পর্যটক টানলেও, উন্নয়ন উপেক্ষিত সমুদ্র সৈকত


কক্সবাজার প্রতিনিধি:

বাংলাদেশের পর্যটন রাজধানী কক্সবাজার। এই পর্যটন রাজধানীর মর্যাদা একমাত্র সমুদ্র সৈকতের কারণে। তবে এই সমুদ্রসৈকত অবহেলিত। সৈকতের কোথাও কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। সিদ্ধান্ত হয় কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না। এক যুগ আগেও যেমন ছিল, বর্তমানেও তেমনি আছে। তবে অপরিকল্পিত দালানের সংখ্যা বেড়েছে হু হু করে। এতে পর্যটন নগরী অনেকটা শ্রীহীন হয়ে পড়েছে।

বিশ্বের দীর্ঘতম ১২০ কিলোমিটার সৈকতকে বুকে ধরে বিশ্ববাসীকে সম্মোহনের জালে আহ্বান করেই যাচ্ছে কক্সবাজার। সৈকতের টানে দেশ পেরিয়ে বিদেশের বিপুল পর্যটক ছুটে আসেন কক্সবাজারে। তাই সৈকতের উন্নয়ন চান সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে আগের তুলনায় এবার রোহিঙ্গা পরিস্থিতিতে বিদেশীরা কাজ করায় কক্সবাজারে অবস্থান করছে প্রায় ৪ হাজারের বেশী। সৈকতের উন্নয়ন না হলেও কক্সবাজার জেলা জুড়ে থেমে নেই উন্নয়নের ছোঁয়া। বাস্তবায়নের পথে ২৫ মেগা উন্নয়ন প্রকল্প। এসব প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়ন হলে পরিপূর্ণ পর্যটন নগরী হয়ে উঠবে কক্সবাজার।

এদিকে বৃহস্পতিবার বিশ্ব পর্যটন দিবসে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি ও টুয়াক। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘পর্যটন শিল্প প্রযুক্তি রূপান্ত’।

জানা গেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতার আসার পর নানাভাবে কক্সবাজারের উন্নয়ন করেছে। সরকারের বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, মহেশখালীর মাতারবাড়ি তাপভিত্তিক কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ‘এল.এন.জি ও কয়লা ভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র’ উন্নয়ন প্রকল্প।

এছাড়া মাতারবাড়িতে ৭০০ মেগাওয়ার্ড আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড নামে আরো একটি নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। মহেশখালীতে স্থাপিত হচ্ছে ইন্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প। এছাড়া মহেশখালী-আনোয়ারা গ্যাস সঞ্চালন পাইপ লাইন প্রকল্প, এশিয়ান হাইওয়ে সড়ক নির্মাণ, কক্সবাজার ফ্রি ট্রেড জোন স্থাপন ও টেকনাফে সোলার প্যানেল স্থাপন।

অন্যদিকে মহেশখালীতে স্থাপিত হচ্ছে বেজা কর্তৃপক্ষের ৫টি অর্থনৈতিক জোন। টেকনাফে উদ্বোধন করা হয়েছে “সাবরাং অর্থনৈতিক জোন”। তার কাজও চলছে পুরোদমে। এছাড়াও টেকনাফ ও হ্নীলা মৌজার জালিয়ারদ্বীপে ২৭১ একর জমিতে স্থাপিত হচ্ছে ‘জালিয়ারদ্বীপ অর্থনৈতিক জোন’।

তবে উন্নয়নের মাত্রা হিসেবে যোগ হয়েছে সেনাবাহিনীর বাস্তবায়নে স্বপ্নের টেকনাফ-কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়ক প্রকল্পটি যা ২০১৭ সালে পরিপূর্ণতা পায়। খুরুশকুল-চৌফলদন্ডী-ঈদগাঁও সড়কের চৌফলদন্ডী ব্রিজ এপ্রোচে ৯ কিলোমিটার সড়কের নির্মাণ কাজও হয়ে গেছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এগিয়ে চলছে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত করণের কাজ। সেই কাজও প্রায় শেষের দিকে।

শেখ কামাল আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম, সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট, মেডিকেল কলেজ (বর্তমানে কলেজে কার্যক্রম চলছে), দোহাজারী-ঘুমধুম রেললাইন প্রকল্প, রামুতে দ্বিতীয় বিকেএসপি, ভেটেনারি বিশ^বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস নির্মাণ ও কোস্টগার্ডের স্টেশন নির্মাণসহ আরো বেশ কয়েকটি প্রকল্প। প্রক্রিয়াধীন রয়েছে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ ও মহেশখালী ট্যুরিজম পার্ক প্রকল্প।

এতো উন্নয়নের পরও বরাবরই অভিযোগ থেকে যাচ্ছে, সমুদ্র সৈকতই কক্সবাজারকে বিশ্ব প্রান্তরে মর্যাদা ছড়িয়ে দিয়েছে, সেই সৈকতের প্রত্যাশিত কোনো উন্নয়ন এখন পর্যন্ত হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে এই অভিযোগ করে আসছেন কক্সবাজারের পর্যটন সংশ্লিষ্টরা। এই বহুল অভিযোগটি করেছেন খোদ সরকারি দলের অনেক নেতাও।

এ ব্যাপারে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল মোস্তফা বলেন, ‘সৈকতকে ঘিরেই কক্সবাজার একটি অনন্য ট্যুরিজম স্পট হিসাবে গড়ে উঠেছে। কিন্তু এই সৈকতের দেখার মতো কোনো উন্নয়ন নেই। সৈকত রক্ষণাবেক্ষণে নেই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। গড়েনি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। এই কারণে অনেক পর্যটক অতি উৎসাহ নিয়ে কক্সবাজার দেখতে আসলেও ফিরে যান হতাশ হয়ে।’ তবে তিনি আশাবাদি দ্রুত পর্যটন নগরীর সমস্ত প্রকল্প শুরু হবে।

তিনি দাবি জানিয়ে বলেন, ‘কক্সবাজার শুধু মর্যাদা দেয়নি, দিয়েছে আর্থিক সক্ষমতাও। কক্সবাজার থেকে বিপুল রাজস্ব সরকারের কোষাগারে জমা হচ্ছে। সৈকতের উন্নয়ন হলে বার বার কক্সবাজারে ছুটে আসবেন বিশ্বপ্রান্তরের পর্যটকরা। এতে সরকারও লাভবান হবে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতকে ঘিরে সার্বিক উন্নয়ন বাস্তবায়ন হলে পাল্টে যাবে কক্সবাজার।

কক্সবাজারের সিনিয়র সাংবাদিক নুরুল ইসলাম হেলালী বলেন, ‘ভারতের গোয়া সৈকত, থাইল্যান্ডের পাতায়া সৈকতসহ বিশ্বের কোনো সৈকত প্রাকৃতিকভাবে কক্সবাজারের ধারে-কাছেও নেই। ব্যবধান শুধু গড়ে তোলার ক্ষেত্রে। তারা গড়ে তুলতে পেরেছে বলেই পাতায়া, গোয়া টেনে নিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব পর্যটকদের। কক্সবাজার শুধু দীর্ঘতম সৈকতের নামটাই বহন করে চলেছে।’

কক্সবাজার ট্যুর অপারেটর এসোসিয়েশন অব টুয়াক এর সভাপতি রেজাউল করিম রেজা বলেন-পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন পরিকল্পনার আলোকে বাস্তবায়ন করলে কক্সবাজারের রাজস্ব দিয়ে পুরো দেশ চলতে পারবে। কিন্তু বছর যায় বছর আসে উন্নয়ন উপক্ষিত থেকে যায়। তিনি সরকারের পাশাপাশি টুয়াক পর্যটন শিল্প বিশে^ তুলে ধরতে একসাথে কাজ করছে বলে জানান।

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘সম্প্রতি কয়েক বছরে কক্সবাজারের পর্যটন খাতের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোনসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটের উন্নয়ন করেছে। সৈকতেরও উন্নয়ন হয়নি তা নয়। সৈকতের নিরাপত্তাসহ অবকাঠামোগতও উন্নয়ন হয়েছে। সরকার চেষ্টা করছে, কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে পর্যটন বিশ্বে জ্বলজ্বলে করতে।’ তিনি বলেন, কক্সবাজারকে ঘিরে হাতে নেয়া অনেক প্রকল্প তা অচিরেই শেষ হবে।

এছাড়াও সৈকতে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা, শহরের প্রধান সড়কের যানজট নিরসনের বিকল্প উপায়, পৌর শহরের রাস্তা-ঘাট সংস্কারকরণ, শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে বাঁকখালী নদী খনন, শহরে শিশুপার্ক স্থাপনের কাজ চলমান, স্থায়ী শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণসহ নানা প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। এসব বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজার হবে পরিকল্পিত পর্যটন নগরী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *