পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনা-বাঙ্গালী প্রত্যাহার ও খ্রিস্টান অঞ্চল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন

সুকুমার বড়ুয়া

নৈস্বর্গিক সৌন্দর্য্য ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর বাংলাদেশের এক দশমাংশ পার্বত্য চট্টগ্রামে কারা থাকবে, কারা থাকতে পারবে না, তার ভাগ্য নির্ধারনের ইজারা যে বিদেশী প্রভূরা নিয়ে রেখেছে তা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক কথিত আন্তর্জাতিক কমিশনের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে স্পষ্ট প্রতীয়ামান হয়েছে। অলিখিত চুক্তির দোহাই দিয়ে পার্বত্যাঞ্চলকে বাঙ্গালী শূন্য করার যে দাবী এতদিন যাবৎ সন্তু বাবুদের মুখে শুনে আসছিলাম, বর্তমানে চুক্তি বাস্তবায়নের এমন ক্ষণে শুনছি, বিদেশী কূটনীতি ও রাজনীতিবিদদের মুখে। অবশ্য পাহাড় থেকে বাঙ্গালী বিতাড়নে সিএইচটি কমিশন ষড়যন্ত্রের নতুনমাত্রা যোগ করেছে। তাহলো, বাঙ্গালীরা স্বেচ্ছায় পার্বত্য চট্টগ্রাম না ছাড়লে তাদের কে দেয়া সরকারি রেশনসহ যাবতীয় সুযোগ সুবিধা বন্ধ করে দিতে হবে। (সূত্র দৈনিক ইনকিলাব)। কমিশনের  ধারণা, এতে বাঙ্গালীরা স্বেচ্ছায় পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে চলে যাবে। 

সমস্যা আমাদের, মাথা ব্যাথা তাদের। আমাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়ে বিদেশী এ সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙ্গালীদেরকে বহিস্কার করতে সরকারের কাছে যে ফর্মূলা উপস্থাপন করেছে তা আমরা ১৫ বছর পূর্বেই ১৯৯৮ সালে লেখনির মাধ্যমে পার্বত্যবাসীকে অবগত করেছি।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমেই দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে অবাধে চলাফেরার লাইসেন্স পায়। তারা সুকৌশলে  বাঙ্গালী ও দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উচ্ছেদ করার মাধ্যমে তাদের এ দেশীয় দোসরদের নিয়ে (যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজাকারের ভূমিকা পালন করেছিল) খ্রিস্টান অধ্যুষিত অঞ্চল বানানোর মিশনি রূপরেখা অনুযায়ী এরাই চুক্তির দীর্ঘ ১ দশকের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে কারা থাকবে, কারা থাকতে পারবে না।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা যেমন পুরাতন, তেমনি কঠিন। এই সমস্যা আমাদের, সমাধানও আমাদেরকে করতে হবে। কিন্তু অবাক লাগে তখন, যখন দেখি দেশে জনপ্রিয় গণতান্ত্রিক সরকার থাকা সত্ত্বেও আমাদের সমস্যার বিষয়ে সমাধানের পথ বের করতে ইউরোপের কোন দেশে বিদেশী মিশনারীদের বৈঠক হয়। বিগত ২০০৮ সালের ৩১ মে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত বিশেষজ্ঞদের সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের ১২ জন সদস্য নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন গঠন করা হয়। এ কমিশন জাতিসংঘের দায়িত্বশীল কোন সংস্থা নয় কিংবা বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে গঠিত কোন সংগঠনও নয়। আমাদের এই ভূ-খণ্ডের প্রাকৃতিক-খনিজ সম্পদ গ্রাস করতে এরা এ অঞ্চলের  মানুষদের নিয়ে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে অতি উৎসাহ দেখিয়ে মূলতঃ এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। এদের সাংবিধানিক কোন অধিকার না থাকলেও এরা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে নাক গলাচ্ছে।

সিএইচটি কমিশন তাদের এ দেশীয় দোসরদের নিয়ে বিভিন্ন সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করেছেন। এইসব সফরে মূলতঃ স্থায়ী শান্তি স্থাপনের বিপরীতে অশান্তির বীজ বপন করা হয়েছে। অবশ্য তারা সরকারের নিকট বেশ কিছু সুপারিশও তুলে ধরেছে। সরকারের নিকট প্রেরিত এইসব সুপারিশমালায় সিএইচটি কমিশন উল্লেখ করেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙ্গালীরা অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করছে। এই দূর্ভোগ লাঘবে বাঙ্গালীদের পার্বত্যাঞ্চলের বাইরে পুনর্বাসন করা গেলে তাদের এই অসহনীয় দুঃখ কষ্টের পরিসমাপ্তি ঘটবে। সেই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর লোকসংখ্যার চাপ হ্রাস পাবে। অবশ্য এই ক্ষেত্রে বাঙ্গালীরা স্বেচ্ছায় পার্বত্য চট্টগ্রাম না ছাড়লে রেশনসহ তাদের সকল সুযোগ সুবিধা বন্ধ করে দিতে হবে। সেনা প্রত্যাহারেও তাদের রয়েছে শক্ত অবস্থান। তাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার, পার্বত্য অঞ্চল থেকে বাঙ্গালী শূন্য ও সেনা প্রত্যাহারের মাধ্যমে এখানকার অঞ্চলের খনিজ সম্পদ গ্রাস করাসহ এই অঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিজেদের আয়ত্বে এনে এই অঞ্চলকে খ্রিষ্টান অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করা। যে মিশনে এরা ইতিমধ্যে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। ইতিমধ্যে হাজার হাজার চাক্মা, মারমা, ত্রিপুরা সহ  পাংখো, বোম, লুসাই, চাক, তঞ্চাগ্যা, খুমি, মুরং ও খিয়াংসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-তান্ত্রিক উপজাতীয় জনগোষ্ঠি খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে। বান্দরবান জেলায় পাংখো, বোম, লুসাই সম্প্রদায়ের অধিকাংশ লোক ইতোমধ্যে ধর্মান্তরিত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে হাজার হাজার উপজাতি তাদের নিজস্ব ধর্মীয়, সামাজিক কৃষ্টি, সভ্যতা, সংস্কৃতির অস্তিত্ব বিলিয়ে দিয়ে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করছে। ফলে তাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস ঐতিহ্য বিলীন হয়ে যাচ্ছে নিরবে। অনেক এনজিও উপজাতীয় তরুণদের খ্রিষ্টান ধর্মে এনে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য অষ্ট্রেলিয়া, সুইডেন, কোরিয়া, ফ্রান্স, চীন, জাপান, নরওয়ে, থাইল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠাচ্ছে। এছাড়া তিন পার্বত্য জেলায় একাধিক হাসপাতাল, ক্লিনিক, ছাত্রাবাস, ছাত্রীনিবাস, লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষা উপকরণ বিতরণের মাধ্যমে  বিভিন্ন বয়সের উঠতি উপজাতীয় ছেলে-মেয়েদেরকে খৃষ্ঠান ধর্ম গ্রহণে আকৃষ্ট করছে।

সূত্রমতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক  এনজিও তৎপরতা চট্টগ্রাম, ফটিকছড়ি, মিরসরাইয়ের উত্তরাংশে (খাগড়াছড়ি সংলগ্ন) পটিয়া, কক্সবাজার, চকরিয়া, ফেনীর পরশুরাম ও কুমিল্লার কিছু অংশে বিস্তৃতি লাভ করেছে। এছাড়া দেশের অন্যান্য রাজ্যেও খ্রিষ্টান মিশনারীদের কাজ চলছে। এরা বার্মার পার্বত্য সীমান্তবর্তী বিপুল এলাকা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী এ অঞ্চলকে নিয়ে উপজাতীয় খৃষ্টানদের একচ্ছত্র আধিপত্য তথা খ্রিস্টান রাজ্য প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র করছে বলে অনেকে মত প্রকাশ করেছেন। উল্লেখ্য,  যে দেশে গেরিলা যুদ্ধ রয়েছে সে দেশের গেরিলা তৎপরতা পরিচালনায় তাদের অস্ত্র, অর্থ সরবরাহ ঘটনাও নতুন নয়। ইতিমধ্যে ভারতের অনেক গেরিলা গোষ্ঠি এই ফাঁদে পড়ে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে।

পার্বত্য এলাকায় জুম্মল্যান্ড গঠন, ভারতের ৭টি রাজ্যে স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা ও বার্মার বিস্তৃর্ণ পার্বত্য সীমান্তবর্তী এলাকা নিয়ে এ বিশাল অঞ্চলকে খ্রিস্টান অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার ষড়যন্ত্র অনেক আগের। সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে পার্বত্য অঞ্চলে  বেশকিছু এনজিও  খ্রিষ্টান মিশনারী  তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে বলে নানা সময়ে অভিযোগ উঠেছে। এসব  এনজিও  গুলোর বিরুদ্ধে অধিক মুনাফার বিনিময়ে ঋণ কার্যক্রম, উপজাতীয়দেরকে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিতকরণ, পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের গেরিলা তৎপরতায় সহযোগিতা প্রদান, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিষোদগার, সাম্প্রদায়িক উস্কানী, উপজাতীয়দের প্রতি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপপ্রচার, রাজনৈতিক অস্থিশীলতা সৃষ্টিসহ নানা ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য এলাকায় হু হু করে অনেক এনজিও এসে আস্তানা গেড়েছে। পূর্ণাঙ্গ খ্রিষ্টান অঞ্চল বানাতে চুক্তি বাস্তবায়নের এমন সময়কে এরা মোক্ষম সময় হিসেবে বেছে নিয়ে ষড়যন্ত্রের নানা ডালপালা বিস্তার করছে।

এসব তথ্য পাওয়ার পর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এনজিওগুলোর নিকট আর্থিক ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব ও  এনজিওগুলোর নিয়ন্ত্রণহীন কার্যকলাপ রোধে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। সরকার বা দেশের মানুষ জানতে পারছে না কোথায় কিভাবে এ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। বিলম্বে হলেও সরকারের এই সুমতি উদয় হওয়ায় পাহাড়বাসীর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। বিদেশী মিশনারীরা সন্তু লারমার কাতারে বসে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিজেদের আকাক্ষা বাস্তবায়নে এরা কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করছে। অন্যদিকে, চুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে ইউ.এন.ডি.পিসহ বিদেশী এ সমস্ত দাতা সংস্থা ও মিশনারীরা তিন পার্বত্য জেলায় ব্যাপক মোটিভেশন ওয়ার্ক চালাচ্ছে। আমাদের সমস্যা নিয়ে বিদেশীদের অযাচিত হস্তক্ষেপসহ তাদের দেখানো পথ ধরেই যেন চলতে হচ্ছে আমাদের। তাদের ষড়যন্ত্রমূলক  সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে আমাদের উপর। এতকিছুর পরও সরকারের কোন কার্যকর প্রতিবাদ নেই।

 বাংলাদেশ পরাধীন কোন রাষ্ট্র নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম এই দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশের এক দশমাংশ অঞ্চল। সাংবিধানিক অধিকার মতে, এইখানে যারা বসবাস করছে তারা প্রত্যেকে স্বাধীন দেশের নাগরিক। পার্বত্যাঞ্চলের মানুষ যেমন ঢাকাসহ সমতলের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করার অধিকার রাখেন ঠিক অনুরূপভাবে সমতল অঞ্চলের মানুষও এখানে বসবাস করার অধিকার রাখেন। দেশের এই অবিচ্ছেদ্য অংশের মাটি ও মানুষের আভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে তাদের মাথা ঘাঁমানো কতটুকু কুটনৈতিক শিষ্ঠাচারের মধ্যে পড়ে তা ভেবে দেখা দরকার  ? তাদের জানা থাকা উচিত, পাহাড়ের কোন পোষ্যপুত্র নেই। এখানে পাহাড়ী-বাঙ্গালী যারাই বসবাস করছে প্রত্যেকেই কোন না কোনভাবে এখানে এসেছে। কেউ এসেছে জুম চাষ করতে, আবার কেউ এসেছে পুনর্বাসিত হবার স্বপ্নে। তবে কেউ আগে- কেউ পরে, তফাৎ শুধু এখানেই। তাদের এ দেশীয় দোসর, এনজিও মার্কা সুশীল সমাজ নামধারী যাদেরকে নিয়ে এখান থেকে বাঙ্গালী খেঁদানোর ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে তা এখনি বন্ধ করা উচিত। তা না হলে এদেশের মুক্তিকামী মানুষ তা সমুচিত জবাব দিতে আগেও ভুল করেনি, ভবিষ্যতেও ভুল করবে না। বীর বাঙ্গালীরা পার্বত্যাঞ্চলে পুনরায় জেগে উঠলে তারা পালিয়ে যাবার পথ খুঁজে পাবেন না। কমিশনের জানা উচিত পার্বত্যাঞ্চলে কাউকে রেখে, কাউকে তাড়িয়ে দিয়ে এখানে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা হবে অলীক স্বপ্ন মাত্র, যা কখনোই বাস্তবায়ন হতে পারে না।

পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হবার থেকে সাবেক গেরিলা নেতা সন্তু লারমারা দাবি করে আসছে এই অঞ্চল থেকে সেনা শাসন ও বাঙ্গালীদেরকে বহিস্কার করতে সরকারের সাথে তাদের অলিখিত চুক্তি হয়েছে। সেই অলিখিত চুক্তির বলেই এদের প্রভূরা বিদেশের মাটিতে বসে চুক্তি বাস্তবায়নের নামে বাঙ্গালীদের ভাগ্য নিয়ে নানা ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙ্গালীদের নিয়ে যেতে হবে। সন্তু লারমাদের এই ধরনের দাবীর প্রেক্ষিতে চুক্তি সম্পাদনকারী তৎকালীন সরকার বর্তমান মহাজোট সরকার একাধিকবার বলেছেন, অলিখিত চুক্তি নামে কোন চুক্তি হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙ্গালী উচ্ছেদ করার প্রশ্নেই উঠে না। তবে শান্তি চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়নের প্রশ্নে পাহাড়ী-বাঙ্গালীদের নানা বিষয় নিয়ে সরকারের অবস্থান এখনও পরিস্কার নয়। শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের নামে বাঙ্গালী প্রত্যাহারে এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সন্দেহ অবিশ্বাসের যে বাসা বেঁধেছিল তা এখনও বলবৎ রয়েছে। দাতা সংস্থা কিংবা বিদেশী প্রভূ যাই-ই বলিনা কেন তাদের চাপে হোক কিংবা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেরর জন্যই হোক সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র ৬ মাসের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে  দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীদের তৎপরতা বন্ধ এবং স্বায়ত্বশাসনের নামে গেরিলা তৎপরতা, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, হত্যা, রাহাজানি রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিয়ে তড়িঘড়ি করে চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করায় এ অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে নতুন করে সন্দেহ  অবিশ্বাসের জন্ম হয়েছিল। অন্যদিকে, চুক্তি বাস্তবায়নের মোক্ষম সেই সময়কে বেছে নিয়ে বিদেশী মিশনারীরা ব্যাপক সোচ্ছার হয়ে উঠেছিল। যদিও  তাদের সেই সব স্বপ্ন পুরণ হয়নি।

সন্তু লারমা ও সিএইচটি কমিশনের উদ্দেশ্যে বলব, পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন জনগোষ্ঠিকে পুর্নবাসন, আবার কোন জনগোষ্ঠিকে উচ্ছেদ করে এতদাঞ্চলের স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কোন ভাবেই সম্ভব নয়। বরং যে কোন সময়ের তুলনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আরও বেশি বিস্ফোরণ মূখর হয়ে উঠবে। আপনারা যদি মনে করেন,  উস্কানীমূলক বক্তব্য দিয়ে পাহাড়ী-বাঙ্গালীদের মধ্যে দাঙ্গা সৃষ্টি করে সকলের নজর ঘুরিয়ে ফায়দা হাসিল করবেন তা ভুলে যান। আপনার মনে থাকা উচিত ১৯০ বৎসর বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৪৭ সালে মধ্য আগস্টে আপনার দেশ ব্রিটেন এদেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। তবে আমরা এখনও নিশ্চিত যে, এদেশের প্রতি বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে অনাবিষ্কৃত থাকা থাকা প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদসহ এ অঞ্চলের মাটির প্রতি তাদের লোলুপ দৃষ্টি, এদেশবাসীকে শাসন-শোষণ করার নেশা এখনও কাঁটেনি। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাবাহিনী ও বাঙ্গালী বিতাড়িত করে উপজাতীয়দেরকে খ্রিস্টান ধর্মের দীক্ষা দিয়ে পার্বত্যঞ্চলকে নিরাপদ খ্রিস্টান অঞ্চল বানানোর চক্রান্ত অব্যাহত রেখেছে।

 

পার্বত্য শান্তি চুক্তির মাধ্যমে বিদেশীরা নানা মিশন নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত জনপদে অবাধে চলাফেরার লাইসেন্স পেয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিদেশী ইউ.এন লগো লাগানো গাড়ীতে চড়ে এন্টেনা ও শক্তিশালী ওয়ার্লেস সেট লাগিয়ে এরা নিজেদের মিশন বাস্তবায়নে পার্বত্যাঞ্চলের প্রত্যন্ত দূর্গম জনপদ চষে বেড়াচ্ছে। বলা হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান পরিস্থিতির কারণে এই অঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠি উন্নয়ন, আধুনিকতার ছোঁয়া থেকে অনেক দূর পিছিয়ে রয়েছে। তাই পিছিয়ে পড়া এই সব জনগোষ্ঠির আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের কথা বলে অর্থ্যাৎ আমাদের মাথা বিক্রি করে বিদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আনা হয়েছে। পার্বত্যাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের নামে তাদের মিশন বাস্তবায়নে এই সব অর্থ ব্যয় হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শুনেছি, আগামী বছর ইউএনডিপির দ্বিতীয় পর্যায়ের উন্নয়ন কাজ শেষ হবে। কি কাজ করেছে, কোথায় করেছে, কার জন্য করেছে তাদের কিছুই জানে না পার্বত্যবাসী। এমনকি স্থানীয় প্রশাসনও এদের মিশন সম্পর্কে তেমন কোন খোঁজ খবর রাখেন না। দেশী-বিদেশী এসব  এনজিওগুলোর কাজের মনিটরিং করার দায়িত্ব পার্বত্য জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসনের। জেলা প্রশাসন মাস শেষে এনজিওদের নিয়ে সমন্বয় সভা করলেও তাদের কর্মকা- নিয়ে তেমন কোন বিতর্কে জড়াতে চান না। তবে ইউএনডিপিসহ দাতা সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময়ে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অযাচিত হস্তক্ষেপ করে আমাদের উন্নযনে যেমন বাঁধা সৃষ্টি করছে, একইভাবে তারা যে উন্নয়নের কথা বলছে তা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে। অনেকের মতে, পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান স্থানীয় সংসদ সদস্যদেরকে  কোটি কোটি টাকার বিলাসবহুল বিদেশী গাড়ী উপহার দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

আমাদের মাথা বিক্রি করে যেসব টাকা বিদেশ থেকে আনা হয়েছে  সেই টাকায় কাদের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়েছে, তা পাহাড়ের মানুষ জানে না। তবে, এটা নিশ্চিত যে, বিদেশী এবং তাদের এ দেশীয় দোসরদের উন্নয়ন ছাড়াও আর কারও উন্নয়ন হয়েছে বলে মনে হয় না। এরা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না, পুনর্বাসিত বাঙ্গালীদের কল্যাণে দীর্ঘ বা স্বল্প মেয়াদী কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে বা তাদের কল্যাণে কোন  টাকা ব্যয় করেছে। তবে মাঝে মধ্যে উপজাতীয় অধ্যূষিত এলাকায় স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহসহ কয়েকটি মৌলিক ইস্যুতে কাজ করতে দেখেছি।  তাতেও পাহাড়ীদের ভাগ্যের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি, জয় করতে পারেনি দারিদ্রতাকে। যে পরিমাণ টাকা বিদেশীরা এখানে ব্যয় করেছে বলে দাবী করছে তার শত ভাগের একভাগও যদি সঠিকভাবে কাজে লাগতো তাহলে পার্বতাঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠিকে চরম দারিদ্র সীমার নীচে বসবাস করতে হতো না। মূলত বিদেশীরা তাদের এ দেশীয় দোসরদের নিয়ে খ্রিস্টান অঞ্চল বানানোর পিছনে আনীত অর্থ ব্যয় করে যাচ্ছে।

এই অঞ্চলে বাঙ্গালীসহ বিভিন্ন উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলো কিভাবে বসতি স্থাপন করেছে তা কারও অজানা নয়। ১৯৮০-৮১ সালে তৎকালীন সরকার সমতল জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের নদীভাঙ্গা ভূমিহীন, দিন মজুর, অসহায় দুঃস্থ পরিবারগুলোকে এনে সরকারী  খাস ভূমিতে যেখানে হিংস্র জীবজন্তু বসবাস করত সেখানে পুনর্বাসন করা হয়। এই পুনর্বাসনের কয়েক বছর যেতে না যেতেই শান্তিবাহিনী নামক উপজাতীয় গেরিলারা  সরকারের উপর প্রতিশোধ নিতে পুর্নবাসিত বাঙ্গালীদের উপর চালায় অত্যাচারের ষ্টীম রোলার। কোলের শিশু থেকে শত বছরের বৃদ্ধ পর্যন্ত রেহাই পাইনি তাদের ব্রাশ ফায়ার থেকে। অনেককে দেয়া হয়েছে জীবন্ত কবর, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে করা হয়েছে ধর্ষণ। তাদের অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা এতই ভয়াবহ ছিল যে, পাকিস্তানীদের শোষনকেও হার মানিয়েছে। ফলে সরকার বাধ্য হয় বাঙ্গালীদেকে স্ব-স্ব বসতভিটা, বাগান বাগিচা থেকে তুলে এনে গুচ্ছগ্রাম নামক বন্দী শিবিরে আটক করতে। সেইখানেও হামলা থামেনি। চুতর্দিকে নিরাপত্তা বেষ্টনী সৃষ্টি করে ছোট্ট গুচ্ছগ্রাম নামক বন্দী কুটিরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে শুরু হয় গুচ্ছগ্রামবাসীদের জীবন-জীবিকা। মাস শেষে ৮৫  কেজি সরকারি খয়রাতি রেশন ব্যতীত গত ৩০ বছর যাবত ৮৬টি গুচ্ছগ্রামে ২৬,২২০ পরিবার (বর্তমানে কয়েকগুণ) প্রায় লক্ষাধিক বাংলা ভাষাভাষি লোকের  ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। তাদেরকে পুনর্বাসনে নেয়া হয়নি সরকারী কোন উদ্যোগ। তাদের জন্য ব্যয় হয় না দেশি বিদেশী কোন অর্থ। পূর্ন নাগরিক সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত এসব গুচ্ছগ্রামবাসীরা প্রত্যেক সরকারের সময়ে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। তাদের পুনর্বাসনের স্বপ্ন দেখানো হলেও বাস্তবে এর বিন্দুমাত্র প্রতিফলন নেই। তাই বঞ্চিত অসহায় এসব গুচ্ছগ্রামবাসীরা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে, দারিদ্রতার চরম কষাঘাতে প্রয়োজনীয় সাহায্য সহযোগিতা ছাড়াই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বেড়ে উঠছে। এদের হারাবার আর কিছুই নেই, আর যাদের হারাবার কিছুই থাকে না তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আর যাই হোক টিকে থাকা যায় না। তাই সিএইচটিসকমিশনসহ বিদেশী দাতা সংস্থাগুলোর  উদ্দেশ্যে বলব, সন্তু লারমাদের সুরে সুর না তুলে যে মানব সেবার কথা বলে পার্বত্য চট্টগ্রামে আস্তানা গেড়েছেন সেই কাজে মনোনিবেশ করুন।  এতে আমার আপনার তথা পার্বত্যবাসীর মঙ্গল হবে।

লেখক: সংবাদকর্মী,খাগড়াছড়ি।