জল-পাহাড়ের দিনরাত্রি



কালপুরুষ অপু::
ভর দুপুরের গনগনে সূর্যটা মাথায় করে থানছি-আলিকদম রোডের তের কিলোমিটার পয়েন্টে জিপ থেকে নামলাম সবাই। শীতের শেষভাগে একটু ঠান্ডা-গরম মেশানো আমেজের সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দিয়ে সূর্য যেন তার সমস্ত রোষ ঢেলে দিচ্ছে এখানটায়। রোদের জন্য শান্তিতে একটু দাঁড়ানো তো দূরে থাক স্পষ্ট করে তাকানোও যাচ্ছে না। কিন্তু পথের শুরুটা এখান থেকেই, আর তাই রোদের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে গাড়ির মেঝেতে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যাকপ্যাকগুলো এক এক করে নামিয়ে আনলাম। এর মাঝে সানি আর তারিফের হাঁকডাক, ‘দাদা চা রেডি! চা তো চলবে তাই না?’ রাস্তার পাশের ছোট্ট দোকনটার দরজায় দাঁড়ানো তারিফের হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়েই একটা লম্বা চুমুক লাগালাম। চা-টা মোটেই সুবিধার নয়, তারপরও আগামী অনেকগুলো দিন দুধ চায়ের কোন আশা নেই। অতএব, জীবনের শেষ চা-য়ের মত অনুভূতি পাওয়ার একটা চেষ্টা চালালাম কিছুক্ষণ। এর মাঝে সবাই দেখলাম ব্যাকপ্যাক নিয়ে তৈরি। সবাইকে কিছু টুকটাক নির্দেশনা আর জিপিএস ম্যাপটায় আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম সবাই।

পথটা শুধুই খাঁড়া পাহাড় বেয়ে নেমে যাওয়া তাই তেমন সমস্যা হচ্ছে না কারোরই। যদিও গরম আর শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে সারা শরীর বেশ চিড়চিড় করছে। তারপরও এই পাহাড় থেকে নিচে নেমে গেলেই দৌছড়ি ঝিরিতে গিয়ে পড়বো এই আশ্বাস পেয়ে সবাই বেশ হড়হড়িয়েই নেমে যাচ্ছে। ঘামে ভেজা শরীর আর তুমুল গরমের পিন্ডি চটকাতে চটকাতে যখন ঝিরিতে এসে নামলাম তখন মনে হচ্ছিলো এর চেয়ে আরামের কিছু আর এই মুহুর্তে হতেই পারে না। মুখে-চোখে পানি দিয়ে, অল্প কিছু সময় জিরিয়ে নিয়ে যখন সতের কেজি ওজনের ব্যাগটা আবার কাঁধে নিলাম তখনই নাদিয়া আর সাগরের যৌথ প্রশ্ন, ‘দাদা পথ কি এখন ঝিরি ধইরা?’ ওদের কথায় সবার দাঁত বের করা হাসির মাঝেই জিনিয়ার দুষ্টামি মাখা প্রশ্ন ‘ঝিরি না হইলে কি তোমরা ব্যাক করবা?’ নতুন পাহাড়ে আসা সাগর অসহায়ের মতো প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে সানির দিকে তাকাতেই দীর্ঘদিনের প্রিয় বন্ধু সানির জবাব ‘তুই এক কাজ কর বন্ধু, যে পথ নাইমা আইলাম ঐ পথ ধইরা চইলা যা।’ এসব খুনসুটি থেকে ওদের দুজনকে মুক্তি দিতেই যেন পাভেল বলে উঠলো,‘চল্ চল্, টেনশনের কিছু নাই এখন থেকে আগামী বেশ কদিন আমরা ঝিরি আর নদী ধরেই এগোবো। এবার ব্যাগ তোল।’

ঝিরির ছায়া ছায়া পরিবেশ, হাজারো পাখির গান, ঝিরঝির করে বইতে থাকা জলধারাকে সাথে নিয়ে হেঁটে চলেছি সবাই। বনের হাজারো মিশ্র শব্দের মাঝে কেউ কেউ গেয়ে উঠছে, ‘উই শেল ওভার কাম’ কিংবা ‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা।’ কখনো সারি বেঁধে, কখনও পাশাপাশি, কখনও কুম পেরিয়ে, কখনও ঘাসের পথ মাড়িয়ে হেঁটে যাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে চলছে, ছবি তোলা আর সানির ভিডিওগ্রাফির কায়দা কসরৎ। প্রায় শুকিয়ে আসা ঝুনঝুনি ঝর্ণার বাঁক ঘুরে, মেনকিউ পাড়া ছাড়িয়ে দৌছড়ি বাজার পৌঁছুতেই বিকেল গড়িয়ে গেছে অনেকটাই। গনগনে সূর্যটাও পাশের উঁচু পাহাড়গুলোর আড়ালে।

শেষ বিকেলের আলোয় কিছুদিন আগে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া দৌছড়ি বাজারকে একটা মৃত্যুপুরীর মতো দেখাচ্ছে। দু-একজন বিচ্ছিন্ন মানুষ ছাড়া কেউ কোথাও নেই। বাজার থেকে টোয়াইন খালে নামার পুরোনো ঘাটটা যেন ভীষণ নিঃসঙ্গতায় তার অতীত জানান দিচ্ছে, একা! ঘাটে কিছুটা সময় চুপচাপ বসে থেকে আবারো পথে নামলাম। এখান থেকে আমাদের পথটা টোয়াইন খাল কিংবা এই পাহাড়ি নদী ধরেই। যেহেতু খুব দ্রুত অন্ধকার নেমে যাবে তাই বেশ তাড়াহুড়ো করেই এগোচ্ছি সবাই। আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রেখেছি আজ রাইতুমনি পাড়া কিংবা বড়ইতলি পাড়ায় কারো ঘরে রাতটা থেকে যাবো। তাই গন্তব্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত বিরতিহীন হেঁটে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। সন্ধ্যার সাথে পাল্লা দিয়ে পড়িমড়ি করে এগোলেও শেষ রক্ষা হল না। চারপাশে ঘোর আঁধার নেমে গেছে ঝুপ করেই। টর্চের আলোয় আর বারবার জিপিএস দেখেও রাস্তা ঠিক রাখা মুশকিল।

সন্ধ্যার প্রায় সাথে সাথেই খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে, নিদ্রা দেবীর সাথে সাক্ষাতের নিয়মিত অভ্যাস পাহাড়ের মানুষগুলোর। তাই একরাশ অন্ধকার গায়ে মেখে যখন আমরা বড়ইতলি পাড়ার যতীন্দ্র তঞ্চংগার বাড়ি পৌঁছেছি তখন পুরো গ্রামের মানুষ বোধহয় স্বপ্নের তেপান্তরে ঘোড়া ছুটোতে ব্যস্ত। ঘরের মানুষজন তো এই রাতে আমাদের দেখে রীতিমত অবাক। ঘরে থাকতে দেবে কি দেবে না এসব আকাশ-পাতাল ভাবনা মাথায় এলেও এই ঘরে এর আগেও দু’বার থাকার সুবাদে রাতে থাকার অনুমতি পেতে বিশেষ সমস্যা হল না। ঠিক হল ঘরের সামনের টানা বারান্দাটায় আমাদের শোবার ব্যবস্থা করা হবে। সন্ধ্যা থেকেই বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা একটা আমেজ থাকলেও সবাই বেশ উৎসাহের সাথেই গোসল সেরে নিলাম টোয়াইনের হিম হিম পানিতে। সাথে করে নিয়ে আসা খাবার-দাবারের সদ্ব্যবহার করে, বেশ আড্ডা-শাড্ডা, তারার ছবি তোলা ইত্যাদির পর অজস্র তারায় ঝিলমিল করতে থাকা আকাশটাকে বিদায় জানিয়ে যখন ঘুমোতে গেলাম তখন বেশ রাত । ঠান্ডাটাও পড়ছে বেশ কনকনিয়ে। যতীন্দ্র দাদার ঘরের মোটা মোটা কাঁথা, নিজেদের সাথে থাকা স্লিপিং ব্যাগ, কম্বল ইত্যাদি জড়িয়ে নিয়েও যেন শীত কমছে না। তারপরও প্রচন্ড ক্লান্তি যে কখন ঘুমে বিবর্তিত হল টের পাইনি।

পরদিন খুব ভোরে বেরুনোর পরিকল্পনা মাথায় থাকলেও ঘুম ভেঙ্গে উঠে, নাস্তা সেরে, ব্যাকপ্যাকগুলো গুছিয়ে নিয়ে আবারো যখন পথে নামলাম তখন বেশ রোদ উঠে গেছে। নদীর এদিকটার পরিবেশ একেবারে অন্যরকম। ছোট-বড় এমনকি অতিকায় পিচ্ছিল সব পাথরের ছড়াছড়ি, বেশ দীর্ঘ আর গভীর সব কুম, আবার সেসব কুমের পাড় ধরে যাওয়া রাস্তাটা কখনও কখনও এতটাই সরু যে নতুনদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছিলো ভারী ব্যাগ নিয়ে ভারসাম্য রাখতে।

তারপরও আগ্রহ, কৌতূহল, উন্মাদনা আর নতুন কিছুর সামনে দাঁড়ানোর উত্তেজনায় সবারই স্নায়ু টানটান। কারো চেহারাতেই কষ্টের বা ক্লান্তির ছিটেফোটাও নেই। বড়ইতলি পাড়ার খুব কাছেই আছে দারুণ সুন্দর একটা ঝর্ণা, যার নাম থান-কোয়াইন। সেখানে পৌঁছে, ঝর্ণার নিচে বেশ খানিকটা সময় বিশ্রাম, ছবি তোলা, ভিডিও ইত্যাদি নিয়ে সময় কাটানোর পর আবারো যাত্রা শুরু। চারপাশের অসাধারণ সব দৃশ্যকে পাশ কাটিয়ে পথ চলেছি। প্রকৃতি এখানে এতটাই উদার যে, কোনদিকে আসলে তাকানো উচিত সেটা ঠিক করতে করতেই আরেকটা সৌন্দর্যের সামনে এসে থমকে যেতে হয়। বাহারি সব রংয়ে রাঙানো বনভূমি, নীলচে সবুজ আঁকাবাঁকা পাথুরে নদী, উদাস বাউলের মতো একটানা গাইতে থাকা পাখির গানের সাথে বয়ে যাওয়া স্রোতের কলকল শব্দ সব মিলেমিশে একাকার। মনে হচ্ছে, অচেনা, অজানা কোন রহস্যপুরীর মাঝ দিয়ে, আদি অকৃত্রিম বুনো গন্ধ গায়ে মেখে যেন পথ করে চলেছি আমরা কজন।

বিরামহীন উদ্যোমে একটানা হেঁটে দুপুরের বেশ কিছু সময় পর আমরা এমন একটা জায়গায় এসে পৌঁছুলাম যেখান থেকে মানুষ চলাচলের নিয়মিত পথটা আমাদের ছেড়ে দিতে হবে। বাম পাশের পাহাড় বেয়ে চলে যাওয়া পথটা সাইংপ্রা ঝর্ণা যাওয়ার পথ আর ডানপাশে শুধুই নদী। আমাদের যেহেতু নদী নিয়েই পরিকল্পনা অতএব, নদীটাই আমাদের পথ। বড়সড় বোল্ডারের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বয়ে চলা নদীটায় নামার আগে একটু বিশ্রামের আশায় সাথে থাকা বিস্কুট-বাদাম ইত্যাদি সহযোগে একটা নাস্তা পর্বের আয়োজনে লেগে গেলাম আমরা ক’জন। জিনিয়া একটা পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে ছবি তুলছে। সানি গোসল করবে ভেবে নদীতে নেমে হাঁটুজলে ডুব দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। এর মাঝে হঠাৎ করেই নদীর স্রোতে কেমন যেন একটা পরিবর্তন লক্ষ করলাম। স্রোতটা মনে হলো একটু বেড়ে গেছে। তার সাথে যোগ হয়েছে একরাশ শুকনো পাতা আর ডালপালা। মুহুর্তেই বুঝে গেলাম হড়কা বান! কিন্তু কিছুতেই মাথায় আসছে না, এই হড়কা বানের কারণ কী!

আকাশে মেঘের ছিটেফোঁটাও নেই, বৃষ্টি তো দূরের কথা! ইতোমধ্যে সানি আর জিনিয়া নদী ছেড়ে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের সবার অবাক চোখের সামনে দিয়ে ক্রমশ বাড়ছে স্রোত। নিমিষেই হাঁটুজলের শান্ত নদীটা পরিণত হয়েছে তীব্র খরস্রোতা গভীর নদীতে। জিনিয়ার হেলান দিয়ে দাঁড়ানো বিশাল পাথরটা ডুবে গিয়ে পানি এখন তীরে দাঁড়ানো আমাদের পা ছুঁই ছুঁই। তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিলাম নদী পার হয়ে যেতে হবে আমাদের। ওপাড়ের পাথুরে দেয়ালটা তেমন সহজ না হলেও ওটা ধরে অন্তত এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও হতে পারে কিন্তু এপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকলে কতটুকু কী হবে বোঝা যাচ্ছে না। অতএব, এখানে আটকে থাকার কোন মানে নেই।

অপেক্ষাকৃত কম গভীর একটা জায়গা খুঁজে নিয়ে, আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা শুকনো বাঁশ আর কাঠের সাহায্যে স্রোতের উপর একটা ব্রিজের মতো তৈরি করে কিছুটা ঝুঁকি নিয়েই পাড় হয়ে গেলাম সবাই। নদী পেরুনোর পর শুরু হল নতুন বিপদ। ওপাড় থেকে যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়ে দশগুণ ভয়ংকর পাথুরে দেয়ালটা। কোথাও পা রাখার জায়গাটুকুও নেই। খুব সাবধানে একটু একটু করে এগোচ্ছি। একবার পা হড়কে গেলে সোজা বিশ-পঁচিশ ফুট নিচের পাথরে আছড়ে পড়ার পর কি হবে ভাবতেই বুকটা হিম হয়ে যাচ্ছে। ভারী ব্যাগগুলো পিঠে নিয়ে, কোনরকম নিরাপত্তা ছাড়াই, ইঞ্চি ইঞ্চি করে পুরো দেয়ালটা কিভাবে পার হয়ে আবারো নদীর কাছাকাছি নেমে এসেছি জানা নেই। কিন্তু সব মিলিয়ে আধা কিলোমিটারের কাছাকাছি ভয়ংকর এই দেয়ালটা পার হতে হতেই দেখা গেল সূর্যদেব বাড়ির পথ ধরেছে।

এর ভিতর লক্ষ করলাম নদীর গভীরতাও কমছে। হঠাৎ নেমে আসা প্লাবনের তীব্রতাও কমেছে একইসাথে। স্রোতের পাশের মাথা তুলে থাকা পাথরগুলোর উপর পা ফেলে ফেলে বেশ ভালোই হাঁটা যাচ্ছে। কিন্তু কিছুদূর এগিয়ে যাবার পর যা দেখলাম তার যেন কোন তুলনাই চলে না। কোনদিকে হেঁটে যাওয়ার মতো পথের চিহ্নমাত্র না রেখে, পথরোধ করে বসে থাকা অতলস্পর্শী কুমটা দেখে মনে হলো, হাপ ছেড়ে বেঁচে যাওয়া আমাদের সাথে নিতান্ত সস্তা রসিকতায় মগ্ন পুরো প্রকৃতি! আশেপাশে পাহাড়ের উপর একটা গ্রাম থাকার কথা থাকলেও সেটায় যাবার কোন পথ আপাতত চোখে পড়ছে না। অথচ এই জল পাহাড়ের খাঁজে আটকে পড়া আমাদের চারপাশের আলো মুছে গিয়ে ক্রমশ নেমে আসছে অন্ধকার!

যেহেতু এই অভিযানে সবগুলো রাত পাহাড়ি গ্রামে থাকার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছি তাই সাথে করে কোন তাবু বা সেল্টার নিয়ে আসার প্রয়োজন বোধ করিনি কেউ। নিজেদের খুব নির্বোধ মনে হলেও এই মুহুর্তে এসব ভাবার সময় নেই। রাতটা এখানেই কাটাতে হবে তাই তাড়াতাড়ি লেগে পড়লাম একটা সেল্টার বানানোর যোগাড়যন্ত্রে। এদিক সেদিক ঘুরে একটা ক্যাম্পসাইট খুঁজে নিয়ে, কলাপাতা আর বাঁশ সংগ্রহ করে সেল্টার বানানো শুরু করতেই দেখলাম পাশের পাহাড়ের জঙ্গল থেকে হুড়োহুড়ি করে নেমে আসছে স্থানীয় কিছু পাহাড়ি মানুষ। কথা বলে জানা গেল, নদী বেয়ে কাঠ নামানোর কাজে ওরা এখানে আছে। এও জানা গেল ভারী কাঠ ভাসিয়ে নেয়ার জন্যই ওরা পানিতে বাঁধ দিয়েছিলো, যা ছেড়ে দেয়ার ফলে ঐ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি। তাদেরকে আমাদের দুরবস্থার কথা জানাতেই আশ্বাস দিল যে, ‘আমরাও আজ এখানে থাকবো। অতএব, তোমাদের চিন্তার কিছু নেই। এমনকি তোমরা চাইলে আমাদের সাথে খাওয়া দাওয়াও করতে পার।’ নিমিষেই বদলে গেল গোটা পরিস্থিতি। আমাদের আলাদা সেল্টার বানাতে না দিয়ে সবার জন্য একটা বিশাল সেল্টার তৈরি হয়ে গেল খুব দ্রুততার সাথেই। ধোঁয়া উঠা গরম ভাতের সাথে সবজি আর নদীর মাছ মিলিয়ে দারুণ একটা রাতের খাবার, ক্যাম্পফায়ারের চারধারে বসে বেশ রাত পর্যন্ত জমজমাট আড্ডা সব মিলেমিশে যেন একাকার।

ভোরে উঠে তৈরি হয়ে নিলাম সবাই। যেহেতু সাঁতার এবং পাহাড়ের উপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া গভীর কুমটা পেরুনোর আর কোন উপায় নেই, তাই ঠিক হল ওদের কয়েকজন আমাদের সাথে পাহাড়ের উপরের গ্রামটা পর্যন্ত যাবে। বেশ জংলা আর খাড়াই একটা পথ বেয়ে পাহাড়ের মাথায় পরীখোলা পাড়ায় যখন পৌঁছেছি তখন দেখলাম সবার মাঝেই গতদিনের কষ্ট আর ক্লান্তি ভর করে আছে। সবার একটাই চাওয়া আমরা এখানে একটু বিশ্রাম নেই আজ। পথ যেহেতু অনেক বাকী তাই ভাবলাম ওদের একটু ছাড় দেয়া উচিত। তবে শর্ত একটাই, এ পাড়ায় আমরা থাকব না তার চেয়ে বরং নিচে নেমে গিয়ে নদীর ধারে জিপিএস-এ মার্ক করা কয়েকটা বাড়ি আছে সেখানে গিয়ে থাকবো। শর্তে রাজী হয়ে বেশ খুশি মনেই এই বিশ্রামের সময়টুকু পুরোদমে উপভোগ করতে লেগে গেল পুরো টিম। সারাটা দুপুর গ্রামে কাটিয়ে, খেয়ে দেয়ে বিকেল নাগাদ ঐ বাড়িগুলোতে গিয়ে পৌঁছুতেই বুঝতে পারলাম ভাগ্যদেবী কোনভাবে হয়ত আমাদের উপর বেশ নাখোশ হয়ে আছে। পাশাপাশি দুটো ঘরের কোনটাতেই আমাদের থাকার জায়গা হল না। পাহাড়ের মানুষগুলো সাধারণত বেশ আন্তরিক হয় কিন্তু খুব অবাক কারণে এই মানুষগুলোকে বেশ অন্যরকম মনে হলো।

কোনভাবেই যখন ওদের রাজী করাতে পারলাম না তখন ভাবলাম, গতরাতের বুদ্ধিটাই কাজে লাগাই। আবারো নদীতে নেমে এসে একটা দারুণ ক্যাম্পসাইট খুঁজে বের করলাম। বিশাল একটা অগভীর কুম আর তার পরেই একটা ছোট্ট অথচ বেশ চওড়া জলপ্রপাত, পরবর্তিতে আমরা যেটার নাম রেখেছিলাম মিনি ক্যাসকেইড। একপাশে স্রোতের টানে জমে আসা একটা ছোট্ট বালির চর। ঠিক হলো এখানেই সেল্টারটা বানাবো। যা ভাবা সেই কাজ। কয়েকটা দলে ভাগ হয়ে গিয়ে, একে একে কলাপাতা, বাঁশ, আগুন জ্বালানোর মতো লাকড়ি ইত্যাদি সংগ্রহ করে আমরা সাতজন মিলে তৈরি করে ফেললাম দারুণ আরামদায়ক একটা সেল্টার। নিজেদের কাজ দেখে বলা চলে নিজেরাই মুগ্ধ। গ্রাম থেকে নিয়ে আসা আর সাথে থাকা খাবার মিলিয়ে খাওয়া দাওয়াটাও হলো বেশ চমৎকার।

খাওয়া-দাওয়ার পর গল্প-গুজবের একফাঁকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলো, এত দারুণ একটা জায়গা আর এত যত্ন করে বানানো সেল্টারে মাত্র একরাত থাকা কোনভাবেই যৌক্তিক কিছু হতে পারে না। এটা একেবারেই অন্যায় এবং কিছুটা অপচয়ও বটে! আমাদের আরো অন্তত একদিন এখানে থাকা উচিত। যুক্তি, পাল্টা যুক্তি ইত্যাদির পর সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, যেহেতু আমাদের তেমন কোন তাড়াহুড়ো নেই অতএব, এখানে আরো একটা দিন না হয় থেকেই যাই! কারো কোন দ্বিমত থাকার প্রশ্নই আসছে না; আর তাই প্রচন্ড ভালোলাগা আর ভালোবাসার তীব্র সম্মোহন, আদিম জীবন-যাপনের দুনির্বার আকর্ষণ, যান্ত্রিক নাগরিকতা থেকে অনেক অনেক দূরের এই ঘোরলাগা প্রকৃতি সব মিলিয়ে হাসি, গান, আড্ডায় কাটিয়ে দিলাম দু-দুটো দিন। এই পুরোটা সময় যেন হড়কা বানের স্রোতের মতই নিমিষে ভেসে গেল কালের গর্ভে। ছেড়ে যাওয়ার প্রচন্ড অনিচ্ছা স্বত্তেও, তৃতীয় দিন ভোরবেলা আবারো সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে শুরু হল আমাদের পথচলা।

সবুজের কোমলতায় মাখামাখি, ছায়া সুনিবিড় রূপকথার গল্পের মতো অসাধারণ সুন্দর এই দেশ। যেখানে সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বেলে উড়ে চলা জোনাকির ডানায় ভর করে নেমে আসে এক একটি রাত। লজ্জাবতীর বনে শুয়ে থাকা শিশির কণায় সূর্যের প্রতিফলনে যেখানে জন্ম নেয় প্রতিটি নতুন নতুন দিন। হারানো পথের বাঁকে আরো একবার হারিয়ে যাওয়ার অবিরত আহ্বানে যেথা রোদ্দুরের দল হাতছানি দিয়ে ডাকে সারাটা দুপুর। যেখানে সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে অবাধ্য কিশোরীর মতো ছুটে চলা চঞ্চল স্রোত প্রতিনিয়ত বিবর্তিত হয় উদ্দাম, উন্মাদ, তরলিত প্রপাতে। এসব বিচ্ছিন্ন ভাবনায় বিভোর মন, পিঠে ভারী ব্যাকপ্যাক, চোখে আরো নতুন নতুন কিছুর সামনে দাঁড়ানোর অদম্য কৌতূহল নিয়ে পথ চলেছি আমরা সবাই। এবারের গন্তব্য টোয়াইনের অনেক উজানের এক অজানা-অচেনা গ্রাম, রালাই পাড়ার অভিমুখে।

সূত্র: পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ, সংখ্যা ২ ও ৩

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *