন্য এবং পিছিয়ে পড়া জায়গা থেকে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে উপরে তোলার জন্য সরকার যথেষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশাসনিক সুবিধা তৃণমূল পর্যন্ত বর্ধিতকরণসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক সুযোগ ও সম্প্রসারণ সম্ভব হয়েছে শান্তিচুক্তির ফলে।

১৯ বছর আগের পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং বর্তমানের পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে পার্থক্য সহজেই সবারই চোখে ধরা পড়ে। তাই ভূমি সমস্যার মতো একটা অত্যাবশ্যকীয় এবং চুক্তির জটিল অংশ বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় সমাধানের পথকে আরও পিচ্ছিল করে দিতে পারে, এমন উসকানিমূলক কথাবার্তা থেকে সবারই বিরত থাকা উচিত। ১৯৭৬ সালে সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এমন অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোকে উল্টিয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনার বাস্তবসম্মত কোনো পথ এখন আর খোলা নেই। কয়েক লাখ বাঙালি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করছে।

প্রথমদিকে এটি যেভাবে ঘটেছে তা সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের পথ পরিক্রমায় এটা এখন কঠিন বাস্তবতা। এই বাঙালিদেরও মানবাধিকার রয়েছে এবং সমঅধিকার পাওয়ার হক আছে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে বাস্তবতা এবং চুক্তির মূল স্পিরিট পাহাড়ি-বাঙালি সবারই সমঅধিকারের বিষয়টিকে প্রধান বিবেচ্য ধরে অ্যাকোমোডেটিভ ও ইনক্লুুসিভ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিতে হবে। কোনো পক্ষকেই একটা খুঁটির ওপর হাত রেখে গো ধরে বসে থাকলে চলবে না।

ভূমির অধিকার প্রশ্নে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী অবশ্যই অগ্রাধিকার পাবেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের উচিত হবে সংশোধিত ভূমি কমিশন আইন অনুসারে দ্রুত বিধিমালা তৈরি করা এবং ভূমি কমিশনকে কার্যকর করা। ভূমি সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে বাকি যা থাকে তাতে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে আর কেউ পানি ঘোলা করতে পারবে না। একটা চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ১৯ বছর অবশ্যই দীর্ঘ সময়। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের বাস্তবতা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশি-বিদেশি চক্রের ষড়যন্ত্রের কথাও ভুলে গেলে চলবে না। সব পক্ষ ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিলে শান্তিচুক্তির আগামী বর্ষপূর্তিতে সব পক্ষ একমঞ্চে বসে তা পালন করতে পারবে।

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

sikder52@gmail.com, নিউ অরলিনস, ইউএসএ

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন