parbattanews bangladesh

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীঃ নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দোষী

মাহের ইসলাম

২৬ মার্চ ২০০৬ তারিখে অ্যামেরিকান স্পেশাল ফোর্সের একটি ব্যাটালিয়নের সদস্যের সাথে মিলে ইরাকি স্পেশাল ফোর্স সদস্যরা মাহদি আর্মির সাথে এনকাউন্টারে লিপ্ত হয়। ইরাক যুদ্ধের অন্য আর দশটা অপারেশনের মতই, এটি ছিল অত্যন্ত গতানুগতিক ও সাদামাটা একটি অপারেশন – মাহদি আর্মির সদস্যদের ট্রাক করে, তাদের কম্পাউন্ডে ঢুকে ১৬ – ১৭ জনকে হত্যা করা হয়, বন্দি করা হয় ১৭ জনকে, একটি ওয়েপন ক্যাশে খুঁজে বের করে সেটাও ধংস করা হয় এবং একজন গুরুতর আহত একজন বন্দিকে উদ্ধার করে সবাই ঐ কম্পাউন্ড থেকে নিজেদের বেস ক্যাম্পের দিকে রওয়ানা দেয়। ইরাক যুদ্ধের এই অতি সাধারণ এবং গতানুগতিক একটি এনগেজমেন্ট পরবর্তীতে দুনিয়ার তাবৎ সংবাদ মাধ্যমে স্থান করে নেয়। প্রশ্ন উঠতেই পারে, কিভাবে বা কেন?

আমেরিকানরা ঐ জায়গা থেকে চলে যাওয়ার পরে মাহদি আর্মির পালিয়ে যাওয়া সদস্যরা ফিরে এসে ঘটনাস্থলকে পরিষ্কার করে এবং মৃত সহযোদ্ধাদের অস্ত্রগুলো সরিয়ে এমনভাবে ছবি তুলে ও ভিডিও করে; যা দেখে যে কেউ মনে করবে, কিছু নামাজরত মুসুল্লিকে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি তারা একটা প্রেস রিলিজও এই ছবিগুলোর সাথে আপলোড করে দেয়; যেখানে বলা হয় যে, মসজিদে ঢুকে নামাজরত মুসুল্লিদেরকে ঠাণ্ডা মাথায় অ্যামেরিকানরা হত্যা করেছে। এই ভিডিও এবং ছবিগুলো ইন্টারনেটের কল্যাণে সবার নজরে পড়ে।সন্দেহাতীতভাবে, আরবী এবং ইংরেজী সংবাদ মাধ্যমগুলো এটি লুফে নেয় এবং স্বাভাবিক ভাবেই অতি দ্রুত সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি, এই অপারেশনে অংশ নেয়া সেনা সদস্যরা তাদের বেস ক্যাম্পে ফিরে বিস্তারিত রিপোর্ট করার আগেই ছবিগুলো ভাইরাল হয়ে যায়।

কপাল ভালো যে, ঐ অপারেশনে অংশ নেয়া সৈনিকদের হেলমেটে ক্যামেরা থাকায় এবং তাদের সাথে ‘ক্যামেরা ইউনিট’ থাকায় পুরো ঘটনার ভিডিও করা ছিল। এরপরও প্রায় তিন দিন ধরে অ্যামেরিকানরা চেষ্টা চালায় শুধু মাত্র সত্য ঘটনাটুকু মিডিয়াতে তুলে ধরার জন্যে। আরো ভয়াবহ বিষয় হলো, এই ঘটনার ব্যাপারে খুব কম লোকই তাদের কথা বিশ্বাস করে। এমনকি, ইউএস আর্মি প্রায় মাসব্যাপী এক তদন্ত চালাতে বাধ্য হয়, যার পুরো সময়টা ঐ ব্যাটালিয়নের সৈনিকদের কোন অপারেশনে অংশ নিতে দেয়া হয়নি।

ঠিক একই ভাবে মিডিয়াতে আসল সত্য আড়াল করে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে ভিন্ন কিছু প্রকাশ করা, মিথ্যে বলা বা মিডিয়াকে ইচ্ছেমতো ব্যবহারের উদাহরণ বাংলাদেশেও পাওয়া যাবে। তবে অন্যদেরকে হেয় বা বিব্রত করা, বিপদে ফেলা, বড় ধরনের সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং এমনকি রাষ্ট্র বিরোধী প্রচারণার উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি উদাহরণ আমাদের দেশে সম্ভবত পার্বত্য চট্টগ্রামেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। সত্যি বলতে কি, পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘটনাবলি নিয়ে এত বেশি মিথ্যাচার করা হচ্ছে যে, শুধুমাত্র উল্লেখ করলেও এই মিথ্যের তালিকা অনেক অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। তাই, ইচ্ছে করেই একই ধরণের কয়েকটি ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসছি, যা বহুল আলোচিতও বটে।

যারা পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘটনাবলির উপর নজর রাখেন, তারা সকলেই ইতি চাকমার হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি নিশ্চয় ভুলে যাননি। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখ রাতে খাগড়াছড়ি শহরের আরামবাগ এলাকার বাসায় সরকারি কলেজের ছাত্রি ইতি চাকমার গলা কাটা মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দেয় দুলাভাই অটল চাকমা। হত্যাকাণ্ডের অব্যবহিত পরেই শুরু হয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস বর্জন, কালো ব্যাজ ধারণ, মানববন্ধন, আলোচনা সভা, প্রতিবাদ মিছিল ইত্যাদি যা শুধু খাগড়াছড়িতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং ছড়িয়ে পরেছিলো ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানেও।

বিশেষ করে, সোশ্যাল মিডিয়াতে বাঙ্গালিদের দায়ী করে প্রচুর পোস্ট ছড়িয়ে পরে। একদম শুরু থেকেই কোন রকমের বাছ বিছার না করেই, এ হত্যাকাণ্ডের জন্যে বাঙালীদের দায়ী করে ফেসবুকে উস্কানিমূলক পোস্ট দেয়া শুরু হয়। হাস্যকর হলেও সত্যি যে, এক বাঙালির সাথে ইতি চাকমার কিছু ছবি ফেসবুকে দিয়েও এ ঘটনার সাথে বাঙ্গালিদের দায়ী করা হয়।

এখানেই শেষ নয়, অনলাইনে এমন দাবিও করা হয় যে, ইতি চাকমাকে গণ ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং এই হত্যাকাণ্ডের জন্যে ‘বাঙালী মুসলিম স্যাটেলার’রা দায়ী। আরো দাবি করা হয় যে, “বাংলাদেশ ধর্ষণ ও জবাইকারীদের দেশ। এর আগেও অনেক আদিবাসী নারীকে বাঙালী মুসলিম স্যাটেলাররা গণধর্ষণ ও জবাই করে হত্যা করলেও তার কোনো বিচার হয়নি।” বাঙ্গালিদের কপাল ভালো যে, পুলিশ ইতি চাকমার খুনি তুষার চাকমাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে এবং সে স্বীকার ও করেছে যে, কোন বাংগালী নয় বরং ৫ জন চাকমা যুবক এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

ঠিক একই রকম আরো অনেক ঘটনা আছে। ইতি চাকমার ঘটনার মত লম্বা বর্ণনাতে না গিয়ে বরং সংক্ষিপ্ত ভাবেই সামনে নিয়ে আসি। এখানে বালাতি ত্রিপুরার কথা উল্লেখ করা যায়। খাগড়াছড়ির পানছড়ির বালাতি ত্রিপুরাকে খুনের দায়ে তিন বাঙ্গালিকে দোষারোপ করে শুরু হয় বাঙালি বিদ্বেষী প্রচারণা। পরে জানা যায়, কোন বাংগালি এই খুনের সাথে জড়িত নয় বরং এই খুনের মূল নায়ক কার্বারী সাধন ত্রিপুরা নামের এক পাহাড়ি।

বিশাখা চাকমার নাম হয়ত অনেকে ভুলে গিয়ে থাকতে পারেন। রাঙ্গামাটির এক শো রুমের বিক্রয়কর্মী, কাজ শেষে বাসায় যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয় এবং পরবর্তীতে কাপ্তাই হ্রদে তার বস্তাবন্দি লাশ পাওয়া যায়। যথারীতি শুরু হয় বাঙ্গালিদের দায়ি করে প্রচারণা-সমাবেশ-মানববন্ধন। যার সমাপ্তি ঘটে তখনি, যখন প্রমাণিত হয় যে, তার স্বামীর উপস্থিতিতে অন্য পাহাড়ি দুষ্কৃতিকারীরাই তাকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছে।

বান্দরবানের রোয়াংছড়ির বাঙালি কাঠুরিয়া মুসলিম উদ্দিনকে পাহাড়িরা পিটিয়ে মেরেই ফেলে। কারন, মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে দিয়ে প্রমাণ করাতে পারেনি যে, ব্র্যাক এনজিওর আনন্দ স্কুলের শিক্ষিকা উ প্রু মারমাকে সে ধর্ষণ করেনি, হত্যা করাতো দুরের কথা। অথচ, পরবর্তীতে বিজয় তঞ্চঙ্গ্যা নামের একজনের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়।

সবিতা চাকমার কথা অনেকের মনে আছে। খাগড়াছড়ির কমলছড়িতে নিজ বাড়ির পাশের ক্ষেতে তার লাশ পাওয়া গিয়েছিল। এরপর যথারীতি শুরু হয় বাঙ্গালী বিদ্বেষী প্রচারণা। বাঙালি ট্রাক ড্রাইভার আর হেলপার কর্তৃক গণধর্ষিত হয়ে সে মারা গেছে – এমন দাবি তুলে পাহাড়িরা ব্যাপক প্রচারণা, প্রতিবাদ, মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ করে। অথচ, ময়নাতদন্ত ও সুরতহাল রিপোর্টে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

প্রশ্ন উঠতে পারে, পুলিশ যদি ইতি চাকমার আসল খুনিকে ধরতে না পারতো, তাহলে আজীবন পাহাড়ের বাঙ্গালীদের এই হত্যার দায় বয়ে বেড়াতে হতো কিনা? যেমনটি হচ্ছে, কল্পনা চাকমার নিখোঁজ হওয়া নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে। ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় এটা পরিষ্কার অনুমেয় যে, তৎকালীন ভোটের রাজনীতি আর চির প্রচলিত পাহাড়িদের অন্তর্দ্বন্দ্বের বলি কল্পনা চাকমা। যেমনটি ঘটেছে আরো অনেক পাহাড়ি যুবকের ভাগ্যে, এমন কি এম এন লারমা ও রেহাই পায়নি। এখনো হচ্ছে – মিথুন চাকমা যার সর্বশেষ উদাহরণ। অথচ এ ধরণের যে কোন ঘটনাতেই বাঙ্গালিদের অথবা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দায়ী করা হয় চিরাচরিত নিয়মের মতো – যতক্ষণ প্রকৃত সত্য না বের হয় ততক্ষণ পর্যন্ত এ দু গোষ্ঠীই দায়ি। ‘Guilty Until Proven Innocent’ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ আর কি হতে পারে?।

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো- উপরের ঘ্টনাসমূহের তদন্তে যখন স্বজাতির সদস্যদের নাম তদন্তে প্রমাণিত হয় তখন কিছু এই সব সোচ্চার উপজাতীয় সংগঠনগুলো খামোশ মেরে দেখেও না দেখার ভান করে চুপটি মেরে থাকে। এখানে উল্লেখ্য যে, এ সকল সাম্প্রদায়িক ও সেনা বিদ্বেষী প্রচারণার সাথে সাধারণ পাহাড়ী জনগণের কোনো সম্পর্ক ও সম্পৃক্ততা কোনো কালেই ছিল না। এ সব বিষয় নিয়ে সব সময় মাঠ গরম করে থাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী পাহাড়ী সংগঠনগুলো ও তাদের সমর্থকেরা।

পার্বত্য চট্টগ্রামে আসল ঘটনা আড়াল করে, সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু উপস্থাপন করা নতুন কিছু নয়। কিছু পাহাড়ি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী অনেকদিন ধরেই এমনটি করে আসছে। এমনকি লংগদুর ঘটনাতেও বরিশালের ও টঙ্গীর অগ্নিকাণ্ডের ছবি এবং গাইবান্ধার সাঁওতাল পল্লীর ছবি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে– দেশে এমনকি বিদেশে পর্যন্ত। এই ধরনের ভিন্ন উপস্থাপনায় অনেকেই বিভ্রান্ত হয়েছেন, এখনো হচ্ছেন। একই ধারাবাহিকতায়, গত দুইদিন আগে বিলাইছড়িতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা নিয়ে প্রায় অনুরূপ নীলনকশা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে ইতোমধ্যেই।

বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণ্যে ইতিমধ্যেই সেনাবাহিনীর দুই জওয়ানকে দোষী সাব্যস্ত করে বিচারের দাবিতে মিছিল শুরু হয়ে গেছে। ঘোষণা আসছে আরো কর্মসূচীর। পূর্বের মতোই এখন দেশবাসীর অপেক্ষার পালা, কখন প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসবে আর কখন পাহাড়ি অপকর্মকারিদের গোমড় ফাঁস হবে?

অন্যদিকে, এই লেখার শুরুতে বর্ণিত Operation Valhalla এর মতোই আমেরিক্যান আর্মির পরিবর্তে এখন বাংলাদেশ সেনাবাহীনিকে প্রমাণ করতে হবে যে, তাদের সৈনিকেরা নিরাপরাধ।

তবে বাস্তবতা হল, সেনাবাহিনী যদি তদন্তও করে এবং তদন্ত করেই যদি প্রমাণিত হয়, বিলাইছড়িতে ধর্ষণের কোন ঘটনা ঘটেনি বরং এটি  পাহাড়ের কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর অপপ্রচারণা; তখন কি সবাই এই কথা বিশ্বাস করবে? আমরা কি্‌, শুরুতে বর্ণিত ঘটনায় অ্যামেরিকানদের কথা বিশ্বাস করেছিলাম?

নির্মম সত্য হল, প্রকৃত সত্য বের করে দেশবাসী বা বিশ্ববাসীকে তা জানানোর আগেই পাহাড়িরা এই উদ্দেশ্য প্রণোদিত সংবাদকে ভাইরাল করবে ওয়েব সাইটের কল্যাণে। এর প্রতিবাদে ইতি চাকমা, বালাতি ত্রিপুরা, বিশাখা চাকমা, উ প্রু মারমা বা সবিতা চাকমার ঘটনার মতো করেই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস বর্জন, কালো ব্যাজ ধারণ, মানববন্ধন, আলোচনা সভা, প্রতিবাদ মিছিল, স্মারকলিপি প্রদান ইত্যাদি চলতে থাকবে যা ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানেও ছড়িয়ে পড়তে পারে – এমনকি দেশের বাইরেও। এর সাথে আমাদের সমাজের অনেক সম্মানীয় ব্যক্তিও দুই-চারটা বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে দিতে পারেন- উনাদের সহমর্মিতা প্রকাশ করা বা অন্য কোন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য।

আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অনুরোধ তারা যেন, দ্রুত বিলাইছড়ির ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচন ও অপরাধীদের খুঁজে দেশবাসীকে প্রকৃত সত্যের মুখোমুখি করতে সক্ষম হয়। একই সাথে এ ঘটনাকে পূঁজি করে কোনো অপশক্তি যেন পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, সম্প্রীতি, সহাবস্থান ও আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে সক্ষম না হয় সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক ও গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।