তবলবাগে বিজিবি কর্তৃক নারী নির্যাতনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি- দাবী স্থানীয় উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের


পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:
রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার ছোট হরিণা ইউনিয়নে বিজিবি কর্তৃক নারী নির্যাতনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি বলে জানিয়েছে স্থানীয় উপজাতীয় জনপ্রতিনিধি ও গণমান্য ব্যক্তিবর্গ। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের সাম্প্রদায়িক একটি গোষ্ঠী বিজিবির বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ অপপ্রচার হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে। পার্বত্যনিউজের অনুসন্ধানে এ তথ্য জানা গেছে।

গত রবিবার পাহাড়ী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী পরিচালিত বিভিন্ন পেইজ ও গ্রুপে একটি নিউজ ভাইরাল করা হয়। সংবাদে বলা হয়,

‌‌”রাঙ্গামাটির বরকল উপজেলার ভূষণছড়া ইউনিয়নের তাগলগ বাগ গ্রামে বিজিবি সদস্য কর্তৃক গত ১৬ জানুয়ারি ২০১৯ বিকাল ৩ ঘটিকায় ১৭ বছরের এক আদিবাসী জুম্ম কিশোরীকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জানা যায়, ঘটনার সময়ে ওই কিশোরী ঘাটে পানি আনার জন্য যায়। এ সময়ে পথে আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা বিজিবি সদস্য মো: আলমগীর (সিপাই) ওই কিশোরীর পথরোধ করে এবং ঝাপটে ধরে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। পরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে কিশোরী ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

এ ঘটনার পর বিজিবির ছোট হরিণা জোনের ১২ ব্যাটালিয়নের তাগলগ বাগ বিজিবি ক্যাম্প কমান্ডার মো: হাবিবের নেতৃত্বে একটি বিজিবি টহল দল তাগলগ বাগ গ্রামে গিয়ে এ ঘটনা কাউকে না জানানোর জন্য ওই কিশোরী ও তার পরিবারকে প্রাণ নাশের হুমকি প্রদান করে। এ সময়ে গ্রামবাসী কৃষ্ণবরণ চাকমাকেও বিজিবি সদস্যরা হুমকি প্রদান করে। বর্তমানে ওই কিশোরীর পরিবার চরম আতঙ্কে ও নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে বলে জানা যায়।”

খবরটি প্রচারের সাথে সাথে পাহাড়ী উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী সত্যাসত্য যাচাই না করেই ব্যাপকভাবে নিউজটি লাইক, শেয়ার, কমেন্ট করে ভাইরাল করতে থাকে। খবরের সূত্র ধরে পার্বত্যনিউজের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি তাগলগ বাগের চন্দ্রালক্ষী কার্বারীর(৪৯) সাথে।

পার্বত্যনিউজকে এই মহিলা কার্বারী বলেন, ঘটনার সময় নদীর ঘাট থেকে বিজিবি সদস্য আলমগীর উপরে উঠছিল। এ সময় মেয়েটি পানি নিতে নিচে নামছিল। কিন্তু রাস্তাটি অত্যন্ত সরু হওয়ায় বিজিবি সদস্যের হাতের সাথে মেয়েটির হাতে ধাক্কা লাগে। এ নিয়ে মেয়েটি তার ভাইকে অভিযোগ করে। মেয়েটির ভাইয়ের অভিযোগের ভিত্তিতে আমি ঘটনাস্থলে যাই। পরে আমি বিষয়টির সমাধান করে দিয়েছে। আপনি যে কথা বলছেন তা সত্য নয়। এখানে নারী নির্যাতন বা ধস্তাধস্তির কোনো ঘটনাই ঘটেনি।

একই কথা বলেন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি রদঙ্গ মোহন চাকমা(৫০)। পার্বত্যনিউজকে তিনি বলেন, বিজিবি সদস্যরা কর্ণফুলি নদী থেকে ক্যাম্পের ঘাট থেকে সাপ্তাহিক বাজার নিয়ে পাহাড়ের উপরে ক্যাম্পে উঠছিলো। এসময় মেয়েটি পানি নিতে নিচে নামছিলো। কিন্তু পাহাড়ে চলাচলের সরু পথ হওয়ায় ভারবাহী বিজিবি সদস্যের বাহু মেয়েটির বাহুতে লাগে। এতে মেয়েটি সেখানেই প্রতিবাদ করলে বিজিবি সদস্য আলমগীর তাকে সরি বলেন। কিন্তু মেয়েটি তাতে সন্তষ্ট না হয়ে তার ভাইকে জানায়। তার ভাইয়ের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে কার্বারীসহ আমরা মেয়েটির বাড়িতে গিয়ে সব শুনি। বিজিবি সদস্যরা সেখানে ঘটনার জন্য সরি বলেন এবং এ ধরণের ঘটনা আর ঘটবে না জানালে আমরা সমস্যার সমাধান করে দিই।

কী সমাধান করেছেন জানতে চাইলে রদঙ্গ মোহন আরো বলেন, বিজিবি সদস্যরা তাদের সদস্য আলমগীরকে ক্যাম্প থেকে প্রত্যাহার করে নেবে বলে আমাদের জানান।

কথা হয় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক হিসাবে সুপরিচিত কামিনী মোহন চাকমার সাথে। তিনি পার্বত্যনিউজকে বলেন, আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। কিন্তু ঘটনাটি প্রচার হওয়ার পর স্থানীয়দের সাথে খোঁজ নিয়ে জেনেছি যে, বিজিবি সদস্যরা ঘাট থেকে উঠছিলো, এ সময় মেয়েটি গোছল করতে নামছিলো। কিন্তু পাহাড়ী ওঠানামার পথ অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ। তাই মেয়েটি শরীরে বিজিবি সদস্যের ছোঁয়া লাগে। বিজিবি সদস্য সরি বলে সাথে সাথে। কিন্তু মেয়েটি তাতে সন্তষ্ট না হয়ে ঘটনাস্থলেই চিৎকার ও চিল্লাচিল্লি শুরু করে লোকজন জড়ো করে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, মেয়েটি একটু উগ্র স্বভাবের। তাই ঘটনাটি এতোদুর গড়িয়েছে। তা না হলে এটা তেমন কোনো ঘটনাই নয়।

স্থানীয় বিজিবি ক্যাম্পের প্লাটুন কমাণ্ডার ক্যাপ্টেন এহসান পার্বত্যনিউজকে বলেন, অভিযোগটি সত্য না হলেও আমরা স্থানীয়দের অনুরোধের প্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিকভাবে বিজিবি সদস্য আলমগীরকে স্থানীয় ক্যাম্প থেকে জোন সদরে প্রত্যাহার করে নিয়েছি।

ছোট হরিণা বিজিবি জোনের ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লে. কর্ণেল আতিক পার্বত্যনিউজকে বলেন, বিজিবি অভ্যন্তরীণভাবে তদন্ত করেও প্রচারিত অভিযোগের কোনো সত্যতা পায়নি।

এ ঘটনার প্রতিবাদে ফেসবুক ব্লগার মো. রিগান ফেসবুকে তার পোস্টে লেখেন,

”তথাকথিত ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ তদন্ত হওয়ার আগে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে এভাবে ঢালাওভাবে মিথ্যাচার করা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত!! পার্বত্য চট্টগ্রামে পান থেকে চুন খসলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর দোষারোপ করে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। বিগত দিনে পার্বত্য চট্টগ্রামের যতগুলা তথাকথিত ধর্ষণের অভিযোগ তুলেছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, পরবর্তীতে তদন্তের পরে দেখা গেছে ধর্ষণের কোনই ঘটনায় ঘটেনি। সব ছিলো সাজানো নাটক। সম্পূর্ণ মিথ্যা বানোয়াট প্রপাগণ্ডা চালিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য সফল করার ব্যর্থ চেষ্টায় করেছে। স্বার্থন্বেষী মহল নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্য হাছিল করতে বরাবরই পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অপপ্রচার করে মান ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করে। …. পার্বত্য চট্টগ্রামের যারা বারবার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিতর্কিত করতে তথাকথিত ধর্ষণের অভিযোগ তোলে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *