parbattanews bangladesh

পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্থনৈতিক অবকাঠামো স্থাপনের সম্ভাব্যতা ও প্রভাব

পারভেজ হায়দার:
বাংলাদেশের প্রায় এক দশমাংশ এলাকা জুড়ে অবস্থিত পার্বত্য জেলাসমূহে প্রায় ১২টি ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী এবং বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর বসবাস। এ অঞ্চলের মানুষগুলোকে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হিসাবে মনে করা হয়। অনগ্রসর এই জনগোষ্ঠীকে দেশের অন্যান্য এলাকার জনগণের সমপর্যায়ে আনার জন্য সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা ও উৎসাহব্যঞ্জক পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ও পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচীর পাশাপাশি দেশী/বিদেশী এনজিও সমূহের অংশগ্রহণ এই অঞ্চলের অধিবাসীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সচল রাখতে সহায়তা করছে।

শত প্রতিকূলতার মাঝেও গুচ্ছগ্রামে বসবাসরত বাঙ্গালী এবং ভারত প্রত্যাগত উপজাতি শরণার্থীদের জন্য সরকার নিয়মিত রেশন প্রদান ও অন্যান্য সহায়তা করে যাচ্ছে। পার্বত্য এলাকার ভূমি দেশের অন্যান্য এলাকার মত নয়। পার্বত্য এই ভূখন্ডের শুধুমাত্র শতকরা একভাগ জমি পাহাড়সমূহের মাঝে অবস্থিত সমতল, ২% জমি সামান্য উঁচু, ৫% জমি স্বল্প উঁচু পাহাড়ের ভ্যালী এবং ৯২ ভাগ জমি উঁচু এবং মাঝারি আকারের পাহাড়ে পরিবেষ্টিত। তবে সময়ের প্রয়োজনে ব্যাপকহারে পাহাড় কেটে ফেলায় বর্তমানে উক্ত শতকরা হিসাবের সামান্য হেরফের হতে পারে। অর্থাৎ এই অঞ্চলে কৃষির মাধ্যমে উৎপাদনযোগ্য শস্য ভূমির পরিমাণ কম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙ্গালী ও পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর জন্য ঐ এলাকার শস্যভূমি যথেষ্ট নয়, আর চাষযোগ্য জমির একটি বড় অংশে ব্যাপক হারে তামাক চাষ করা হয়েছে।

পার্বত্য এলাকার পাহাড়ী জনগোষ্ঠী জুম চাষে অভ্যস্ত। ইতিপূর্বে তারা প্রতি দুই থেকে তিন বছর অন্তর অন্তর এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে গিয়ে জুম চাষ করত। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের এই অভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিকতার ছোঁয়া পার্বত্য এলাকাগুলোতেও এসেছে। পার্বত্য এলাকার মানুষের উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ মূল্য যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে সঠিকভাবে না পাওয়ার যে উদাহরণ বিগত বছরগুলোতে ছিল বর্তমানে সেই অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। দেশী ও বিদেশী বিভিন্ন এনজিও কর্মীগণ এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ব্যক্তিবর্গের পরামর্শে পার্বত্য এলাকার মানুষ তাদের পাহাড় বেষ্টিত ভূমির কার্যকরী ব্যবহার শিখেছে।

এমনকি একই জমিতে MTO (Multi Tier Orchard) পদ্ধতি ব্যবহার করে বেশ ভালো ফলাফল পাওয়া যায়, উদাহরণস্বরূপ, জলপাই এর বাগানে কলা, আনারস আমের বাগানে কলা ইত্যাদি। যে সমস্ত ভূমিতে ইতিপূর্বে জুম চাষ হতো ঐ সকল জমির একটি বড় অংশে বর্তমানে আম, লিচু, কলা ও জলপাই এর ব্যাপকহারে চাষাবাদ হচ্ছে।

ইতিপূর্বে পাহাড়ী সমাজে মহিলারা শুধুমাত্র কাজ করত আর পুরুষরা অলস সময় কাটাত। কিন্তু বর্তমানে তাদের অভ্যাসেরও পরিবর্তন হয়েছে। পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর পুরুষ ও মহিলাগণ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ফ্যাক্টরী এবং দপ্তরসমূহে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙ্গালী অধিবাসীগণ অর্থনৈতিকভাবে ও শিক্ষায় অনেকটা পিছিয়ে থাকলেও সরকারী বিভিন্ন পৃষ্ঠপোষকতায় এবং জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন ছোট ছোট ক্ষুদ্র কৃষি ও মৎসভিত্তিক প্রজেক্টের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে নিজেদের উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোতে বসবাসরত বাঙ্গালী ও পাহাড়ীদের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক সংরক্ষণ বিভিন্ন ফলজ, মৎস ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রজেক্টের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা এবং ঐ পণ্যসমূহ বিভিন্ন ফ্যাক্টরীর মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ না থাকায় অর্থনৈতিকভাবে আশানুরূপ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

একটি এলাকায় অর্থনৈতিক অবকাঠামো ও শিল্প গড়ে তোলার জন্য যে পূর্বশর্ত রয়েছে তা হলো জ্বালানি, গ্যাস, প্রয়োজনীয় জমি এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এই বিষয়গুলো সমাধানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হলে দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা সহজেই উৎসাহিত হয়। অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরীর পূর্ব শর্তসমূহ সূচারু রূপে পূরণ করা পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোর মত বাংলাদেশের অনেক স্থানেও হয়তো সম্ভব হয় না। কিন্তু একটি এলাকায় শিল্প উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে উপরে উল্লেখিত পূর্ব শর্তসমূহের একটি প্যাকেজ সমাধান সম্ভব।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার উপজাতি নারী ও পুরুষ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান বিশেষ করে চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও সাভার এলাকায় বিভিন্ন তৈরী পোশাক শিল্প ও ইপিজেড সমূহে কর্মরত আছে। তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড়ী ও বাঙ্গালীদের মধ্যে অনেক বেকার নারী ও পুরুষ রয়েছে, সুযোগ পেলে তারা তাদের বেকারত্ব দূরীকরণসহ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

বাংলাদেশ সরকারের রূপকল্প ২০৪১ এর অংশ হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। এরই অংশ হিসাবে চট্টগ্রামের মিরসরাই ও ফেনীর সোনাগাজীতে ৩০ হাজার একর জমির উপর দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক জোন নির্মাণের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। অর্থনৈতিক অবকাঠামো নির্মাণের পূর্ব শর্তসমূহ যেমন জ্বালানী, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সাশ্রয়ী মূল্যে জনশক্তি ইত্যাদি নিশ্চিত করার জোর সম্ভাবনা থাকায় মিরসরাই এর ইপিজেড এ দ্রুত কাজ এগিয়ে চলছে। এছাড়াও চট্টগ্রামের আনোয়ারাতে ৭০০ একর এবং গোহিরাতে ৫০০ একর জমির উপর অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের কাজও এগিয়ে চলছে।

শুধুমাত্র মিরসরাই এর অর্থনৈতিক জোনে প্রায় ১৬ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরী হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। মাষ্টারপ্লান অনুযায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধাদির কাজ এগিয়ে চলছে। এ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে প্রায় পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরকার কয়েকটি বিদেশী কোম্পানীর নিকট থেকে প্রস্তাব পেয়েছে। মিরসরাই অর্থনৈতিক জোনের জন্য প্রয়োজনীয় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহারের পর অবশিষ্ট সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে সংযুক্ত করার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। মিরসরাই এলাকাতে দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরীর অন্যতম কারণ হলো চট্টগ্রাম বন্দর হতে মাত্র ৬৭ কিঃ মিঃ দূরে এর অবস্থান। এই অর্থনৈতিক অঞ্চল হতে উৎপাদিত রপ্তানীযোগ্য পণ্য অতিদ্রুত জাহাজীকরণ এবং আমদানীকৃত পণ্য দ্রুত খালাস করে ফ্যাক্টরিতে নেওয়া সম্ভব হবে।

ভৌগলিক অবস্থানসহ অন্যান্য যে সমস্ত সুবিধার কারণে মিরসরাই, আনোয়ারা বা গোহিরাতে অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরীর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তার সকল সুবিধাদি পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাসমূহে সৃষ্টি করা সম্ভব। উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা গেলে অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরীর পূর্ব শর্ত যেমনঃ জ্বালানী ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি উন্নয়নে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগও পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাসমূহে উৎপাদিত বিভিন্ন ফলজ সম্পদকে আধুনিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পসহ অন্যান্য শিল্প যেমনঃ পোশাক শিল্প, টেক্সটাইল, অটোমোবাইল প্লান্ট, তথ্য প্রযুক্তি ইত্যাদি শিল্প স্থাপন করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা যায়। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাসমূহে রয়েছে সাশ্রয়ী মূল্যে কর্মঠ উপজাতি ও বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী।

উদাহরণস্বরূপ তিন পার্বত্য জেলার একমাত্র পোশাক শিল্প কারখানা বান্দরবান জেলায় অবস্থিত ‘লুম্বিনী গার্মেন্টস’ এর সাফল্য এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ সরকারের ২০৩০ সালের মধ্যে যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের সিদ্ধান্ত রয়েছে তার মধ্যে অন্তত কয়েকটি পার্বত্য জেলাগুলোতে স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হলে সামগ্রিকভাবে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষা ও ব্যক্তিগতভাবে এই অঞ্চলের বেকার নারী ও পুরুষগণ উপকৃত হবে।

পার্বত্য অঞ্চলের জেলাসমূহে সরকারের সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশ হিসাবে যদি কখনও পরিকল্পনামাফিক অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরী হয় তাহলে এখানে অনেক বিদেশী বিনিয়োগের সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশী ও বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। অর্থনৈতিক অবকাঠামোসমূহে বিদেশী বিনিয়োগ শুরু হলে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক পর্যটন শিল্প বিকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। তখন বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনে ও সহায়তায় এই অঞ্চলে ব্যাপকহারে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পর্যটন শিল্পের প্রভৃত উন্নয়ন সাধিত হবে যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অনেকেই হয়তো পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোতে অর্থনৈতিক অবকাঠামোর তৈরীর বিরুদ্ধে কথা বলবেন, তারা হয়তো এই অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতার অজুহাতও সামনে দাঁড় করাবার চেষ্টা করবেন। এটা ঠিক, শান্তিচুক্তি পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক রাজনীতির বিভিন্ন পরিক্রমায় এই অঞ্চলে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৪টি সশস্ত্র দল তৈরী হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, বাঙ্গালীদের অনেকেই তাদের বেকারত্বের কারণে বিভিন্ন পাহাড়ী সন্ত্রাসী দলের সাথে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু আমাদের একথাও স্মরণ রাখতে হবে যারা এ সমস্ত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত তাদের একটি বড় অংশের নীতিগত অবস্থান আদর্শগত নয়। এদের অধিকাংশই স্বল্পশিক্ষিত অথবা অশিক্ষিত আবার যারা শিক্ষিত তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট সন্ত্রাসী দলের নেতৃবৃন্দ জোর করে আটকিয়ে রেখেছে। ধারণা করা যায়, উপজাতি সন্ত্রাসী দলসমূহের একটা বড় অংশই নিজ ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঐ অনিশ্চয়তার জীবন বেছে নিয়েছে বা নিতে বাধ্য হয়েছে।

যতটুকু জানা যায়, সন্ত্রাসী দলের কর্মীগণ অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ঠ লাভবান হন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের ভাতা হিসাবে যে টাকা দেয়া হয় তা দিয়ে সম্মানজনকভাবে জীবন নির্বাহ করা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাসমূহে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরী করা হলে বিপথগামী এই পাহাড়ী জনগোষ্ঠী ও কর্মহীন বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী ক্রমান্বয়ে ঐ অর্থনৈতিক অঞ্চলে যোগদান করতে উৎসাহিত হবে বলে আশা করা যায়। একই সাথে ঐ সময় তাদের পরিবারের পক্ষ থেকেও অনিশ্চিত জীবন ছেড়ে একটি সুস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবন বেছে নেওয়ার জন্য চাপ থাকবে। আর এসব কিছু নিশ্চিত করা গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থিতিশীলতা সময়ের প্রয়োজনে এমনিতেই চলে আসবে।