নানিয়ারচরের ৬ হত্যাকাণ্ডের ১৩দিন পার হলেও পুলিশ এখনো মূল আসামীদের গ্রেফতার করতে পারেনি


বিশেষ প্রতিবেদন::

রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় চলতি মাসের ৩ এবং ৪ মে বহুল আলোচিত ৬ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৩ দিন পার হয়ে গেলেও পুলিশ এখনো মূল আসামীদের কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি। এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় ভিকটিমদের পক্ষ থেকে ৪ মে সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ দুইটি অভিযোগ দায়ের করা হলেও পুলিশ সাথে সাথে মামলাটি গ্রহণ করেনি। এনিয়ে চারদিকে ব্যাপক সমালোচনা হলে ৪ দিন পর অর্থাৎ ৮ মে মামলাটি নথিভুক্ত করে।

দীর্ঘ ১৩দিন পার হলো এখনো পর্যন্ত পুলিশের অভিযানের মধ্যে কোন সফলতা দেখা যাচ্ছে না বলে ভিকটিমদের অভিযোগ। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে রয়েছে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া।

পুলিশ গত ১৬ মে পর্যন্ত সর্বশেষ অভিযান চালিয়ে ৬ হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত দুই আসামীকে রাঙামাটি শহর থেকে গ্রেফতার করতে পারলেও অন্যান্য খুনীরা এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে।

এদিকে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি রোধ করতে পুলিশের পাশাপশি আর্ম পুলিশ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা কাজ করছে। অপরাধীদের ধরতে রাঙামাটি শহরের প্রবেশ মুখ থেকে শুরু করে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে তল্লাশী চালানো হচ্ছে।।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ৩ মে নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর পুলিশ যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা কড়াকড়ি করতো তাহলে পরদিন ৪ মে একই উপজেলায় ৫ মার্ডার ঘটনা ঘটতে পারতো পারতো না। আলোচিত এই ৬ হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান গণমাধ্যম কর্মীদের এড়িয়ে চলছেন।

১৬ মে নানিয়ারচর ৬ হত্যাকাণ্ডের অগ্রগতির ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল লতিফের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও লাভ হয়নি। ফোন রিসিভ না করায় পরিচয় দিয়ে একটি ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হয় পুলিশের এ কর্মকর্তাকে। কিন্তু তার সাড়া পাওয়া যায়নি। আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের শুরু থেকেই

নানিয়ারচর থানার এ ওসির বিরুদ্ধে রয়েছে নানান অভিযোগ। হত্যাকান্ড থেকে শুরু করে নানিয়াচর উপজেলার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদকর্মীরা নানানভাবে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

চলতি মাসের ৫মে চট্টগ্রাম রেঞ্জের পুলিশের ডিআইজি নানিয়াচর থানায় আসেন আইন শৃঙ্খলা বিষয়ক সভা করার জন্য। তিনি এসময় নানিয়ারচর থানার ওসির কার্যকলাপের উপর ক্ষুদ্ধ হন এবং সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে অবহিত করবেন বলে জানান।

এদিকে ১৬ মে সন্ধ্যায় জেলার সার্বিক পরিস্থিতি এবং নানিয়াচর ৬ হত্যাকান্ডের ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হয় রাঙামাটির পুলিশ সুপার আলমগীর কবিরের সাথে। এসময় নানিয়ারচর থানার ওসির অসহযোগিতামূলক আচরণের কথাও উল্লেখ করা হয়।

এসপি এ ব্যাপারে নিজের অসহায়ত্বের কথাও শুনিয়ে বলেন, ‌’আমি নিজেও এ ওসিকে ফোন দিয়ে পাই না।’

জেলার সার্বিক পরিস্থিতির ব্যাপারে তিনি জানান, বর্তমানে রাঙামাটির পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। জেলায় অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি আর্ম পুলিশ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা কাজ করছে।

এসপি আরও জানান, পুলিশ হত্যাকারীদের ধরতে সব রকম চেষ্টা চালাচ্ছে। খুনের ঘটনায় এ পর্যন্ত ২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এসপি আলমগীর বলেন, অপরাধীদের যতদিন গ্রেফতার করা না যাবে, ততদিন এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

প্রসঙ্গত: চলতি মাসের ৩মে সকালে একদল দুর্বৃত্ত নানিয়াচর উপজেলার সামনে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং জেএসএস সংস্কার’র সহ-সভাপতি শক্তিমানকে চাকমাকে গুলি করে হত্যা করে। এসময় তার সাথে থাকা তার সহযোগী রূপম চাকমাও গুলিবিদ্ধ হয়।

অপরদিকে ৪ মে চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক পার্টির প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা বর্মাসহ তার সাথে থাকা আরও চারজন নিহত হয় দুর্বৃত্তের গুলিতে। এ নিয়ে জেএসএস সংস্কার এবং ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক উভয় সংগঠন ইউপিডিএফকে দায়ী করে আসছে। তবে ইউপিডিএফ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

আর এ ঘটনায় চলতি মাসের ৯ মে জেএসএস সংস্কারের পক্ষ থেকে নানিয়ারচর উপজেলার পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেএসএস সংস্কার’র সহ-সভাপতি শক্তিমান চাকমা হত্যাকাণ্ডে ৪৬ জনকে আসামী করে ১৪৮/১৪৮/১০৯/৩২৪/৩২৬/৩০৭/৩০২/৫০৬/৩৪/ পেনাল কোড ১৮৬০ ধারায় ‘পূর্ব পরিকল্পিতভাবে, পরস্পর যোগসাজসে, একই উদ্দেশ্যে মারাত্মক অস্ত্রে সজ্জিত হইয়া হত্যার নির্দেশ প্রদান, খুনের উদ্দেশ্যে গুরুতর আঘাত প্রদান, খুন ও ভীতি প্রদর্শন’ এর অভিযোগ এনে সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ দায়ের করে শক্তিমানের সহকারী ও ওই ঘটনায় আহত রূপম দেওয়ান(৩৫), পিতা মহানন্দ দেওয়ান, গ্রাম বটবিল, নানিয়ারচর, রাঙামাটি। এই মামলায় ৪৬ আসামীরা হলো: প্রসীত বিকাশ খীসা(৫৫), পরাধন চাকমা প্রকাশ লাথী বর্মা(৩০), বাট্টু মনি চাকমা(২৮), অর্পন চাকমা প্রকাশ বাবুধন চাকমা(৩০),আনন্দ প্রকাশ চাকমা প্রকাশ কর্ণ/ অক্ষর/পারং(৬০), রঞ্জন মনি চাকমা প্রকাশ জেনিট/আদি(৫০),সচিব চাকমা প্রকাশ অজল সুকর্ণ(৫৫), সুপন চাকমা প্রকাশ সুশীল জীবন(৫০), জ্যোতি লাল চাকমা(৫০), উদয় শঙ্কর চাকমা(৫০),প্রমোদ বিকাশ খীসা(৫১), অমল কান্তি চাকমা(৪৮),বিদ্যাময় চাকমা(ডিএম)(৪০),বিমল চাকমা প্রকাশ উদয়(৪৮), ব্যোধিসত্ত চাকমা(৪০), বাবুল চাকমা(৩৫), সুবিকাশ চাকমা(দেওয়ান)(৩৫), সুজন মনি চাকমা(৩০), তুষাণ চাকমা(৩০), মধু রঞ্জন চাকমা(৪৮), রহিম চাকমা(২৫). রকেট চাকমা(৩০), সঞ্জয় বিকাশ চাকমা(ইউপি সদস্য), তোষণ চাকমা, (সভাপতি, পিসিপি, নানিয়ারচর কলেজ শাখা), পুলক চাকমা(৪০). রিটন চাকমা(ইউপি সদস্য)(৪১), তপন চাকমা, (ইউপি সদস্য)(৩৫), জীবন আলো মেম্বার (ইউপি সদস্য)(৩২), রুপক চাকমা ইউপি সদস্য, অমর জীবন চাকমা (৫৩), অরবিন্দু চাকমা, সর্বোত্তম চাকমা উপজেলা চেয়ারম্যান, কানন কুসুম চাকমা(৪৫), প্রিয় লাল চাকমা(ইউপি সদস্য), জ্যোতি লাল চাকমা, রবি সঙ্কর চাকমা(৫৪), মাইকেল চাকমা(৩৭), সুমেধ চাকমা প্রকাশ অটল/অলা(৪৫), শান্তিদেব চাকমা প্রকাশ সানি(৫০), রবি চন্দন চাকমা প্রকাশ অর্কিত/অর্নব(৪৮), শান্তিময় চাকমা প্রকাশ শ্রাবন(৪১), রক্ত চাকমা প্রকাশ রক্তিম(৪৮), পরাধন চাকমা(ইউপি মেম্বার)(৩৫), বাবুল বিকাশ চাকমা(ইউপি মেম্বার)(৩৭), রঞ্জন চাকমা ইউপিমেম্বার(৪৩), সুমন চাকমা লাকি বাপ(৩২)।

একইদিন ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক পার্টির পক্ষ ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক পার্টির প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা বর্মাকে হত্যা করার দায়ে ৭২জনকে আসামী করে ১৪৮/১৪৮/১০৯/৩২৪/৩২৬/৩০৭/৩০২/৫০৬/৩৪/ পেনাল কোড ১৮৬০ ধারায় ‘পূর্ব পরিকল্পিতভাবে, পরস্পর যোগসাজসে, একই উদ্দেশ্যে মারাত্মক অস্ত্রে সজ্জিত হইয়া হত্যার নির্দেশ প্রদান, খুনের উদ্দেশ্যে গুরুতর আঘাত প্রদান, খুন ও ভীতি প্রদর্শন’ এর অভিযোগ এনে সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ দায়ের করে সংগঠনটির নেতা নীতিপূর্ণ প্রকাশ অর্চিন চাকমা(৩৫), পিতা মোহন চাকমা, গ্রাম করল্যাছড়ি, নানিয়ারচর।

এই মামলায় ৭২ জন আসামীরা হলো: প্রসীত বিকাশ খীসা(৫৫), মাইকেল চাকমা(২৮), সজিব চাকমা(৫৫), শান্তিদেব চাকমা(৪২), প্রজিত চাকমা(৫৫), নিতু চাকমা(২৮), বিরাজ মনি চাকমা(৩৫), পলাশ চাকমা প্রকাশ টেরা চোখ(২৭), রঞ্জন মনি চাকমা প্রকাশ জেনিট/আদি(৫০), সচিব চাকমা প্রকাশ অজল সুকর্ণ(৫৫), সুপন চাকমা প্রকাশ সুশীল জীবন(৫০), জ্যোতি লাল চাকমা(৫০), উদয় শঙ্কর চাকমা(৫০), বাট্টু মনি চাকমা(২৮), আনন্দ প্রকাশ চাকমা প্রকাশ কর্ণ/ অক্ষর/পারং(৬০), অমল কান্তি চাকমা(৪৮), বিদ্যাময় চাকমা(ডিএম)(৪০), রহিম চাকমা(২৫), তুষাণ চাকমা(৩০), সুরঞ্জন চাকমা(৪৮), বাবুল চাকমা(৩৫), তোষণ চাকমা(৩৫), জীবন আলো মেম্বার(৩২), দিগন্ত মেম্বার (৩১), পদ্ম চাকমা(৩২), প্রমোদ বিকাশ খীসা(৫১), কিরণ জ্যোতি চাকমা(সচিব), সুশীল চাকমা প্রকাশ সুপম, বাবুল চাকমা, কানন কুসুম চাকমা(৪৫), শান্তিময় চাকমা প্রকাশ শ্রাবন(৪১), কানন চাকমা প্রকাশ জুয়েল(৪৭), প্রিয় চাকমা(ইউপি মেম্বার)(৪০), রঞ্জন চাকমা ইউপি মেম্বার(৪০), রক্ত চাকমা প্রকাশ রক্তিম(৪৮), রবি চন্দ্র চাকমা প্রকাশ অর্কিত/অর্নব(৪৮), রুপম মার্মা, পরাধন চাকমা প্রকাশ লাথী বর্মা(৩০), রবি শংকর চাকমা(৫৪), কোনেনুট চাকমা(পিসিপি সভাপতি), প্রঞ্জা চাকমা(পিসিপি সভাপতি), বিমল চাকমা প্রকাশ উদয়(৪৮), বিমল কান্তি চাকমা (৪৪), বিধু ভুষণ চাকমা(৪৫), সুমন চাকমা(লাকি বাপ)(৩২), অর্পন চাকমা প্রকাশ বাবুধন চাকমা(৩০), টনক চাকমা প্রকাশ উত্তম(৪২), বিমল কান্তি চাকমা প্রকাশ উদয়(৪৫), অমর জীবন চাকমা(৫৩), কলটা চাকমা(৪৫), অতুল চাকমা(২৮), আকর্ষণ চাকমা(৫৪), রকেট চাকমা(৩০), চিনু মারমা প্রকাশ আড়ং(৩৮), সুমেধ চকামা প্রকাশ অটল/অলা(৪৫), সর্বোত্তম চাকমা(উপজেলা চেয়ারম্যান), সঞ্জয় চাকমা(৩৫), বিজয় কেতন চাকমা(৫০), সমাজ প্রিয় চাকমা প্রকাশ প্রতীক (৩৯), নরোত্তম চাকমা(৬০), প্রত্যুত্তর চাকমা, চেয়ারম্যান লোগাং ইউনিয়ন, চঞ্চুমণি চাকমা চেয়ারম্যান, খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা, সুপার জ্যোতি চাকমা চেয়ারম্যান লক্ষীছড়ি উপজেলা, পুর্ণ কুমার চাকমা(৩৭), অগ্রসিন চাকমা প্রকাশ ডলার(৩৫), অনি চাকমা (৩৫), অপু ত্রিপুরা প্রকাশ সুবির (৩৮), অসিম চাকমা প্রকাশ ঝিমিত(৩৮), রিপন চাকমা প্রকাশ কার্তিক(৩৫), বরুণ চাকমা, পুলক চাকমা, উত্তম দত্ত চাকমা।

সর্বশেষ পুলিশ ১০ মে রাঙামাটি শহরে অভিযান চালিয়ে দুপুরে ইউপিডিএফ সমর্থিত ও ওই হত্যাকান্ডের চার্জসিটভুক্ত আসামী কিরণ জ্যোতি চাকমাকে আটক করে।

অপরদিকে ১০ মে দিনগত রাতে যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে জেএসএস সন্তু গ্রুপের কেন্দ্রীয় নেতা সতিশ চাকমা ওরফে তন্টু মণি চাকমাকে গ্রেফতার করে। বর্তমানে গ্রেফতারকৃত দু’জনকে বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে রিমাণ্ড চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *