মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয় নি: সুলতানা কামাল


 

নিজস্ব প্রতিনিধি:

মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য এ দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয় নি। মানুষের মুক্তির জন্য স্বাধীনতার সময় মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এদেশের মানুষের নিরাপত্তার জন্য মক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৯মার্চ) সকালে ডেইলি স্টার সেমিনার হলে কাপেং ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘বাংলাদেশের আদিবাসীদের মানবাধিকার রিপোর্ট ২০১৭’ এর মোড়ক উন্মোচন ও আলোচনা সভায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের দল। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করেছে। তারা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দেশে কি করে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়।

পাহাড়িদের নিরাপত্তা দিতে হবে এ দেশের সরকারকে দাবি করে সুলতানা কামাল বলেন, আমরা পাহাড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন হতে দেব না। তারা কেন এদেশে নিরাপত্তা পাবে না। এখন অনেক নাগরিক সমাজও পাহাড়ের মানুষের অধিকারের জন্য এগিয়ে আসছে।

তিনি বলেন, কেউ নাগরিক সমাজের অধিকারকে খর্ব করতে পারে না কারণ মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ।এসময় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

কাপেং ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন রবীন্দ্রনাথ সরেন এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস উষাতন তালুকদার এমপি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক বাঞ্চিতা চাকমা, অক্সফামের প্রোগাম ডিরেক্টর এমবি আক্তার ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং প্রমূখ।

আইন ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মন্তব্য করে ঊষাতন তালুকদার এমপি বলেন, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের বাগদা ফার্মে পুলিশ সরাসরি গিয়ে আদিবাসীদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন। আইন সেখানে অন্ধ। সাধারণ নাগরিক সেখানে অসহায়। সরকারও যদি সেখানে নিরুপায় হয় তাহলে সরকার কিভাবে কাজ করবে।

অধ্যাপক বাঞ্চিতা চাকমা বলেন পার্বত্য চট্টগ্রামে বেশিরভাগ মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনা ঘটে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারাই। কিন্তু নিরাপত্তা বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত কোন ঘটনার তদন্ত করা যাবে না-দেশের এমন আইন সংশোধন করতে হবে।

সঞ্জীব দ্রং বলেন, দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন হবে কিন্তু বিচার হবে না এটা হতে পারে না। কয়েক বছর আগে ঢাকা শহরে একজন গারো মেয়ে মাইক্রোবাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল কিন্তু এখন সে মেয়ে বা মামলার কি অবস্থা সে খবর আমরা কেউ রাখি না। আমরা চাই, সরকার যেন এ প্রতিবেদন ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণে উৎসাহী হয়।

কাপেংয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নারীদের প্রতি সহিংসতা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র।’ নারীদের প্রতি সহিংসতার মধ্যে আছে ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, ধর্ষণের চেষ্টা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অপহরণ ও পাচার।

‘বাংলাদেশের আদিবাসীদের মানবাধিকার রিপোর্ট ২০১৭’তে বলা হয়:

দেশের সমতল ও পার্বত্য চট্টগ্রামে গত বছর ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নয়জন নারী হত্যার শিকার হয়েছেন। গত ১০ বছরের মধ্যে এ সংখ্যা সর্বোচ্চ। ২০১৭ সালে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের যে পরিমাণ ভূমি অধিগ্রহণ বা অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্যে আনা হয়েছে, তাও এর আগের বছরের তুলনায় বেশি। ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানবাধিকার সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশনের মানবাধিকার প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। সংগঠনটি ২০০৭ সাল থেকে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আসছে। এসব পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবছরই কাপেং মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০১৭ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কাপেংয়ের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে কাপেং মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। সংগঠনটির মানবাধিকারকর্মীদের দল এ তথ্য সংগ্রহ করেন। গত বছর ৪৮টি ঘটনায় ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ৫৮জন নারী ও মেয়ে শিশু যৌন বা শারীরিকভাবে আক্রমণের শিকার হন। ঘটনাগুলোর মধ্যে ২৮টি ঘটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে, ২০টি সমতলে। আর এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযুক্ত ৬৮জন অপরাধীর মধ্যে ৫৪ জনই বাঙালি, চারজন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার।

২০১৭ সালে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার যে নয় নারী হত্যার শিকার হয়েছেন, তাদের ছয়জনই পাহাড়ি। বাকি তিন ঘটনা ঘটেছে হবিগঞ্জ, দিনাজপুর ও সিরাজগঞ্জ জেলায়।

কাপেংয়ের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৮ সালে একজন নারী হত্যার শিকার হন। এর পরের বছর হত্যার শিকার হন চারজন নারী। ২০১৬ সালে হত্যার শিকার হওয়া নারীর সংখ্যা ছিল ছয়।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, ‘স্বীকার করি, কাঙ্ক্ষিত ফল কমিশন দিতে পারে না। আমাদের সুপারিশে অনেক সময় কাজ হয় না। রাষ্ট্রকে এ বিষয়ে সহনশীল হতে হবে।’ তিনি বলেন, নয়জন নারী হত্যার শিকার হওয়ার ঘটনা নিঃসন্দেহে আতঙ্কজনক।

 ভূমি অধিগ্রহণ:

২০১৭ সালে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রায় ২০ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ বা অধিগ্রহণের প্রক্রিয়ার অধীনে আনা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, পর্যটন কমপ্লেক্স, ব্যবসায়িক কাজ এবং সংরক্ষিত বনভূমির নামে এসব অধিগ্রহণ হয়। মৌলভীবাজার জেলার খাসিপুঞ্জির খাসি এবং টাঙ্গাইলের মধুপুরের গারোরা অধিগ্রহণ এবং সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণার কারণে উচ্ছেদের আতঙ্কের মধ্যে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটনের জন্য শত শত একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্থাপনা নির্মাণের জন্যও উচ্ছেদ হতে হয়েছে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষকে।

২০১৬ সালে বিভিন্ন ভূমি অধিগ্রহণের পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৪২৯ একর। পরের বছর অন্তত পাঁচ হাজার একর বেশি ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়ায় গেছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *