parbattanews bangladesh

পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি: বৈষম্য আর বঞ্চনার শিকার এক জনগোষ্ঠী

সন্তোষ বড়ুয়া, রাঙ্গামাটি থেকে:

খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি আর বান্দরবান জেলা নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন অপরূপ নৈসর্গের এক লীলাভূমি। শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে এখানে ১৩টি উপজাতি গোষ্ঠী এবং বাঙালিদের বসবাস। কিন্তু এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাঝে ষড়যন্ত্রের বিষবাষ্প ছড়িয়ে উপজাতি-বাঙালির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে ফায়দা লোটার অপচেষ্টায় লিপ্ত একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী মহল।

তবে হ্যাঁ এ কথা সত্য যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতি-বাঙালি নির্বিশেষে সকল অধিবাসীরই ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, সংস্কৃতি, মৌলিক চাহিদা ইত্যাদির স্বরূপ ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক তারতম্যের কারণে সকল সম্প্রদায়ই কম-বেশী সমস্যায় নিপতিত আছে।

তবে তুলনা করলে দেখা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতি ও বাঙালিদের মধ্যে সবচেয়ে সুবিধাভোগী হিসেবে কয়েকটি উপজাতির জনসাধারণ সকল সময়ে দৃশ্যমানভাবে এগিয়ে আছে। নির্দিষ্ট করে বললে, উপজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে চাকমারা সবচেয়ে বেশী সুবিধাভোগী। সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে সকল সুবিধার সিংহভাগ চাকমারা ভোগ করে এবং তারা অন্যান্য উপজাতি এবং বাঙালিদেরকে পশ্চাৎপদতার আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে রেখেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের চেয়ে কোনো কোনো উপজাতিরা যে বেশী সুবিধাভোগী তার একটা তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

উপজাতি বাঙালি
চাকুরীর ক্ষেত্রে জাতীয় ভিত্তিক স্তরে ৫% হারে কোটা বরাদ্দ রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও বাঙালিরা এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে
উচ্চ শিক্ষার জন্য বিভিন্ন কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছর উপজাতিদের জন্য ২১৭টি আসন বরাদ্দ রয়েছে বাঙালিদের উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৭টি আসন বরাদ্দ রয়েছে
সরকারী ব্যাংক থেকে উপজাতিরা স্বল্প সুদে ঋণ গ্রহণ করতে পারে (৫% হারে)­­ বাঙালিদের এ সুযোগ নেই
উপজাতিরা সরকারের কাছে আয়কর প্রদান হতে অব্যহতি প্রাপ্ত বাঙালিরা আয়কর দেয়া থেকে অব্যহতি প্রাপ্ত নয়
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান সরকারী, আধাসরকারী, বেসরকারী এবং স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে শতকরা ৮০ ভাগ চাকুরীর সুবিধা ভোগ করে থাকে বাঙালিরা পেয়ে থাকে মাত্র ২০ ভাগ
পুলিশ বিভাগে উপজাতিদের জন্য বিশেষ কোটা ভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ৭০৫ জন আত্মসমর্পিত শান্তিবাহিনীর সদস্যকে এসআই এবং তদনিন্ম পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বাঙালিদের জন্য এরকম কোন বিশেষ সুবিধা নেই
উপজাতিদের ভোটাধিকার রয়েছে এবং তারা শান্তিচুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামের যে কোন জায়গায় জমি ক্রয় করতে পারে। শান্তিচুক্তি অনুযায়ী শুধুমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী ঠিকানা সম্বলিত বাঙালিদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে কিন্তু অন্যান্যদের বেলায় সে সুযোগ রাখা হয়নি। জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানবিধ জটিলতা। উল্লেখ্য যে বাঙালিদের স্থায়ী সনদ প্রাপ্তিতে উপজাতি সার্কেল চীফদের নিকট হতে সার্টিফিকেট নিতে হয় যেখানে বাঙালিরা নিয়মিতভাবে বঞ্চনার শিকার হচ্ছে।
পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের জন্য উপজাতি আসন সংরক্ষিত। এছাড়াও জেলা পরিষদের ৩৪টি আসনের মধ্যে রাঙ্গামাটিতে ২৩টি, বান্দরবনে ২২টি এবং খাগড়াছড়িতে ২৪টি উপজাতি আসন বরাদ্দ করা হয়েছে একজন বাঙালি কখনই জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হতে পারবে না। জেলা পরিষদের ৩৪টি আসনের মধ্যে রাঙ্গামাটিতে ১১টি, বান্দরবনে ১২টি এবং খাগড়াছড়িতে ১০টি মাত্র বাঙালি আসন বরাদ্দ করা হয়েছে
চেয়ারম্যানসহ আঞ্চলিক পরিষদে ২২ জন সদস্যের মধ্যে ১৫ জন উপজাতি আঞ্চলিক পরিষদে ২২ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র ৭ জন বাঙালি। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক (৪৯%) বাঙালি। চেয়ারম্যান পদে কখনোই কোনো বাঙালি অধিষ্ঠিত হতে পারবে না।
কোন সরকারী প্রকল্পের ব্যয় ২ লক্ষ টাকা এবং তার চেয়ে কম হলে উক্ত প্রকল্পের কাজ প্রাপ্তির ব্যাপারে উপজাতিরা অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে। এ ধরনের সুবিধা থেকে বাঙালিরা বঞ্চিত।
পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সকল এনজিও রয়েছে তাদের বেশীর ভাগ প্রজেক্টই উপজাতিদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত। খুব কম সংখ্যক এনজিও বাঙালিদের উন্নয়নের জন্য কাজ করে থাকে।

 

এত বৈষম্য আর বঞ্চনার পরও পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিরা অন্যান্য উপজাতিদের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান বজায় রেখে বসবাস করছে। বাঙালিদের এ বঞ্চনা আর বৈষম্যের হাহাকার ও কান্না আমাদের দেশের তথাকথিত একচোখা ভাড়াটে সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী, কলাম লেখক, আর মিডিয়ার চোখে কখনই পড়ে না।

বরং তারা উপজাতিদের কর্তৃক পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে সরকার, পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত নিরাপত্তাবাহিনী আর পাহাড়ের বাঙালিদের বিপক্ষে নিয়মিতভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে।

পাহাড়ে ৪টি উপজাতি আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন নিয়মিতভাবে খুন, গুম, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজসহ নানান অপকর্ম করে যাচ্ছে। এমনকি তারা বাংলাদেশ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড নামে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের জন্য দেশে-বিদেশে নানান ধরনের প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে।

অপরদিকে পাহাড়ের শান্তিপ্রিয় বাঙালিদের নেই কোন সশস্ত্র সংগঠন। তারা উপজাতি ঐসব সশস্ত্র সংগঠনের অস্ত্রের মুখে খুন, গুম, ধর্ষণ, চাঁদাবাজির শিকার হয়েও দাঁতে দাঁত চেপে পাহাড়ে পড়ে আছে শুধুমাত্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য। বাঙালিদের এই ত্যাগ, বঞ্চনা আর বৈষম্যের দিকে নজর দেবার কি কেউ নেই?