টমটমে অস্থির পর্যটন শহর


কক্সবাজার প্রতিনিধি:

কর্তৃপক্ষের দায়সারা মনোভাবের কারণে অনুমোদিত টমটমের ভারে জনজীবন অতিষ্ট হয়ে ওঠেছে কক্সবাজার শহর। এসব টমটমের বেশির ভাগ চালক অদক্ষ এবং কিশোর বয়সের। একারণে প্রতিদিন ঘটছে দুর্ঘটনা। টমটম দুর্ঘটনায় এই পর্যন্ত অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এর পরেও টমটম নিয়ন্ত্রণে তেমন কোন সঠিক পদক্ষেপ নিতে চোখে পড়ছে না।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এমন স্বাক্ষীগোপালের ভূমিকায় থাকায় পর্যটন শহরে দিনের পর দিন টমটমের দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণার ইতি ঘটছে না। শেষ হচ্ছে না সড়ক দুর্ঘটনা ও যানজট। গত ৯ অক্টোবর উত্তর নুনিয়ারছড়ায় টমটমে ওড়না পেচিয়ে এক স্কুল ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। নিহত স্কুল ছাত্রী নুসাইবা হোসেন নিরু। সে স্থানীয় হাজি হাছন আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী এবং ওই এলাকার মুহাম্মদ হোসেনের মেয়ে।

স্থানীয় গিয়াস উদ্দিন নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, বরফমিলের সামনে লোকজন জড়ো হয়েছে গিয়ে দেখেন সেখানে একটি টমটমের সিটে গলায় ওড়না পেচানো এক ছাত্রী পড়ে আছে। সিটে বই-খাতাও দেখা যায়। দ্রুত সদর হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত্যুর বিষয় নিশ্চিত করেন।

এভাবে সাধারণ মানুষের অগোচরে অনেক মানুষ আহত ও নিহতের ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কক্সবাজার পৌরসভা সূত্রে ৩ হাজার টমটমের দাবি করে আসলেও বিভিন্ন সূত্রমতে প্রতিদিন চলছে এই শহরে আনুমানিক ৮ হাজার টমটম। এখনও পর্যন্ত এই টমটমের (ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক) বিআরটিএ থেকে কোন অনুমোদন নেই। পৌরসভা থেকে তাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানিক নাম্বার দিয়ে যা ইচ্ছে করে যাচ্ছে তারা। অভিযোগ আছে প্রতি টমটমের নাম্বারের বিনিময়ে ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা বিক্রি হয়েছে। মেয়র কাউন্সিলরসহ পৌরসভার বেশ কিছু কর্মকর্তা অনৈতিক সুবিধা নিয়েছে বলে তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

কক্সবাজার পৌর টমটম মালিক চালক ঐক্য পরিষদ সভাপতি নাজিম উদ্দিন জানান, অপরিকল্পিত নগরায়নের পাশপাশি কক্সবাজার পৌরসভার যানজটের নগরীতে পরিণত হচ্ছে। সভার আগে দায়ি করবো আমরা পৌর কর্তৃপক্ষকে। তাদের দায়সারা কারণে এসব হচ্ছে। এখানে যাচ্ছে তা হচ্ছে যেন দেখার কেউ নেই। আমরা টমটম মালিক পক্ষের লোকজন হলেও আমরা নিয়মের বাইরে যেতে পারি না। ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে জনস্বার্থ সভার আগে।

এক শ্রেণীর অসাধু ট্রাফিক এই টমটমকে নিয়ে ব্যবসায় নেমেছে। কোন টমটম ধরলে ছাড়া পায় ২২শ টাকায়। ট্রাফিক পুলিশ তাদের অনৈতিক চাওয়া পূরণ না করলে মামলাসহ টমটম জব্দের ভয় দেখায়। এইভাবে আইন প্রয়োগকারীদের কর্তৃক অবৈধ টমটম চালকরা ছাড় পাওয়ায় সড়ক দুর্ঘটনাও হ্রাস পাচ্ছে না। একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে শহরের সড়ক ও উপ-সড়কে।

সচেতনবোদ্ধামহল জানিয়েছেন-একজন মানুষের কেবল সময় অপচয় নয়, আর্থিক ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতির পরিমাণও বাড়িয়ে দিচ্ছে পর্যটন শহর কক্সবাজারের যানজট। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে লোক দেখানো সিদ্ধান্তেই মনযোগী দায়িত্বপ্রাপ্তরা। তাদের কাছে রাস্তা, ফুটপাত সংস্কারসহ কার্যকর সব পরিকল্পনাই উপেক্ষিত। তাই সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ঠেকাতে কোনো আগ্রই নেই। এর বাস্তব উদাহারণ কক্সবাজার শহর। কোনমতেই যানজট পিছু ছাড়ছে না শহরবাসীর। বারবার সিদ্ধান্ত হয় বাসকাউন্টার সরানো ও ফুটপাতমুক্ত করা এবং অবৈধ টমটম গাড়ি জব্দ করা। কিন্তু যতক্ষন সিদ্ধান্ত ততক্ষন আলোচনা। বের হলেই শেষ কার্যকর পদক্ষেপ। এভাবেই চলছে কক্সবাজারের হালদশা। সাধারণ মানুষ কেবল ক্ষোভ-চাপা আর মুখরোচক আলোচনা করে সমালোচনা করছে।

কক্সবাজার পৌর টমটম মালিক ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এইচএম নজরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, আসলে যানজট নিরসনে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেই। মাঝে মধ্যে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসন বৈঠকে বসে সিদ্ধান্তের কথা জানান। কিন্তু বাস্তবায়ন করেনা। আমরা চাই অবৈধ টমটম আর শহরের ভেতর বড় বড় কাউন্টার তুলে দেয়া হউক। তাহলে যানজট অনেকটা কমে যাবে বলে আশা করছি। আবার শহরের বিভিন্ন জায়গায় রাস্তার সমস্যাও রয়েছে। সেক্ষেত্রে রাস্তা মেরামত বা নির্মাণে নজর কম কর্তৃপক্ষের। এ ছাড়া দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের দেখা মিলেনা। এরকম নানাবিধ সমস্যা আছে কক্সবাজার শহরের সড়ক ব্যবস্থাপনায়।

যানজটে ক্ষতির বিষয়ে তিনি বলেন, এর পুরোপুরি হিসাব কারো কাছেই নেই। কারণ প্রতিটি জ্যামে কতক্ষণ অপেক্ষা বা দেরি হচ্ছে, সে হিসাবসহ নানা তথ্য জোগাড় করতে হবে। এসব বিশ্লেষণ করে যানজটের যে ক্ষতি পাওয়া যাবে, তা যে কোনো গবেষণার চেয়েই বেশি হবে।

অবৈধ টমটমে অসহনীয় যানজট:

কক্সবাজার পৌরসভা থেকে লাইসেন্স পাওয়া ব্যাটারি চালিত ইজিবাইকের (টমটম) সংখ্যা ৩ হাজার। কিন্তু বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে পৌর শহরে চলাচল করে প্রায় ৮ হাজার। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে শহরে সড়ক-উপসড়কগুলোও এখন টমটমের দখলে। ফুটপাতসহ যত্রতত্র টমটম পার্কিংয়ের কারণে লোকজনের হাঁটাই দায়। সেই সাথে নৈমিত্তিক সমাস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র যানজট। ৫ মিনিটের পথ অতিক্রম করতে লাগে আধঘন্টা বা এক ঘন্টারও বেশি সময়। যারা টমটম চালায় তাদের বেশির ভাগই অদক্ষ। ফলে হরহামেশাই দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব অভিযোগ কক্সবাজারের সচেতন নাগরিক সমাজের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *