দেববাক্য কি কভু অবিশ্বাস্য হতে পারে: প্রেক্ষিত দুই মারমা বোন


  • অর্পণা মারমা

শুক্রবারের অলস সকালে সংবাদপত্রে চোখ বুলাচ্ছিলাম। চোখ বুলাচ্ছিলাম বলে ভুল হবে, আসলে  যেটা মনে ধরছিলো, সেটা খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ছিলাম। আর, যে সংবাদে আমার আগ্রহ কম, তা শুধুমাত্র চোখ বুলিয়ে যাচ্ছিলাম। মারমা বোনদের ঘটনাটি নিয়ে একটু ধারনা আছে বলেই, খুব সহজেই এই সংক্রান্ত কয়েকটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত একাধিক সংবাদের মধ্যে কিছু কিছু বড় ধরনের অমিল এবং তথ্যের বৈপরীত্য আমার চোখে সহজেই ধরা পরলো। তাই, স্বাভাবিক ভাবেই, পড়তে পড়তে পুরনো সংবাদগুলো দেখতে বাধ্য হলাম। কয়েকটি দেখেই আমি পুরোপুরি দ্বিধায় পড়ে গেলাম; ভাবছি আমাদের বিশ্বাস কি এতোই ঠুনকো যে, যার যখন যা খুশি বলবে আর আমরা তার সবই বিশ্বাস করবো ?

ফেব্রুয়ারির ২ তারিখে রাণী মাতা ইয়ান ইয়ানের সাথে সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ডেইলি স্টার এর ‘স্টার উইকেন্ড’  এ বিস্তারিত বিবরণসহ মারমা দুই বোনকে নিয়ে একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়। ডেইলি স্টার কে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারছি না, কারণ একেবারে প্রথম থেকেই তারা এই ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে কাভার করছেন। যখন অন্য অনেক জাতীয় দৈনিক পত্রিকাকে কোন এক অজ্ঞাত কারণে মারমা দুই বোনের ব্যাপারে কিছুটা উদাসীন মনে হয়েছে, তখন  ডেইলি স্টার শুরু থেকেই এই বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।


  1. এ সংক্রান্ত আরো খবর ও লেখা পড়ুন
  2. পাহাড়িদের সরলতা কি গুটিকয়েকজনের ক্রীড়নক: প্রেক্ষিত বিলাইছড়ি ইস্যু
  3. মারমা দুই বোন, অপপ্রচার এবং ডিজিটাল যুগের দুর্বলতা
  4. পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীঃ নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দোষী
  5. বিলাইছড়িতে নির্যাতিতা দুই কিশোরীর শরীরে শুক্রানুর আলামত পাওয়া যায়নি
  6. আমরা ভাল আছি, শান্তিতে আছি: দু’মারমা কিশোরী
  7. বিলাইছড়িতে কথিত নির্যাতিত দুই কিশোরীর নাম ভাঙিয়ে ফায়দা লুটতে ব্যস্ত বিশেষ মহল

রাণী মাতার জবানে যা জানতে পেরেছিলাম যে, ঐ রাতে নিরাপত্তা বাহিনীর চারজন সদস্য প্রথমে মেয়ে দু’জনের বাবা-মাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে নিয়ে যায়। পরে দুইজন ঘরের ভিতরে এসে বড় বোনকে ধর্ষণ করে এবং ছোট বোনকে যৌন হয়রানি করে। এরপর যখন তাদের মধ্যে একজন ছোটজনকে ধর্ষণের চেষ্টা করে, তখন সে চিৎকার করে উঠে। হাসপাতালে ভর্তির সংবাদ পেয়ে রাণীমাতা যখন তাদের দেখতে যান, পুলিশ প্রথমে তাদের অনুমতি দিতে চায়নি। যদিও রাণীমাতার সাথে যুক্তিতর্কে না পেরে পরে দেখা করতে দিতে বাধ্য হয়। মেয়ে দু’জনের মেডিকেল টেস্ট ২৩ তারিখে হয়ে যাওয়ার পরেও ২৪ তারিখে ডাক্তার পুনরায় তাদের পরীক্ষা করছিলেন, কারণ বড়বোনের ঐদিনও ব্লিডিং হচ্ছিল।

রাণীমাতা আরো জানিয়েছেন যে, সাধারণ নাগরিক এমন কি সাংবাদিকদেরও মেয়ে দু’জনের সাথে কথা বলতে অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। এমনকি রাণীমাতা আরো জানিয়েছে তারা দেখা করতে গিয়ে তারা কিছু রেকর্ড করতে পারছে না বা ছবি তুলতে পারছে না। তিনি আমাদের এও জানিয়েছেন যে, ওসি নিজে এসে মেয়েদের  জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন, ছবি তুলেছেন এবং ভিডিও করেছেন, “যদিও তারা ধর্ষণের শিকার।” তিনি এটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, যদি কোন মামলা দায়ের করা হয়, তাহলে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। অন্যথায়, পুলিশ বা গোয়েন্দাদের কি এখতিয়ার আছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করার? অবশ্য, রাণীমাতা আমাদের জন্যে কিছু ভিডিও এবং তুলে পাঠিয়েছিলেন, যা তিনি তার বক্তব্যে জানিয়েছেন।

আমাদের সমাজে বয়োজ্যৈষ্ঠ ও মুরুব্বিদের স্থান অনেক উপরে; আর  রাজা এবং তার পরিবারের সদস্যগণতো দেবতুল্য। সেই দৃষ্টিতে, রাণীমাতার প্রতিটি কথা আমাদের জন্যে দেব বাক্য স্বরূপ। দেব বাক্যের প্রতি সন্দেহ পোষণ কষ্মিনকালেও কল্পনা করা যায় না- এ যে পাপ। আমরা এ বিশ্বাস নিয়েই বেড়ে উঠেছি। তাই যখন কিছু নিচু মনের মানুষ আমাদের দেবতাদের নিয়ে মিথ্যে ছড়ায়, তখন প্রচণ্ড ক্ষোভ হয়। কার হবে না, বলুন? দেবতাদের নিয়ে প্রশ্ন তোলা ঘোরতর অন্যায় নয় কি? তাদের অসম্মান করলে, রাগ– ক্ষোভ হওয়াই তো স্বাভাবিক।


অপর্ণা মারমার আরো লেখা পড়ুন:

  1. মানবতার পাহাড়ি রঙ: প্রেক্ষিত নারী নির্যাতন

কিন্তু যদি ব্যাপারটা এমন হয় যে, যুক্তি আর সত্যতার কাছে দেববাক্য প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয় পড়ছে; একবার বা দু’বার নয়, বারবার। তখন মনে হয়, তাহলে কি আমার সমাজের রীতিনীতি, সারা জীবনের জ্ঞান, নিজস্ব চেতনা আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা– সবই কি মিথ্যে আর ভুলে ভরা? আমার এমন হতাশা আর দ্বিধা কারণ আর কিছুই নয়, ঘটনা পরবর্তী বিভিন্ন সংবাদ এবং নিজস্ব বিচার বিবেচনা; যা পাঠকের সাথে শেয়ার করতে চাই এই আশায় যে কেউ হয়ত আমার ভুল ভাঙ্গিয়ে দিতে এগিয়ে আসবেন।

প্রথেমেই আসি, মারমা বোন দু’জনের বাবা-মায়ের প্রসঙ্গে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি জানিয়েছেন যে, ঘটনার সময় মেয়ে দু’জনের বাবা-মা জুম চাষের জন্যে বাড়ির বাইরে ছিলেন।(নিউএজ, ৬ মার্চ)। মেয়ের বাবা– মা ঘটনার সময় বাড়িতে অনুপস্থিত ছিলেন– সে কথা কিছু কিছু সংবাদ মাধ্যমে অনেক আগেই এসেছিল। তবে আমরা বিশ্বাস করিনি, কারণ আমরা রাণীমাতার কথা বিশ্বাস করতে চেয়েছিলাম। এখন এ কথা বলা ছাড়া কোন উপায় নেই যে, দেব বাক্য কখনো অবিশ্বাস্য হতে পারে না।

এবার দেখি, ঘরে কয়জন ঢুকেছিল। মানবাধিকার কমিশনের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির সুত্রে জানা যায় যে, কমপক্ষে একজন বাড়ির ভিতরে ঢুকেছিল (নিউ এজ, ৬ মার্চ)। সিএইচটি জুম্মলান্ড এর অনলাইনে আপলোড করা ভিডিওতে দেখা যায় যে, রাঙামাটিতে প্রেস কনফারেন্সে মারমা দুই বোনের ছোট ভাই সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলছে ‘একজন’ ঘরে ঢুকেছিল। (https://www.facebook.com/video.php?v=808551769327527)। আনসার বা সেনাবাহিনী শুরু থেকেই দাবী করছিল যে, পেট্রোলের একজন সদস্য ঐ ঘরে ঢুকেছিল। দেববাক্য মিথ্যে হওয়ার সুযোগ নেই বলে, হয়ত আমদের কেউ কেউ এখনো বিশ্বাস করতে বাধ্য যে, একজন নয় একাধিক ব্যক্তিই ঢুকেছিল!

দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কি একজন ধর্ষিতার কাছে সাধারণ নাগরিকের অবাধ যাতায়াতের সুযোগ আছে কি না আমার জানা নেই। পুলিশ যদি সাংবাদিকদের মেয়ে দু’জনের বক্তব্য নেয়া বা দেখা করতে দিতে বাঁধা দিয়ে থাকে, তাহলে একবার ভেবে দেখা যেতে পারে যে, যদি সবার যাওয়ার অনুমতি থাকতো তাহলে কি হতো? রাঙ্গামাটির এসপি’র সমালোচনা করা হয়েছে ধর্ষিতার ছবি ফেসবুকে দেয়াতে। আর জ্যান্ত ধর্ষিতাকে কাছে গিয়ে দেখতে দেয়া হয়নি, তাদের ছবি তুলতে দেয়া হয়নি বা তাদের সাথে কথা বলতে দেয়া হয়নি, তাই সমালোচনা করা হচ্ছে পুলিশের !! সত্যি সেলুকাস – এ শুধু আমাদের পক্ষেই সম্ভব।

ধর্ষিতার বক্তব্য নেয়া, রেকর্ড করা বা ছবি তোলার দাবীদার কে হতে পারে? পুলিশ না অন্য কেউ? “যদিও তারা ধর্ষণের শিকার”– এই বলে যদি থানার ওসি’র জিজ্ঞাসাবাদ বা ছবি তোলাকে সমালোচনা করা হয়; তাহলে কোন যুক্তিতে, রাণীমাতার সেই একই কাজের দাবী যুক্তিসঙ্গত বলে মেনে নেয়া যায়? আর এই দাবী মানতে অস্বীকার করায় পুলিশের সমালোচনা করা কতটুকু যৌক্তিক হতে পারে তা নিয়ে মাথা ঘামানো যেতেই পারে। তবে, যা নিয়ে মাথা ঘামানো নিস্প্র্যোজন বা যা সহজেই দৃশ্যমান তা হলো, রাণীমাতার এই কাজের মোটিভ আর যাই হোক, মারমা দুই বোনকে সাহায্য করা ছিলো না।

২৫ তারিখেই ডয়চে ভেলে সংশ্লিষ্ট আনসার কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছিল যে, ঘরে একজন প্রবেশ করেছিল এবং তাকে ক্লোজড করা হয়েছে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের পরিচালককে উদ্ধৃত করে ডয়চে ভেলে আরো জানিয়েছিল যে, মেয়েগুলোর চিৎকারে আর্মির পেট্রোলে যারা ছিলো তারা ছুটে যায় এবং আনসার সদস্যকে আটক করে আনসার কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে। ব্যাপারটা এমন কি আদৌ সম্ভব যে, সংবাদপত্রে প্রকাশিত না হলে কিংবা প্রেস কনফারেন্স বা মিছিল না হলেও পার্বত্য চট্রগ্রামে যেকোন অন্যায়ের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনী তাদের সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে? নিরাপত্তা বাহিনীর যে কোন পর্যায়ের কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই এর উত্তর জানা যাবে। যদিও কয়েকদিন আগেই, এই ঘটনার প্রেক্ষিতে এক লেখায় কে যেন বলেছিল যে, সেনাবাহিনী নাকি নারীঘটিত অপরাধে ‘জিরো টলারেন্স’ এর নীতি অনুসরণ করে থাকে। সত্যিই যদি তাই হয়, তাহলে এই একটি বিশেষ ঘটনা নিয়ে এত উচ্চকিত হওয়ার কারণ নিশ্চয় অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা নয়।

ডেইলি স্টার এই বিষয়ে অনেক ফলোআপ নিউজ করেছে, কিন্তু কেন জানি মেডিকেল টেস্টের রেজাল্ট নিয়ে কিছু বলেনি। যদিও কিছু কিছু সুত্রে প্রকাশ হয়েছে যে, মেডিক্যাল টেস্টে ধর্ষণের কোন আলামত পাওয়া যায়নি। যেহেতু দেবভাষ্য মতে বড় বোনকে দুইজনে ধর্ষণ করেছে, তাই মেডিক্যাল বোর্ডে তিনজন মহিলা যাদের মধ্যে একজন পাহাড়ি, একজন বড়ুয়া থাকা সত্ত্বেও আমরা সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতেই পারি। কোন মতে যদি মেডিক্যাল টেস্ট সত্যি বলে থাকে তাহলে ২৪ তারিখে বড় বোনের ব্লিডিং হওয়ার কারণ কি হতে পারে তা নিয়ে আমরা যারা নারী তারা মনে হয় চুপ থাকাটাই শ্রেয় মনে করবো।

এই একটি ঘটনা নিয়ে কম লেখালেখি হয়নি। মিছিল, প্রেস কনফারেন্স এমনকি বিদেশের মাটিতে পর্যন্ত প্রতিবাদ হয়েছে। এমনকি অন্য ঘটনার ছবি ব্যবহার করে অথবা পুরোপুরি মিথ্যা কিংবা সত্যি-মিথ্যা মিশিয়েও দেশে-বিদেশে প্রতিবাদ করা হয়েছে। প্রতিবাদের ভাষার দিকে তাকালে বুঝতে দেরী হয় না যে, এই সকল প্রতিবাদ আমাদের ঐ নির্যাতিতা দুই বোনের বিচারের দাবীতে না যতটা, তার চেয়ে বেশি অন্য কিছুর জন্যে। ধীরে হলেও, দিনে দিনে যখন অনেক কিছুই প্রকাশ পাচ্ছে, তখন উপলব্ধি করতে দেরি হয় না যে, আমরা যা বিশ্বাস করেছিলাম, তার পুরোটাই সত্যি ছিলো না। দেবতার কথায় বিশ্বাস করে, আমরা যারা এই সকল প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলাম; এখন যদি দেখি যে, আমাদের বিশ্বাসকে অপব্যবহার করা হয়েছে, তাহলে দেবতার প্রতি আমার আজন্ম লালিত বিশ্বাস ভঙ্গের দায় কার?

যে কোন নির্যাতনের বিচার অবশ্যই হতে হবে। অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে অবশ্যই অত দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে– কোন অজুহাতেই কালক্ষেপণ করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একই সাথে আমাদের আজন্ম লালিত বিশ্বাসকে দয়া করে ঠুনকো প্রমাণিত করবেন না– আমাদেরকে আমাদের বিশ্বাস নিয়ে বাঁচতে দিন। আমাদের বোনদের অন্যের দুরভিসন্ধি বাস্তবায়নের টোপ হিসেবে ব্যবহার করবেন না, প্লিজ। আমরা আমাদের মানব দেবতাদের যেমন ভক্তি-শ্রদ্ধা করি; তেমনি মানব দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করি যে, আমাদের কে মানুষ হিসেবে সম্মান নিয়ে বাঁচতে  সাহায্য করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *