পর্যটন পরিকল্পনার লক্ষ্য হোক সাজেক থেকে সেন্টমার্টিন



সৈয়দ ইবনে রহমত::
বর্তমানে পৃথিবীতে ৭২৫ কোটি মানুষ বসবাস করে। এর মধ্যে ১০০ কোটি মানুষই পর্যটক। এই পর্যটকরা দেশে-বিদেশের নানা জায়গায়। তারা যেখানেই যাচ্ছেন সেখানেই অর্থ খরচ করছেন। আর তাদের খরচ করা অর্থ সরাসরি যোগ হচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতিতে। যা সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষদের অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করছে, বদলে দিচ্ছে জীবনচিত্র। প্রকারান্তরে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদান রাখছে। সে কারণেই দেশে দেশে এখন পর্যটনবান্ধব পরিকাঠামো ও পরিবেশ গড়ে তুলতে নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে তেমন কোনো চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ফলে পৃথিবীজুড়ে যখন প্রায় প্রতিটি দেশে বিদেশি পর্যটক আগমনের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, তখন আমাদের দেশে কমছে। ২০১০ সালে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল ৩ লাখের বেশি। ২০১৪ সালে তা কমে ১ লাখ ২৫ হাজারে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সংখ্যাটা হয়তো প্রকাশযোগ্যই না, তাই সেটা আর কোথাও দৃশ্যমান নেই। তবে আশার কথা হচ্ছে, গত কয়েক বছরে দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাত অনেকটাই সম্প্রসারিত হয়েছে। পর্যটন ব্যবসায়ীদের সংগঠন ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) হিসাব অনুযায়ী, বছরে এখন ৫০ থেকে ৬০ লাখ মানুষ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যান। বছর পাঁচেক আগেও এ সংখ্যা ২৫ থেকে ৩০ লাখ ছিল। আর ২০০০ সালের দিকে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ থেকে ৫ লাখ। পর্যটকদের প্রথম পছন্দ কক্সবাজার। এরপর তাদের পছন্দের তালিকায় আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম, তৃতীয় স্থানে সিলেট আর এর পরেই সুন্দরবনের অবস্থান। পর্যটকদের পছন্দ এবং গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেই আমাদের পর্যটন খাতকে বিকশিত করার পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হবে।

প্রয়োজন কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা: মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে দেখুন, পর্যটকদের প্রথম পছন্দ কক্সবাজার এবং দ্বিতীয় পছন্দের জায়গা পার্বত্য চট্টগ্রাম কীভাবে একই সাথে জড়িয়ে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তর-পূর্ব সীমানায় আছে রাঙ্গামাটি জেলার সাজেক, যা প্রকৃতির অপূর্ব শোভায় বিমোহিত করছে পর্যটকদের। ফলে সাজেক ইতোমধ্যে পরিচিতি পেয়েছে বাংলার দার্জিলিং বলে। অপরদিকে কক্সবাজারের দক্ষিণ-পূর্বের শেষ প্রান্ত হচ্ছে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। এবার আমরা যদি কল্পনা করি, একজন পর্যটক সাজেকের পাহাড় চূড়ায় রোদ আর মেঘের সাথে লুকোচুরি খেলা দেখে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি এবং বান্দরবানের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা পাহাড়ি ঝর্ণা, ঝিরি, খর¯্রােতা নদী আর খালের রূপ দেখতে দেখতে, নানা পাখপাখালির কিচিরমিচির শুনতে শুনতে কক্সবাজার হয়ে গিয়ে পৌঁছুবেন সাগর কন্যা সেন্টমার্টিন; সেখান থেকে লোনা হাওয়ার স্বাদ নিয়ে ফিরবেন আপন ঠিকানায়, তাহলে সেই ভ্রমণটা কতটা রোমাঞ্চকর হতে পারে? আসলে প্রকৃতি এই পুরো অঞ্চলটাকে সেভাবেই সাজিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই পুরো অঞ্চলটাকে একই সুতায় বেঁধে পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলার কোনো পরিকল্পনা আছে বলে আমাদের জানা নেই। এটা থাকা অবশ্যই দরকার। তিন পার্বত্য জেলার পর্যটন খাত তিন জেলা পরিষদের আওতাধীন। আর জেলা পরিষদগুলোর না আছে জনবল, না আছে দক্ষতা। তারপরও যদি কিছু করতে যায়, তাহলে রে রে করে তেড়ে আসে তথাকথিত আঞ্চলিক সংগঠনগুলো। অন্যদিকে কক্সবাজার অনেকটাই উন্মুক্ত, যার যেমন খুশি তেমন করেই হোটেল-মোটেল বানিয়ে চলেছেন একের পর একটা। আসলে এভাবে হবে না, বরং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে ‘সাজেক থেকে সেন্টমার্টিন’ এই পুরো জোনটাকে নিয়ে। প্রাকৃতিক পরিবেশ ও স্থানীয় অধিবাসীদের জীবন-বৈচিত্র্যটা ঠিক রেখে কোথায় রাস্তাঘাট হবে, কোথায় থাকবে আবাসিক স্থাপনা কিংবা বিনোদন কেন্দ্র, পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয় সব কিছুই থাকবে পরিকল্পনায়। তারপর সামর্থ্য অনুযায়ী বাস্তবায়নের দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া যেতে পারে জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসনসহ সরকারি অন্যান্য সংস্থা এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে।

চাই ডিজিটাল তথ্য ভাণ্ডার: আপনি যখন কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি কিংবা খাগড়াছড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করবেন তখন আপনার জানা দরকার যে, সেসব স্থানে দেখার মতো কী কী আছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা কেমন, কী কী বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন প্রয়োজন আছে, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাইবা কেমন। এসব জেনেই হয়তো আপনি আপনার প্রস্তুতি নেবেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সরকারি কোনো দপ্তরের ওয়েব সাইটে এসব বিষয়ে আপনি কোনো তথ্যই পাবেন না। আপনাকে নির্ভর করতে হবে যারা আগে ঘুরে এসে ফেসবুক কিংবা বিভিন্ন ব্লগ সাইটে রিভিউ লিখেছে সেসব তথ্যের উপর। পর্যটন কর্পোরেশন, জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সকল ওয়েব সাইটে প্রতিটি পর্যটন স্পট সম্পর্কে একজন নতুন পর্যটকের যা যা জানার থাকে তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ থাকা উচিৎ ছিল। আর সেসব শুধু বাংলা ভাষায় নয়, বরং ইংরেজিসহ আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক ভাষায় আমাদের পর্যটন স্পটগুলো নিয়ে সমৃদ্ধ ডিজিটাল তথ্য ভা-ার গড়ে তোলা দরকার। কারণ বিদেশি পর্যটকদের নিয়েও তো আমাদের পরিকল্পনা থাকতে হবে।

দরকার বিমান বন্দর: কিছু মানুষ আছে, যাদের কাছে পথঘাটের কষ্টের বিষয়টি খুব একটা পাত্তা পায় না। থাকা-খাওয়ার জন্যও দরকার পড়ে না আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন কোনো হোটেল কিংবা রেস্তোরাঁর। তারা বরং পায়ে হেঁটেই দিনের পর দিন ভ্রমণ করতে পছন্দ করে। তাদের ব্যাপারটি আলাদা, তবে বেশিরভাগের কাছেই ভ্রমণ আনন্দ-বিনোদনের বিষয়। তাই যেখানে ভ্রমণের সাথে আরাম-আয়েশের যোগ আছে তারা সেখানেই যেতে চান। সে ক্ষেত্রে আমাদের পার্বত্য তিন জেলার যাতায়াত ব্যবস্থা খুব একটা অনুকূল না। রাজধানী ঢাকা থেকে রওনা হলে কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি কিংবা খাগড়াছড়ি যেতে ১২/১৩ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। দূরত্ব ছাড়াও এ ক্ষেত্রে বড় সমস্যা যানজট। বেড়াতে গিয়ে যানজটের যন্ত্রণা পোহানো সত্যিই বিরক্তিকর। তাই যাদের সামর্থ্য আছে তারা এটা এড়িয়ে বেড়াতে পছন্দ করেন আকাশ পথে। কক্সবাজারে একটি অভ্যন্তরীণ বিমান বন্দর আছে, কিন্তু তিন পার্বত্য জেলার কোথাও সে সুযোগ নেই। সমতল ভূমির সংকটের কারণে হয়তো রাঙ্গামাটি এবং বান্দরবানে বিমান বন্দর নির্মাণ কিছুটা কঠিন, তবে খাগড়াছড়িতে সহজেই একটি অভ্যন্তরীণ বিমান বন্দর নির্মাণের জায়গা পাওয়া সম্ভব। সে পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের এগুনো দরকার। এটা পার্বত্যাঞ্চলের পর্যটন সম্ভাবনাকে যেমন বহুগুণে বাড়িয়ে দেবে, তেমনি অন্যান্য প্রয়োজনেও কাজে আসবে। অন্যদিকে কক্সবাজার বিমান বন্দরটিকেও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা দরকার।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

sayedibnrahmat@gmail.com

সূত্র: পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ, বর্ষ ১, সংখ্যা ০২-০৩, ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *