parbattanews bangladesh

পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দলসমূহ ও তাদের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা কী বলে এবং কী করে?

 

তিমির মজুমদার

জেএসএস, ইউপিডিএফ এবং জেএসএস (সংস্কার) এই তিনটি আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী দলই পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ অন্যান্য ছোট ছোট উপজাতি তথা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোকে স্বাধীন ‘জুম্ম ল্যান্ড’ স্থাপনের স্বপ্নে বিভোর করে নানারকম সুবিধা আদায় করছে। স্বেচ্ছায় তাদের কর্মকাণ্ডগুলোকে সহযোগিতা না করলে নির্যাতন/নিপীড়নের হাত থেকে কেউই রেহাই পাচ্ছে না। অত্যাচারের ভয়ে মুখ বুঁজে সবকিছু সহ্য করতে হচ্ছে পাহাড়ী–বাঙালী সকলকে। পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত বাঙালীদের জীবনযাপণ ভীষণ কঠিন, মানবেতর এবং তারা নিত্যদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অত্যাচার থেকে পরিত্রাণের কোন উপায় নেই !

২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ তারিখে বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক চেষ্টায় জেএসএসের  সাথে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পর পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকলে আশায় বুক বেঁধেছিল যে, তারা শান্তির সুবাতাস উপভোগ ও মানবিক জীবনযাপন করতে পারবে। কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের দিন থেকে জেএসএসের একটি অংশ এই চুক্তিকে অস্বীকার ও বিরোধিতা করে। সাথে সাথে তৈরী হয় আরও তিনটি নতুন আঞ্চলিক দল ‘ইউপিডিএফ’, ‘ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক)’ এবং ‘জেএসএস (সংস্কার)’।  এই বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলো নিরন্তর চাঁদাবাজী করে এবং চাঁদাবাজীর টাকায় গড়ে তোলে অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিশাল মজুদ এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল যার নাম দিয়েছে ‘জুম্ম লিবারেশন আর্মি’(জেএলএ)। ফলে শান্তিচুক্তির শর্তাবলী স্পষ্টতই লঙ্ঘিত হচ্ছে বারংবার।

শান্তিচুক্তি অনুযায়ী আঞ্চলিক সন্ত্রাসী দলগুলো অস্ত্র সমর্পন এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ করার ওয়াদা করেছিল কিন্তু তারা বরং তাদের অস্ত্র সম্ভার এবং অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর সংখ্যা বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। কোন চুক্তিই একপক্ষের মাধ্যমে কার্যকর করা সম্ভব হয় না। অথচ অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, শান্তিচুক্তি পালনের সকল দায়দায়িত্ব কেবল বাংলাদেশ সরকারের। পাহাড়ীদের একটি অংশ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের সময় থেকে অদ্যাবধি এই চুক্তির বিরোধিতা করে এসেছে, করছে এবং সর্বশক্তি দিয়ে শান্তি স্থাপন প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। চুক্তি অনুযায়ী অনেকগুলো (প্রায় ৫০%) নিরাপত্তা ক্যাম্প ইতোমধ্যে পরিত্যক্ত বা প্রত্যাহার ঘোষণা করা হয়েছে এবং সে সব ক্যাম্পে বরং পাহাড়ী সশস্ত্র দলগুলো স্থায়ী ঠাঁই গেড়েছে।

শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।  ২০১৬–২০১৭ অর্থ বছরে শুধুমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বাজেট প্রায় ১২০০ কোটি টাকা। এরসাথে এলজিআরডি, সড়ক ও জনপথ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতের উন্নয়ন বাজেট যোগ করলে তা প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা হতে পারে। শান্তিচুক্তির সর্বমোট ৭২টি ধারার মধ্যে ইতোমধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ, ১৫টি ধারার সিংহভাগ এবং অবশিষ্ট ৯টি ধারার বাস্তবায়ন চলমান রয়েছে।

এখন দেখা যাক, শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে না এই অজুহাত দেখিয়ে এসকল আঞ্চলিক দলসমূহ ও তাদের সন্ত্রাসী অস্ত্রধারী গোষ্ঠীরা আসলে কী বলে এবং কী করে ?

প্রথমতঃ  তারা পার্বত্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জীবনমানের উন্নয়নের কথা বলে, অথচ বাস্তবে তারা এখানকার শিক্ষার অগ্রগতিতে বাঁধা প্রদান করে। প্রমাণ হিসেবে রাঙ্গামাটিতে মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে বাঁধা ও অন্যান্য স্থানে উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে নিরুৎসাহিত করার বিষয়টি উপস্থাপন করা যায়। তারা যে বিশাল অংকের (বছরে প্রায় সাড়ে চার শ কোটি টাকা) চাঁদা আদায় করে তার সামান্য অংশও শিক্ষার উন্নয়নে কোথাও ব্যয় করা হয়েছে বলে কারো জানা নেই। এর পেছনের মূল কারণ হলো পাহাড়ীদের মূর্খ করে রাখতে পারলে তাদের শোষণ করা সুবিধা। তাছাড়া আঞ্চলিক দলসমূহের নেতানত্রীদের ছেলেমেয়েরা শহরের নামী–দামি বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটা এবং বিদেশে স্কলারশিপ এর মাধ্যমে পড়াশোনা করার সুযোগ সহজেই পেয়ে যায়। বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য এলাকার শিক্ষার উন্নয়নের জন্য নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। স্বাধীনতার প্রাক্কালে পার্বত্য এলাকায় মাত্র ৬টি বিদ্যালয়/কলেজ ছিল যার বর্তমান সংখ্যা কমবেশী ৫০০ টি। প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন প্রতি পাড়ায় পাড়ায়। ১৯৭০ সালে এই অঞ্চলে শিক্ষার হার ছিল মাত্র ২% যা এখন প্রায় ৫০% । সরকারের আন্তরিক সদিচ্ছা সত্ত্বেও আঞ্চলিক সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতার কারণে শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও বেগবান করা সম্ভব হচ্ছে না।

দ্বিতীয়তঃ বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমের স্বপ্ন দেখালেও প্রকৃতপক্ষে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা উন্নয়ন কার্যক্রমে নানা রকম বাঁধার সৃষ্টি করে। সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে যত প্রকার উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নেয়, আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সর্বত্র তার বাস্তবায়নে বাধার সৃষ্টি করে। প্রতিটি উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে জেএসএসকে ১০%–১৫%, ইউপিডিএফকে ১০%–১২% এবং জে এস এস (সংস্কার) কে ৮%–১০% হারে প্রক্কলিত বাজেটের অর্থ চাঁদা হিসেবে প্রদান ব্যতিরেকে কোন ঠিকাদার কাজ শুরুই করতে পারে না।  অল্প আয় ও কষ্টের জীবনের কথা চিন্তা করে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় বসবাসরত জনসাধারণের সরকারী ট্যাক্স প্রদান করতে হয় না। অথচ সন্ত্রাসীদের চাঁদা দেয়ার হাত থেকে তাদের পরিত্রাণ নেই। এই যে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে চারশত কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয় তার মধ্যে থেকে কত টাকা তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের কাজে খরচ করেছে?

স্বাধীনতার প্রাক্কালে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাস্তা ছিল মাত্র ৪৮ কিলোমিটার যার বর্তমান দৈর্ঘ্য কম বেশী ১৮০০ কিলোমিটার। সন্ত্রাসীরা বাধা না দিলে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত করা যেত। কিন্তু এখানকার আঞ্চলিক নেতৃত্ব এবং তাদের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এক অজানা কারণে চায় না যে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হোক। কেননা, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতি হলে তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করতে অসুবিধা হবে। এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্মিত হয়েছে ৬টি ষ্টেডিয়াম, ২৮টি হাসপাতাল, প্রায় ১৫০০টি কটেজ ইন্ডাষ্ট্রি এবং আরও অনেক কিছু। যার কোন একটির নির্মাণেও আঞ্চলিক দলসমূহের কোন প্রকার কনট্রিবিউশন বা অংশগ্রহণ নেই।

তৃতীয়তঃ জেএসএস, ইউপিডিএফ এবং জেএসএস(সংস্কার) দলের আরেকটি চাহিদা হচ্ছে পার্বত্য এলাকা থেকে বাঙ্গালীদের বিতাড়িত করা। ইতোমধ্যেই অনেক বাঙ্গালীই তাদের জমিজমা ও বসতভিটা হতে উৎখাত হয়ে গুচ্ছগ্রামে মানবেতর জীবনযাপন করছে।  ভুলে গেলে চলবে না যে, বৈচিত্রেই সৌন্দর্য এবং উন্নয়ন। আমেরিকাকে বলা হয়, ইমিগ্রান্টদের স্বর্গ। ১% নেটিভ রেডইন্ডিয়ানদের বাদ দিলে সেখানকার ৯৯% ভাগই বহিরাগত বা ইমিগ্রান্ট। একই অবস্থা অষ্ট্রেলিয়া এবং কানাডায়। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার চীনা, মালে ও ইন্ডিয়ানরা একত্রে তাদের দেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে গেছে। অন্যদিকে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক বাঙ্গালীদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উচ্ছেদ করে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া কতটা বাস্তব তা ভেবে দেখার বিষয়। ভুলে গেলে চলবে না যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি বড় অংশ চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় এবং বোমাং রাজা মংশৈপ্রু চৌধুরীর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন। স্বাধীন এই দেশে রাজাকারদের চেয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের বাস করার দাবী নিঃসন্দেহে জোরালো।

চতুর্থতঃ পার্বত্য এলাকাতে ‘জুম্ম ল্যান্ড’ নামে একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা করা। দুই জার্মানী এক হলো, দুই কোরিয়া একত্রিত হবার চেষ্টারত, সমগ্র ইউরোপ একই মুদ্রার প্রচলন এবং পাসপোর্ট ছাড়া সকলদেশ ভ্রমণের চেষ্টা করছে, হংকং চীনের সাথে একীভূত হলো, স্কটল্যান্ড ইংল্যান্ড  থেকে আলাদা হবার সুযোগ পেয়েও তা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকলো অর্থাৎ সকলেই যুক্তভাবে শক্তিশালী হবার চেষ্টা করছে। সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আঞ্চলিক দলগুলো এবং তাদের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা চেষ্টা করছে বাংলাদেশ নামক ছোট এই দেশটিকে ভেঙ্গে আরও ছোট ও দূর্বল করার। স্বাধীন দেশ হিসেবে ‘জুম্ম ল্যান্ড’ যথাযথ বা বাস্তবসম্মত হবে কি না তা বিবেচনার দরকার আছে।

তাছাড়া এক সাগর রক্তের বিনিময়ে, ত্রিশ লক্ষ শহীদের প্রানের বিনিময়ে এবং লক্ষ লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের মানচিত্র দ্বিখণ্ডিত করা এত সহজ হবে বলে মনে হয় না। এখানে আরও উল্লেখ করা যায় যে, তাদের চাহিদামত ‘জুম্ম ল্যান্ড’ তৈরী হলে ভবিষ্যতে আবার তাদের স্ব স্ব জাতি গোষ্ঠীর জন্য নিজ নিজ তথা ‘চাকমা ল্যান্ড’ ‘ত্রিপুরা ল্যান্ড’ ও ‘মারমা ল্যান্ড’ এর জন্য আবার যুদ্ধ করতে হতে পারে।

স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত জনসাধারণ সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নির্যাতন ও নিপীড়নের কারণে স্বাধীনতার প্রকৃত মুক্তির আনন্দ  উপলব্ধি করতে পারেনি। এখানকার পাহাড়ী ও বাঙ্গালী উভয়ই সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ। এই নির্যাতন থেকে মুক্তির নিশ্চয়ই কোন পথ আছে বলে তারা বিশ্বাস করতে চায় কিন্তু সে পথের শেষ প্রান্ত যে কত দূরে তা তারা এখনও দেখতে পাচ্ছে না ।

(লেখক: শিক্ষাবিদ, উন্নয়নকর্মী)