পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই দশক উপলক্ষে পার্বত্যবাসীর প্রতিক্রিয়া নিয়ে পার্বত্যনিউজের সাক্ষাৎকার প্রতিবেদন-১



২ ডিসেম্বর ২০১৭, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি তথা শান্তিচুক্তির দুই দশক পূর্তি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বহুল আলোচিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে সমাজে বহুল বিতর্ক রয়েছে। কারো মতে চুক্তির সাফল্য গগনচুম্বি আবার কারো মতে, চুক্তির ব্যর্থতা পর্বত প্রমাণ। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই দশক উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের প্রতিক্রিয়া নিয়ে পার্বত্যনিউজের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার প্রতিবেদনের আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পার্বত্যনিউজের রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি নুরুল আমিন।

অস্ত্রবাজ কিছু সন্ত্রাসী এখানকার শান্তি বিনষ্ট করছে- ফিরোজ বেগম চিনু এমপি

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে মনোনীত নারী সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনু বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মানুষের জীবন-মান উন্নয়নের বিশাল ভূমিকা রেখেছে। পার্বত্য এলাকায় সবদিক দিয়ে উন্নয়ন হয়েছে। একটি সময় ছিলো শহর থেকে বের হতে নির্দিষ্ট সময় নিয়ে চলতে হতো। বর্তমানে রাতদিন যাতায়াত করতে পারছে মানুষ।

তিনি আরো বলেন,  চুক্তির পর শান্তি এসেছে, তবে অস্ত্রবাজ কিছু সন্ত্রাসী এখানকার শান্তি বিনষ্ট করছে। প্রত্যেকের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। কিন্তু পাহাড়ি-বাঙালির সর্ম্পকের উন্নয়ন হোক সেটা কেউ কেউ চায় না। তবে একটা সময় আসবে সর্ম্পককে ফারাক করেও রাখতে পারবে না। চুক্তির আগে মানুষ বিবদমান পরিস্থিতিতে ছিলো। চুক্তির পর ভালো আছে।

চুক্তির অসংগত ধারাগুলো সরকারের দ্রুত সংশোধন করা উচিৎ- অনুপম বড়ুয়া শংকর

বাংলাদেশ কমিউর্নিস্ট পার্টি’র রাঙ্গামাটি জেলা সাধারণ সম্পাদক অনুপম বড়ুয়া শংকর বলেন, আসলে শান্তিচুক্তি হওয়ার পর পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যে যে আশা-ভরসা জেগে উঠে ছিলো তা সংঘাত এবং বিরাজমান পরিস্থিতির কারণে প্রতিফলিত হয়নি। শান্তি চুক্তির বিশ বছরের মধ্যে যে আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিলো তা প্রতিফলিত হয়নি । কিন্ত চুক্তির অসংগত ধারাগুলো সরকারের দ্রুত সংশোধন করা উচিৎ।

সরকার যাদের  সাথে  চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলো তাদের মাঝে দুরত্বের কারণে পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে সর্ম্পকের কোনো উন্নতি প্রতিফলন হয়নি। আমি মনে করি, পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি এবং বাঙালি উভয়ই বঞ্চিত। শান্তিচুক্তির আগে তো পরিস্থিতি খারাপ ছিলো, এটা তো সবাই মানবে। কারণ তখন তাদের একটি সশস্ত্র দল ছিলো এবং সরকারে অপারগতার কারণে অবস্থা খারাপ ছিলো।

পাহাড়ে দ্বিগুণ অশান্তি বেড়েছে- ডা. গঙ্গা মানিক চাকমা

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সিনিয়র সদস্য ডা. গঙ্গা মানিক চাকমা বলেন, শান্তিচুক্তি আমাদের জীবন-মান উন্নয়নে তেমন ভূমিকা রাখছে না, বর্তমান সরকার চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করার কারণে।

চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে গত বিশ বছরে বরং পাহাড়ে দ্বিগুণ অশান্তি বেড়েছে। যেমন- লোক দেখানো উন্নয়ন, িসেনাবাহিনীর একক কর্তৃত্ব, দলীয়করণ, দুর্নীতি, ভূমি বিরোধ, সাম্প্রদায়িকতা, অন্য জেলা থেকে লোক এনে অবাধে তিন পার্বত্য জেলায় পুনর্বাসন। তিন জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের সাথে সমন্বয় না করার কারণে দুর্নীতি বাড়ছে। এর প্রধান কারণ হলো সরকারি দলের আন্তরিকতার অভাব।

শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে সর্ম্পকের কোনো উন্নতি হয়নি। কারণ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পাহাড়ি-বাঙালিদের মধ্যে সর্ম্পক ভালভাবে গড়ে উঠেনি বরং সন্দেহ, অবিশ্বাস ও দুরত্ব সৃষ্টি হয়েছে।

শান্তিচুক্তির ফলে আইনশৃংখলা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকুরী, ব্যবসা, জীবনের নিরাপত্তা, ভূমি অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। আজ চুক্তি যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হতো পাহাড়ে আর কোন অশান্তি থাকতো না; বরং পাহাড়ি এবং স্থায়ী বাঙালিদের মধ্যে সর্ম্পক সু-গভীর হতো।
শান্তিচুক্তির পূর্বে ও পরের অবস্থা একই। কোন পরির্বতন আসেনি পাহাড়ে, বরং অশান্তি বেড়ে গেছে।

শান্তিচুক্তির ২০ বছরেও পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়নি- জাহাঙ্গীর আলম মুন্না

পার্বত্য চট্টগ্রাম সম-অধিকার আন্দোলন এর রাঙামাটি জেলা সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম মুন্না বলেন, শান্তিচুক্তির পূর্বশর্ত ছিলো পার্বত্যাঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে শান্তিচুক্তির ২০ বছরেও পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়নি। বরং অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি, খুনসহ নানা অপকর্মের কারণে পাহাড় বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। যেখানে চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র আছে, সেখানে মানুষের অর্থনৈতিক জীবন-মান উন্নয়নের প্রশ্নই ওঠে না। যদি পাহাড়ে কয়েকটি আঞ্চলিক দলের চাঁদাবাজি বন্ধ করা যায় তাহলে পাহাড়ের মানুষের ব্যবসা এবং অর্থনৈতিক জীবন-মান উন্নয়ন করা সম্ভব বলে আমি মনে করি।

শান্তিচুক্তির পর গত ২০ বছরে পাহাড়ে কোন শান্তি আসেনি। বরং আগের চেয়ে অশান্তি বেড়েছে। এখানে বিভিন্ন জাতিসত্তার মধ্যে পরস্পারিক সন্দেহ, অবিশ্বাস বেড়ে গেছে।

শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর আমরা আশা করেছিলাম পাহাড়ি-বাঙালি মিলেমিশে বসবাস করবে। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে সর্ম্পক নিয়ে তৈরি হয়েছে অবিশ্বাস, সৃষ্টি হয়েছে দুরত্ব, বেড়ে গেছে চাঁদাবাজি, খুন ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী অপকর্ম।

শান্তিচুক্তির ফলে পার্বত্যাঞ্চলে এখানকার একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে। পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদে চেয়ারম্যান পদটি একটি জনগোষ্ঠীর জন্য নির্দিষ্ট এবং পার্বত্যাঞ্চলের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মানুষের পক্ষে সেখানে নির্বাচনে অংশ নেয়ার কোন সুযোগ নেই। তাই ন্যূনতম ভারসাম্য তৈরির জন্য বঞ্চিত বৃহত্তর জনগোষ্ঠির সদস্যদের জন্য একটি ভাইস-চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। তাছাড়া আমি মনে করি, পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসরত সকল মানুষকে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরি, শিক্ষা এবং সবকিছুর ক্ষেত্রে সমান অধিকার প্রদান করা প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *