নো-ম্যান্স ল্যান্ডে রোহিঙ্গা গণহত্যার প্রস্তুতি নিচ্ছে মিয়ানমার!


ইমরুল কায়েস:

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নিষ্ঠুরতম গণহত্যা চালিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ মিলিশিয়ারা। সারিবদ্ধভাবে বসিয়ে গুলি করে, পুড়িয়ে ও গলাকেটে বহু রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। গণধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে রোহিঙ্গা নারীদের। মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার না থাকায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা জানা যাচ্ছে না। তবে এই হত্যাযজ্ঞকে ‘জাতিগত নিধনের পাঠ্যপুস্তকে দেয়ার মতো উদাহরণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে জাতিসংঘ।
গত ২৫ আগস্ট থেকে এককথায় রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে মগের মুল্লুক কায়েম করেছে মিয়ানমারের সেনা ও বৌদ্ধ মিলিশিয়ারা। প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের নো-ম্যান্স ল্যান্ডে আশ্রয় নেয় রোহিঙ্গারা।

এবার নো-ম্যান্স ল্যান্ডেও গণহত্যার আশঙ্কা করছেন অসহায় রোহিঙ্গারা। তুমব্রু সীমান্তের নো-ম্যান্স ল্যান্ড ঘিরে মিয়ানমার বাহিনীর রণপ্রস্তুতি ভয়ানক কিছুরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তুমব্রু নো-ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থান নেয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশে মিয়ানমার গত এক সপ্তাহ ধরে সেনা সমাবেশ করছে। জিরো পয়েন্টের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের লাগোয়া পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় বাঙ্কার খুঁড়েছে তারা।

মিয়ানমার সীমান্তের ভেতরে রাতের বেলা থেমে থেমে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। আর মিয়ানমারের সেনারা রোহিঙ্গাদের নো-ম্যান্স ল্যান্ড থেকে সরে যেতে কাঁটাতারের কাছে এসে হুমকি-ধামকি দিচ্ছে।

গত কয়েকদিন ধরে সীমান্তের কাঁটাতারের পাশে মাইক লাগিয়ে মাইকিং করে রোহিঙ্গাদের নো-ম্যান্স ল্যান্ড ছাড়ার হুমকি দিচ্ছে মিয়ানমার সেনারা। নো-ম্যান্স ল্যান্ডকে মিয়ানমারের মংডুর অংশ দাবি করে কথিত ‘আইন প্রয়োগের’ হুমকি দিচ্ছে তারা।

সরেজমিনে তুমব্রু সীমান্তের জিরো লাইনে গিয়ে দেখা যায়, জিরো পয়েন্টের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশে আটটি পোস্ট তৈরি করেছে মিয়ানমার সেনারা। পাহাড়ের চূড়ায় প্রতিটি পোস্টে বাঙ্কার খোঁড়া হয়েছে। বাঙ্কারের ভেতর থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দিক সার্বক্ষণিক অস্ত্র তাক করে রাখা হয়েছে। এই আটটি পোস্টে দুই শতাধিক সেনাকে টহল দিতে দেখা গেছে।

তুমব্রু নো-ম্যান্স ল্যান্ডের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি মো. ইউসূফ বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে জিরো পয়েন্টের রোহিঙ্গারা। নির্যাতন থেকে বাঁচতে এখানে এসেও আমরা শান্তিতে নেই।

তিনি জানান, নো-ম্যান্স ল্যান্ড থেকে সরে যেতে মাইকে ঘোষণা দিচ্ছে সেনাবাহিনী। সরে না গেলে ‘আইন প্রয়োগ’ করার ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। সেনাদের এসব কর্মকাণ্ডে ভীত সেখানকার প্রায় আট হাজার রোহিঙ্গা।

নো-ম্যান্স ল্যান্ডের আশ্রয় নেয়া মো. নুরুল আলম জানিয়েছেন, তুমব্রু সীমান্তের খুব কাছে মংডুর ঢেকিবনিয়া থানার পানিরছড়া এলাকার বাসিন্দা ছিলেন তিনি। গত এক সপ্তাহ ধরে মিয়ানমারের মাইকিংয়ের কারণে এখন রাত জেগে নিজের সন্তানদের পাহারা দিচ্ছেন।

তিনি বলেন, প্রতিদিন রাতে মিয়ানমার সেনারা মদ পান করে সেই বোতল তাদের ঘরের ওপর নিক্ষেপ করে। প্রতি রাতেই গালাগালি করে এই জায়গা ছেড়ে দিতে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে সেনারা।

দিল মোহাম্মদ নামে এক রোহিঙ্গা জানান, আমরা মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সেদেশের উন্নয়নে কাজ করেছি। কিন্তু এখন আমরা শরণার্থী। মিয়ানমার সেনারা আমাদের ‘পলাতক বাঙালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের গোপনে ঢেকিবনিয়ায় বৈঠক করার কথাও জানিয়েছিল। কিন্তু আমরা বাংলাদেশের মতামত নিয়ে তাদের জানাব বলেছি। এ কথায় ক্ষুব্ধ হয়ে তারা জিরো লাইন থেকে আমাদের সরে যেতে বলছে। অন্যথায় মিয়ানমার সরকারের আইন অনুযায়ী আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও হুমকি দিচ্ছে তারা।’

কক্সবাজার ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম জানান, নো-ম্যান্স ল্যান্ডের রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেনি। তাই ওই রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমারে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না। তিনি আশা করেন, পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে নো-ম্যান্স ল্যান্ডের রোহিঙ্গাদের সবার আগে ফেরত নেবে মিয়ানমার।

সূত্র: পরিবর্তন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *