চুক্তির দুই দশকেও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি পার্বত্যাঞ্চলে


২ ডিসেম্বর ২০১৭, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি তথা শান্তিচুক্তির দুই দশক পূর্তি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বহুল আলোচিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে সমাজে বহুল বিতর্ক রয়েছে। কারো মতে চুক্তির সাফল্য গগনচুম্বি আবার কারো মতে, চুক্তির ব্যর্থতা পর্বত প্রমাণ। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই দশক উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের প্রতিক্রিয়া নিয়ে পার্বত্যনিউজের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার প্রতিবেদনের আজ প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় পর্ব। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পার্বত্যনিউজের বান্দরবান ব্যুরো প্রধান মো. জমির উদ্দীন

 

 

শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করে পার্বত্য জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সহ সাংগঠনিক সম্পাদক কেএস মং বলেন, সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক নয়। যদি আন্তরিক হত তাহলে নেতা কর্মীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করত না। চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে সরকার প্রমাণ করেছে তারা চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক নয়।

সরকারী দলের নেতা বান্দরবান জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি একেএম জাহাঙ্গীর বলেন, শান্তি চুক্তির ফলে তিন পার্বত্য জেলায় ব্যাপক উন্নয়ন ও শিক্ষার হার বেড়েছে। সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক বলেই ইতোমধ্যে চুক্তির ৯০ ভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। কিছু কিছু বিষয় সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক বলে এখনো পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি। সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে কথা রেখেছে কিন্তু জেএসএস তাদের কথা রাখেনি। এখনো পাহাড়ে সন্ত্রাস চাঁদাবাজি গুম খুন বন্ধ হয়নি। তারা সরকারকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চুক্তি বাস্তবায়নে বাধ্য করতে চাইছে। কিন্তু এটা কখনো মেনে নেয়া হবে না।

তিনি জেএসএসকে পাহাড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ছেড়ে আলোচনায় আসারও আহবান জানান। পরস্পর আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলেও তিনি মনে করেন।

জেএসএস বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি উছোমং মার্মা বলেন, চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্য সরকার হাত দেয়নি। ৩৬টি বিভাগের মধ্য ১১টি পূর্ণাঙ্গ, ৬টি আংশিক বাস্তবায়ন করেছে। এছাড়া সরকারা আঞ্চলিক পরিষদের বিধিবিধানে কোন কাজ করেনি। একারণে জেলা পরিষদগুলো আঞ্চলিক পরিষদের নেতৃত্ব মানছে না।
পাহাড়ে সন্ত্রাস প্রসঙ্গে বলেন, জেএসএস’র সশস্ত্র বাহিনী চুক্তির সময় অস্ত্র জমা দিয়েছে। তাদের হাতে যদি অস্ত্র থাকত তাহলে পাহাড়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে ৫০০ কর্মী নিহত হত না। জেএসএস সংগঠনের নামে বদনাম দিতে কতিপয় সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী সন্ত্রাস, অপহরণ,খুন ও চাঁদাবাজী কার্যকলাপ চালিয়ে চাচ্ছে। এরজন্য তিনি সরকারী আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে দায়ী করছেন।

তিনি বলেন, উন্নয়ন সর্বস্তরে হতে হয়। সে হিসাবে বান্দরবানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি ও শিক্ষার হার বৃদ্ধি পায়নি।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ সংবিধানের সাথে শান্তি চুক্তি কোথাও সাংঘর্ষিকতা নেই। চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারই প্রধান বাধা দিচ্ছে। এছাড়া দেশীয় ও বিদেশী চক্রান্ত রয়েছে।

তিনি এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, চুক্তিকালে বিএনপি বিরোধিতা করেছিল। বিএনপির দু-বারের শাসনামলে চুক্তির আটটি বিভাগ জেলা পরিষদে হস্তান্তর করেছে। চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন করা হলে পাহাড়ে শান্তির সুবাতাস উপজাতি-বাঙ্গালী গ্রহণ করতে পাবে।
এদিকে শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় পার্বত্যঞ্চলের পরিবেশ আবারো ধীরে ধীরে পূর্বের দিকে ফিরে যাচ্ছে বলে মনে করেন জনসংহতি সমিতির বান্দরবান জেলার সাধারণ সম্পাদক ক্যবা মং মার্মা। তিনি বলেন চুক্তি বাস্তবায়নের পূর্বে পাহাড়ে যে পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল বর্তমানে পার্বত্যাঞ্চলে সে পরিবেশ বিরাজ করছে। চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হলে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যেতে পারে। তাই পার্বত্যঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষে সরকারকে অবিলম্বে শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবী জানান। অন্যথায় উদ্ভূত পরিস্থিতির দায় সরকারকেই নিতে হবে বলে জানান তিনি।

বান্দরবান জেলা শাখার ইউপিডিএফ সভাপতি ছোটন কান্তি তঞ্চংঙ্গ্যা বলেন, শান্তি চুক্তি দিয়ে পাহাড়ীদের অধিকার আদায় হবেনা। শান্তি চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা হলেও পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির ছোট ছোট সম্প্রাদায়গুলো বিলীন হয়ে যাবে। শান্তি চুক্তি করে সন্তু লারমা রাষ্ট্রীয় চেয়ারে বসে ভোগ বিলাস একা করছেন না তার সাথে কতিপয় কতিপয় সাঙ্গপাঙ্গরাও বিভিন্ন সুযোগসুবিধা ভোগ করছেন।

তিনি বাঙ্গালীদের অধিকার আন্দোলন নিয়ে বলেন, আমরা আমাদের অধিকারের জন্য আন্দোলন করছি। তাদেরও আন্দোলন করার অধিকার আছে। পার্বত্য এলাকায় সেটেলার সমস্যার জন্য সরকারই দায়ী।

বাঙালীদের প্রতি বৈষম্য করে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন করা হলেও পার্বত্য অঞ্চলে কাঙ্ক্ষিত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি এমন অভিযোগ করে পার্বত্য নাগরিক পরিষদের বান্দরবান জেলার সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন, সরকার যে উদ্দেশ্যে শান্তি চুক্তি করেছিল সে উদ্দেশ্য সাধিত হয়নি। কেন না পাহাড়ে গুম খুন চাঁদাবাজি এখনো বিরাজমান রয়েছে। একটি পক্ষ পাহাড়ে খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, চুক্তি লংঘন করে আসছে। সে হিসেবে চুক্তিটি বাতিল করে জেএসএসসহ পাহাড়ীদের নতুন সংগঠন ও বাঙ্গালীদের অধিকার আদায়ের সংগঠনগুলোর সাথে সরকার গঠনমূলক আলাপ করে নতুন চুক্তির দাবী জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *