পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দল ও তাদের সশস্ত্র বাহিনীর কার্যক্রম এবং স্বাধীন ‘জুম্মল্যান্ড’ এর স্বপ্ন   


 

 তিমির মজুমদার

 আমার জন্ম বাংলাদেশের এক অভিশপ্ত অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রামের এক প্রত্যন্ত পাড়ায়।  অভিশপ্ত বলছি এ কারণে যে, এই এলাকার মানুষেরা নানাভাবে অত্যাচারিত, নিপীড়িত ও নির্যাতিত। স্বাধীনতার প্রকৃত মুক্তি ও আনন্দ যে কি তা এই এলাকার মানুষেরা জানে না। তাই এখানকার যুব সম্প্রদায়কে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখানো হয় নতুন দেশ ‘জুম্মল্যান্ড’ এর।  কিন্তু সেই স্বপ্ন কবে বাস্তবায়ন হবে, আর কতটা ত্যাগ এখানকার মানুষকে করতে হবে তা আমরা কেউ জানি না।

স্বাধীনতার পরপরই আমাদের নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা পার্বত্য এলাকার স্বায়ত্বশাসন চেয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের সেই দাবী তখন অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। ফলে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করতে হয়েছিল এখানকার জনগোষ্ঠীর। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু ২০ বছর কেটে গেলেও শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে এখানকার বাসিন্দারা হতাশ। কাজেই এখানে বসবাসরতরা মনে করেন, সশস্ত্র সংগ্রামের পথে পুণরায় পা বাড়ানোই মুক্তির একমাত্র উপায়।

কিন্তু আমাদের নেতৃত্ব এবং আমাদের জুম্মল্যান্ড সশস্ত্র বাহিনীর কার্যক্রম কতটা বাস্তবসম্মত? কেননা আমরা তো তাদের দ্বারাও নির্যাতিত হচ্ছি নিরন্তর।  এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কি সত্যিই নেই?

১৯৭৬ সালের ১৮ জুলাই তারিখে বিলাইছড়ির তক্তানলার কাছে মালুমিয়া পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সকাল ১১ টায় রাঙ্গামাটি থেকে আগত পুলিশ টহলের উপর আক্রমণটি ছিল জেএসএস-এর সামরিক শাখা তথা শান্তিবাহিনীর প্রথম আত্মপ্রকাশ। তার পরবর্তী ইতিহাস- রক্তের হলি খেলার ইতিহাস। বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর অত্যাচার, এখানে পুণর্বাসিত বাঙ্গালী সেটেলারদের অত্যাচার এবং সর্বোপরি আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী তথা শান্তিবাহিনীর অস্ত্রধারীদের অত্যাচার থেকে পরিত্রাণের কোন উপায় আমাদের জানা নেই। এক শান্তিবাহিনীর পরিবর্তে এখন অত্যাচারিত হচ্ছি জেএসএস, ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) এবং জেএসএস (সংস্কার) এই চার দলের ভিন্ন ভিন্ন অস্ত্রধারী দল কর্তৃক। তারা সকলে যদি স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠায় কাজ করে তাহলে জুম্মল্যান্ড আর্মির (জেএলএ) সকল দল একত্রিত হতে পারছে না কেন?

স্বাধীনতার পর থেকে এখনও পর্যন্ত অস্ত্রের ঝনঝনানি এখানে নিরন্তর চলছে।  চলছে জেএসএস, ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) এবং জেএসএস (সংস্কার) এর মধ্যে আধিপত্য ও চাঁদাবাজীর এলাকা সম্প্রসারণের লড়াই। এরই মধ্যে প্রাণ দিতে হয়েছে প্রায় ত্রিশ হাজার নিরীহ মানুষকে। আহত হয়েছে কমবেশী দশ হাজার এবং অপহরণ করা হয়েছে কমবেশী সাত হাজার মানুষ।  এর কমপক্ষে এক তৃতীয়াংশ পাহাড়ী জনগোষ্ঠী। সম্ভ্রমহানীর শিকার হয়েছে অসংখ্য বাঙ্গালী ও পাহাড়ী নারীরা। জুম্মল্যান্ড আর্মির সশস্ত্র যোদ্ধারা যেখানেই রাত্রিযাপন করে সেখানকার সকল কিছুই হয়ে যায় তাদের নিজস্ব। সেই পাড়া, বাড়ী বা ঘরের সকল মহিলারা হয়ে যায় তাদের খণ্ডকালীন সময়ের ‘স্ত্রী’। হায়রে স্বাধীনতার আন্দোলনের চরিত্রহীন নায়কেরা !

নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা শান্তিচুক্তির পূর্বে এখানকার মানুষদের উপর অনেক অত্যাচার করতো। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন।  তাদের অত্যাচারে মাত্রা কমে এলেও যেসব রাত্রিতে আমাদের নিজস্ব সশস্ত্র সদস্যরা কোন পাড়ায় বা কোন বাড়ি/ঘরে কাটায় তারা হয়ে ওঠে মূর্তিমান আতংক। যত্নে পালিত সবচেয়ে বড় ‘বন্য’(শুকর)টি তাদের জন্য উৎসর্গ করতে হবে।  সারা মাসের খাবার হিসেবে সংগৃহীত যা থাকে, তা তাদের রান্না করে খাওয়াতে হবে এবং সবশেষে ঘরের বা পাড়ার মহিলাদের হতে হবে তাদের দলের সকল সদস্যের শয্যাসঙ্গী।  সেটা যে কত ভয়ংকর তা কেবল ভূক্তভোগীরাই জানে। তাদের বিরুদ্ধে টু শব্দ করা যাবে না, কাউকে জানানো যাবে না। কেননা তারা তো ‘জুম্মল্যান্ড’ এর স্বাধীনতার সংগ্রামে লিপ্ত। তারা তো পার্বত্য জনগোষ্ঠীর মুক্তিযুদ্ধের নায়ক। তাছাড়া তাদের হাতে রয়েছে ভয়ংকর সব আগ্নেয়াস্ত্র।

ব্যবসা বাণিজ্য, চাকুরী, কৃষিকাজ, ফলমূল, হাঁস মুরগী, ছাগল, গরু যা কিছুই বিক্রি করি না কেন তাদের দিয়ে দিতে হবে নির্দিষ্ট অংকের বিপুল পরিমাণ চাঁদা। না দিলে কি হবে? জীবন দিয়ে দেনা শোধ করতে হবে। এ কেমন স্বাধীনতার স্বপ্ন তারা দেখায়? এ তো স্বাধীনতা নয়, নিরন্তর অত্যাচার। এই অত্যাচার থেকে পরিত্রাণের উপায় কি আসলেই নেই?

একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত জনসাধারণের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে পারেনি। আর আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপত্তার নামে যা করছে তা আর আমরা সহ্য করতে পারছি না। তাহলে উপায় কি? এ নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি কিন্তু কোন কুলকিনারা পাইনি। নিম্নলিখিত উপায়গুলো পাহাড়ে বসবাসরত সকলে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করে দেখতে পারিঃ

প্রথমতঃ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিজেরা নিশ্চিত করতে হবে। আর এটা করার জন্য নিজ নিজ এলাকায়, নিজ নিজ পাড়ায়, প্রতিটি বাজার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবী বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। রাত জেগে নিজেদের মধ্যে পাহারার ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সমন্বয়পূর্বক কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।  কথায় বলে ‘দশের লাঠি একের বোঝা’ অথবা ‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’।  সকলে মিলে চেষ্টা করলে নিপীড়ন নির্যাতন বন্ধ না হলেও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

 দ্বিতীয়তঃ জেএসএস, ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) এবং জেএসএস (সংস্কার) যতদিন  পর্যন্ত একত্রিত না হয় ততদিন পর্যন্ত আমাদের সকলকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে এসব দলগুলোকে নিয়মিত ও অনিয়মিত চাঁদা প্রদান বন্ধ করতে হবে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, কষ্ট করে আমরা যতটুকু উপার্জন করবো তা আমাদের পরিবারের জন্য। আমরা তার ভাগ কাউকে দেব না। একইভাবে বড় বড় ব্যবসায়ী, উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পাদনে নিয়োজিত ঠিকাদার, মোবাইল কোম্পানী, ব্রিটিশ টোবাকো, কাঠ ব্যবসায়ী, বাস ও ট্রাক মালিক সমিতিসহ সবাইকে সম্মিলিতভাবে চাঁদা প্রদান বন্ধ করতে হবে। চলুন আমরা নিজ নিজ পাড়া, এলাকা, বাজার ইত্যাদিকে ‘চাঁদা মূক্ত এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করি। সংঘবদ্ধভাবে আমরা চাঁদাবাজীকে না বলি এবং কেউ যদি জোর করে চাঁদা আদায় করতে আসে তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করি। কারো একার পক্ষে এই কাজ সম্ভব না হলেও সম্মিলিতভাবে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ প্রতিরোধ করা অসম্ভব নয়। প্রয়োজন আমাদের সকলের ঐকান্তিক সদিচ্ছা এবং একতাবদ্ধ ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে সমতল ভূমিতে প্রচলিত ‘লাঠি ও বাঁশি’ পদ্ধতির প্রচলন করা যেতে পারে।

তৃতীয়তঃ সকল পরিস্থিতিতে নিজ নিজ এলাকায় শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে। এদেশের প্রধান শক্তিই হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। এখানে পাহাড়ী-বাঙ্গালী ভেদাভেদ আমাদেরকে কেবল দূর্বলই করবে। প্রত্যেককে একে অন্যের সামাজিক, ধর্মীয় ও অন্যান্য কৃষ্টি ও সাংস্কৃতিকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সহনশীল আচরণ করতে হবে এবং একে অন্যের বিপদে আপদে এগিয়ে আসতে হবে।  একই এলাকায় কারও প্রতি কোন প্রকার অন্যায় ও অত্যাচার হলে সকলকে একযোগে তার প্রতিকার করতে এগিয়ে আসতে হবে।  তাহলে নিজেদের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় থাকবে যা এলাকায় নিরাপত্তা ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

চতুর্থতঃ প্রত্যেককে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বি হবার চেষ্টা করতে হবে। টেকসই আর্থ সামাজিক উন্নয়ন এর জন্য সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা বজায় রাখতে হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে । কৃষি, ফলজ, বনজ ইত্যাদি বৃক্ষরোপণ, হাঁস- মুরগী  পালন, ছাগল–গরু পালন, একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্প, ক্ষূদ্র ও মাঝারি কুটির শিল্প প্রভৃতিসহ নানা প্রকার অর্থনৈতিক কমকাণ্ডে নিজেদের যুক্ত করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া জীবন মানের উন্নয়ন সম্ভব নয়। বর্তমানে আমরা যে অবস্থায় আছি, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন আরও ভালো থাকে সে চেষ্টা আমাদের করে যেতে হবে।

পঞ্চমতঃ শিক্ষায় বিনিয়োগ করতে হবে। প্রত্যেকের ছেলে মেয়েদের স্কুল কলেজে পাঠাবার কোন বিকল্প নেই। মনে রাখতে হবে যে ‘মানুষের মত দেখতে হলেই মানুষ হয় না; শিক্ষা ছাড়া মানুষকে কেউ মানুষ কয় না’।  আঞ্চলিক নেতৃত্ব আমাদের সন্তানদের মুর্খ করে রাখতে চায়। অথচ আমাদের দেয়া চাঁদার টাকায় তাদের নিজেদের ছেলেমেয়েদের শহরের নামী দামী স্কুল/কলেজ অথবা বিদেশে লেখা পড়া করায়। তাদের এই চক্রান্ত থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতেই হবে। শুধু পাশের হার ও জিপিএ ভিত্তিক শিক্ষা নয়; জীবনের বাস্তবতা ঘনিষ্ঠ শিক্ষা অর্জনের প্রতি জোর দিতে হবে। আমাদের ছেলেমেয়েরা লেখা পড়া কারানোর পাশাপাশি সাবলম্বী হবার শিক্ষা অর্জন করতে হবে। শিক্ষা অর্জনের সাথে সাথে তারা নিজ নিজ পরিবারকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করবে এবং মানুষের মত মানুষ হতে সচেষ্ট হবে।

স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরেও আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের আধিবাসীরা স্বাধীনতার মুক্তি সম্পূর্ণভাবে  উপভোগ করতে পারছি না। বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী, বাঙ্গালী এবং জুম্ম লিবারেশন আর্মির  অত্যাচার এবং চাঁদাবাজীতে এখানকার জনগণের জীবন অতিষ্ট। এই অত্যাচার থেকে আমরা সকলেই মুক্তি চাই। বাংলাদেশ সরকারের উপর আস্থা রাখতে চাই। কিন্তু বিগত বছরগুলোর অবস্থা দৃষ্টে এখানকার সাধারণ মানুষ সত্যিই আশাহত।

(লেখক শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন কর্মী এবং গবেষক)

image_pdfimage_print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *