তাণ্ডবলীলার মধ্য দিয়ে শেষ হলো খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ’র দুই দিনের সড়ক অবরোধ 


নিজস্ব প্রতিবেদক,খাগড়াছড়ি:

ব্যাপক গাড়ি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, পুলিশের সাথে সংঘর্ষ এবং আধা সামরিক বাহিনীর বিজিবি’র গাড়ি বহরে হামলা ও ভাংচুরের মধ্য দিয়ে শেষ খাগড়াছড়িতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’র (ইউপিডিএফ)ডাকা দুই দিনের সড়ক অবরোধ। কেন্দ্রীয় নেতা মিঠুন চাকমার হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবিতে খাগড়াছড়িতে শনিবার ইউপিডিএফ সকাল-সন্ধ্যা সড়ক অবরোধের ডাক দেয়।

এ  অবরোধ চলাকালে পিকেটারদের উপর হামলার অভিযোগ এনে সংগঠনটি রবিবার ফের খাগড়াছড়িতে সকাল-সন্ধ্যা সড়ক অবরোধের ডাক দেয়। টানা দুই দিনের অবরোধে পুরো খাগড়াছড়ি জেলা অচল হয়ে পড়েছে। সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হয় শত শত পর্যটক। দ্বিতীয় দিন খাগড়াছড়ি আলুটিলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি‘র গাড়ি ভাঙচুর করে অবরোধ সমর্থক ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট-ইউপিডিএফ কর্মীরা। রোববার বেলা পৌনে দুইটার দিকে খাগড়াছড়ির আলুটিলা পুনর্বাসন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, বিজিবির দক্ষিণ-পুর্ব রিজিয়নের ভারপ্রাপ্ত রিজিয়ন কমান্ডার কর্ণেল আনিসুর রহমানকে বহনকারী পাজেরোসহ দুইটি পাজেরো ও দুইটি পিকআপ খাগড়াছড়ি থেকে চট্টগ্রামে ফেরার পথে খাগড়াছড়ির আলুটিলা পুনর্বাসন এলাকায় পুনর্বাসন যাত্রী ছাউনির পাশের পাহাড় থেকে ৫/৭জন অবরোধ সমর্থক বিজিবির গাড়ি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও গুলতি মারে। এতে বিজিবির দক্ষিণ-পুর্ব রিজিয়নের ভারপ্রাপ্ত রিজিয়ন কমান্ডার কর্ণেল আনিসুর রহমানকে বহনকারী পাজেরো গাড়ির ডান পাশের গ্লাস ভেঙ্গে যায়। এসময় অপর পাজেরোটির পেছনের অংশ সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এসময় গাড়িতে থাকা কেউ আহত হয়নি এসময় বিজিবি সদস্যরা ধাওয়া করলে অবরোধ সমর্থক ইউপিডিএফ কর্মীরা পালিয়ে যায়।

অপ্রীতিকর ঘটনার শঙ্কায় নিরাপত্তাবাহিনীর টহল জোরদার করা হলেও অবরোধের দ্বিতীয় দিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে শহরের দক্ষিণ খবংপুড়িয়া এলাকায় পুলিশের সাথে পিকেটারদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। একই সময় খাগড়াছড়ি-পানছড়ি সড়কে দুটি টমটম ভাংচুর ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় অবরোধকারীরা। অবরোধের দ্বিতীয় দিনও আভ্যন্তরীন ও দুরপাল্লা সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। তবে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা নৈশ কোচগুলো জেলার রামগড় থেকে পুলিশী প্রহরায় খাগড়াছড়ি সদরে নিয়ে আসা হয়।

অবরোধের প্রথম দিন শনিবারও পুলিশের সাথে সংঘর্ষ, জেলার বিভিন্ন স্থানে গাড়ি ভাংচুর ও মোটরসাইকেলে আগুনসহ বিছিন্ন ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ শর্টগানের গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

প্রসঙ্গত, গত ৩ জানুয়ারি দুপুরে খাগড়াছড়ি শহরের স্লুইস গেইট এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে  পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’র  (ইউপিডিএফ) কেন্দ্রীয় নেতা মিঠুন চাকমা নিহত হয়েছে। ইউপিডিএফ এ হত্যাকাণ্ডের জন্য ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিককে দায়ী করে আসছে। তবে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক এ হত্যাকাণ্ডে তাদের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে বলেছেন, এটি প্রসীতের ইউপিডিএফ’র আভ্যন্তরীন কোন্দলের কারণে হয়েছে। এদিকে ঘটনার চার দিন পর শনিবার রাতে এসআই একে এম মিজানুর রহমান বাদী হয়ে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’র (ইউপিডিএফ কেন্দ্রীয় নেতা মিঠুন চাকমা হত্যাকাণ্ডে ৭/৮ অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামী করে মামলা হয়েছে। খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান জানান, পরিবারের কেউ মামলা না করায় ন্যায় বিচারের স্বার্থে পুলিশ মামলাটি করেছেন।

ইউপিডিএফ’র অভিনন্দন: দুই দিনের অবরোধ শেষে রবিবার বিকালে সংবাদ মাধ্যমে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে ইউপিডিএফ-এর খাগড়াছড়ি জেলা ইউনিটের প্রধান সংগঠক সচিব চাকমা অবরোধ কর্মসূচি সফল করতে সহযোগিতা করায় জেলার সকল যানবাহন মালিক সমিতি, চালক, শ্রমিক সংগঠন ও সর্বস্তরের জনগণের প্রতি ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় নব্য মুখোশ বাহিনী সন্ত্রাসীদের দিয়ে ইউপিডিএফ-এর অন্যতম সংগঠক মিঠুন চাকমাকে হত্যা, তার মরদেহ দলীয় অফিসে এনে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনে বাধাদানের প্রতিবাদে এবং হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবিতে শনিবার (৬ জানুয়ারি) ও রবিবার (৭ জানুয়ারি) দুই দিনব্যাপী খাগড়াছড়ি জেলায় সড়ক অবরোধ কর্মসূচি স্বতস্ফুর্ত ও সফলভাবে পালিত হয়েছে।

দুই দিনের অবরোধে জেলা সদর ও উপজেলাগুলোতে যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। দূরপাল্লার কোন যানবাহনও চলাচল করেনি।অবরোধের শুরু থেকে শহরজুড়ে নিরাপত্তাবাহিনীর নজিরবিহীন টহল ছিল। প্রথম দিন পুলিশ খাগড়াছড়ি সদরের চেঙ্গী ব্রিজ এলাকায় পিকেটারদের উপর হামলা ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে ৩-৪ জন পিকেটার আহত হয়। একই দিন খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার গাছবান এলাকায় নিরাপত্তাবাহিনী ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে পিকেটারদের ধাওয়া করে। অবরোধের দ্বিতীয় দিন রবিবার এক নিরীহ পথচারীকে আটক ও সেনা-পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ছাড়া বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। জনগণ স্বতস্ফুর্তভাবে অবরোধ কর্মসূচিতে সহযোগিতা দেয়।

সচিব চাকমা বলেন, এদেশের শাসকগোষ্ঠী পাহাড়ি জনগণকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার লক্ষ্যে নানা ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের হত্যা, নির্যাতনের মাধমে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামকে মেধাশূণ্য করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। পাকিস্তান এ দেশের সূর্য্য সন্তান বুদ্ধিজীবীদের খুন করে দেশের মহান স্বাধীনতাকামী জনতাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি, পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণকেও দমিয়ে রাখা যাবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি শাসকগোষ্ঠীর সকল অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।

সোমবার সাংবাদিক সম্মেলন: নেতা মিঠুন চাকমা হত্যার প্রতিবাদে ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে সোমবার (৮ জানুয়ারি ২০১৮)সকাল ১১টায় খাগড়াছড়ির স্বনির্ভরস্থ দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেছে ইউপিডিএফ। সংবাদ সম্মেলনে জেলার সকল প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ার সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কর্মসূচি  ঘোষণা করা হবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

উল্লেখ, প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ১৯ বছর পর গেল বছরের ১৫ নভেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রভাবশালী পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ ভেঙ্গে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক নামে আরো একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। বিভক্তির পর সংগঠনটির কোন নেতাকর্মী প্রথম হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *