টেকনাফে থেমে নেই মানব পাচার, ধরাছোয়ার বাইরে পাচারকারীরা


মানবপাচার

নিজস্ব প্রতিবেদক :

বাংলাদেশে মানব পাচার অনেক পুরনো বিষয় আর এ পাচার থেকে রেহায় পায়নি নারী, শিশু এমনকি বৃদ্ধরাও। ভিন্ন সময়ে ভিন্ন পন্থায় পাচারের শিকার হয় এ জনপদের অসহায় বনি আদম।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিশ্বে এ দেশের মানব পাচার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ইউএনএইচসিআর। সংগঠনটি তাদের প্রতিবেদনে আশংকা প্রকাশ করে বলেন, অভিবাসনের আশায় এখনো সাগরে নৌকা ভাসাতে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী বাংলাদেশ ও মায়ানমারের মানবপাচারকারীরা। প্রশাসনের গতিবিধি লক্ষ্য করে সক্রিয় হয় পাচারকারীরা। এ অবস্থায় সচেতনতামূলক তথ্য দিয়ে পাচারকারীদের দৌরাত্ব সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের অবগত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন এ সংস্থাটি। ইউএনএইচসিআর-এর প্রতিবেদনে অভিবাসন প্রত্যাশী ও শরণার্থীদের নির্মম কিছু তথ্যও তুলে ধরা হয়।

এতে বলা হয়, পাচারকারীদের জাহাজে নৃশংস হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ৭০ জন। থাইল্যান্ড এবং মালেশিয়া সীমান্তে পাচারকারীদের ক্যাম্পের আশেপাশে ও উপকূলের বনজঙ্গলে শত শত গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে যাতে বিশ্ববাসীর লোমকূপ শিহরে উঠেছে। ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছানো অভিবাসীদের মধ্যে ৫৫ শতাংশই শিশু বলে সংস্থাটি দাবী করেন।

বছরের পর বছর নিভৃতে চলছে মানব পাচার। বড় কোন অঘটন না ঘটলে এ বিষয়ে প্রশাসনকে সজাগ থাকতে দেখা যায়না বলে অভিযোগ অনেকের। তবে বিভিন্ন সময়ে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে বিদেশে যাওয়ার সময় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ছোট-বড় অনেক দল আটক হয়েছে। এমনকি ক্রস ফায়ারেও মারা যায় কয়েকজন।

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়- থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের ২৪১ দালালের নিয়ন্ত্রণে চলছে কক্সবাজার সমুদ্র উপকূল দিয়ে মানবপাচার। এতে টেকনাফ হল পাচারকারী বা দালালদের হাট, যেখানে আদম বেচা-কেনা করে আর পাচার করে অজানা গন্তব্যে যার রহস্য পাচারের শিকার ভূক্তভোগী ছাড়া কেউ বোঝেনা। দালালদের লোভনীয় কথা-বার্তায় সরল মানুষ গুলো জীবনের মায়া ছেঁড়ে জীবিকার উদ্দেশ্যে জীবন দিতে প্রস্তুত হয়ে যায়।

এমনই দালালদের একজন টেকনাফ সদর ইউনিয়ন ৪নং ওয়ার্ডের নতুন পল্লান পাড়া এলাকার জালাল আহমদের পুত্র গফুর আলম । যার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ অজানার উদ্দ্যেশ্যে পাড়ি জমাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। অন্যদিকে সে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়েছে যে ছিল একসময়ের রিক্সাওয়ালা ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একই গ্রামে টেকনাফ সদর বিজিবির একজন হাবিলদারের সাথে দীর্ঘ দিনের সখ্যতা গড়ে উঠে তার। সেই সুবাদে সে প্রশাসনের সাথে হাত করে আন্ডারগ্রাউন্ডে চালিয়ে যাচ্ছে মানবপাচার, ইয়াবা ব্যবসা ও কাঠ পাচারের মত জঘন্য মানবতা বিধ্বংসী কাজ। আইনশৃংখলা বাহিনীর তৎপরতা লক্ষ্য করে তার কারবারের ধরণ পাল্টায়, তবে সে কাঠ ব্যবসায়ী হিসেবে মানুষের কাছে নিজেকে জাহির করে।

ইয়াবা সেকশন তার আপন ভাইকে দিয়ে এবং মানবপাচার ও কাঠ পাচার সে নিজেই নিয়ন্ত্রণ করে। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে একাধিক সহযোগীদের মাধ্যমে চালিয়ে যাচ্ছে তার অবৈধ ব্যবসা। তার সহযোগী অনেকের বিভিন্ন মেয়াদে জেল জরিমানাও হয়েছে। মোটা অংকের টাকা, গ্রেপ্তার হলে মুক্তির যাবতীয় খরচ ও তার পরিবারের ভরণ-পোষন ইত্যাদি নানা লোভনীয় নানা সুযোগ দিয়ে সে যোগাড় করে এসব সহকর্মী। গ্রেপ্তার পরবর্তীসময়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর কাছে তার নাম গোপন রাখতে দেওয়া হয় আরও বাড়তি সুযোগ-সুবিধা।

সম্প্রতি প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাড়ায় পাড়ায় মানব পাচারকারীদের তালিকা করা হলেও কৌশলে সে পার পেয়ে যায়। এ তালিকা থেকে নিজেকে আড়ালে রাখতে দায়িত্বপ্রাপ্ত জনপ্রতিনিধি ৪নং ওয়ার্ডের মেম্বারের স্বাক্ষর নকল করে মেম্বারের পূর্বে তার প্রতিপক্ষ ২৫ জনের নাম লিখে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে জমা দেয়। পরবর্তীতে তার কালো তালিকার শিকার ব্যক্তিরা জানতে পারলে তার বিরুদ্ধে নালিশ ডাকে অত্র এলাকার ওয়ার্ড মেম্বার সিরাজুল ইসলামের দপ্তরে। তার তালিকায় এলাকার মান্য-গণ্য মানুষের নাম রয়েছে ।

টেকনাফ সদর ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল আলমের উপস্থিতিতে গত ২৪ শে আগস্ট শত শত এলাকাবাসীর সামনে কানে ধরে স্বীকার করে তার কুকর্মের কথা এবং উপস্থিত জনতার কাছে ক্ষমা চেয়ে সে জানায়, ‘তালিকাভূক্তদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করার জন্য এ তালিকা করা হয়েছিল যা পরবর্তীতে জানাজানি হলে পরিকল্পনা ভন্ডুল হয়ে যায়।’ অপরদিকে স্বাক্ষর জালিয়তির অপরাধে তার বিরুদ্ধে সিরাজুল ইসলাম মেম্বার টেকনাফ থানায় একটি জালিয়াতি মামলা রুজু করেন।

উল্লেখ্য যে, উক্ত গফুর আলমের বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে তার পার্শ্ববর্তী ভাড়া বাসার মিয়ানমারের তরুণীর সাথে অবৈধ সম্পর্কের জের ধরে পরবর্তীতে উক্ত তরুণীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। তার বিরুদ্ধে তারই এক সময়ের সহপাঠী টেকনাফ কচুবনিয়া পাড়ার ইব্রাহীম সিকদারের ছেলে হারুন সিকদারকে অস্ত্র ও ইয়াবা ট্যাবলেট দিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। অপরপক্ষে সচেতন মহল এসব পাচারকারীদের শীঘ্রই গ্রেপ্তারপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না করলে মানবপাচার স্থায়ীভাবে বন্ধ হবেনা বলে মনে করেন।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত গফুর আলম এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তার নাম্বারে সংযোগ পাওয়া যায়নি।

টেকনাফ থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) আতাউর রহমান খন্দকার জানান, ‘মানবপাচারকারী ও ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িতরা যত বড় ক্ষমতাশীল হোক না কেন তাদের গ্রেফতার পূর্বক আইনের আওতায় আনা হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *