চাকমা: আদিবাসী নয় বহিরাগত


আবদুস সাত্তার

আবদুস সাত্তার

পার্বত্য চট্রগ্রামে উপজাতিদের মধ্যে চাকমা, মগ, মুরং, কুকি, বনজোগী, পাঙ্খো, লুসাই, তংচঙ্গা, টিপরা (ত্রিপুরা) এবং সেন্দুজ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। টিপরারা হিন্দুধর্মাবলম্বী, মগ ও চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং অপরাপর জাতির মধ্যে কেউ কেউ  নিজেদেরকে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী বলে স্বীকার করলেও ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক জীবনের রীতিনীতিতে তাদের বৈসাদৃশ্য লক্ষণীয়। পার্বত্য চট্রগ্রাম পূর্বে চট্রগ্রামের সাথে যুক্ত ছিল। পাহাড়ি জাতিদের আলাদা বৈশিষ্ট্যের দাবিতে ১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দের ১ আগস্ট পার্বত্য চট্রগ্রাম স্বতন্ত্র জেলার মর্যাদা লাভ করে।[i]

চাকমারা কোথা থেকে এখানে এসেছে এবং এদের উৎপত্তিই-বা কোথায়, এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই মনে আসে। উপজাতিদের উদ্ভব ও বসতি বিস্তার সম্পর্কে সবকিছু জানা সম্ভব না হলেও এ সম্পর্কে আমাদের মন সব সময়েই কৌতূহলী ও উৎসুক। চাকমা জাতি যে এককালে ব্রক্ষ্মদেশে ছিল, সে সম্বন্ধে কর্নেল ফেইরী আলোকপাত করেছেন।[ii] ব্রক্ষ্মদেশে পুরাবৃত্ত ‘চুইজং ক্য থং’ এবং আরাকান কাহিনী ‘দেঙ্গাওয়াদি আরেদফুং’ নামক গ্রন্থদ্বয়েও অনুরূপ উল্লেখ রয়েছে।

‘দেঙ্গাওয়াদি আরেদফুং’ গ্রন্থেও বর্ণনা অনুযায়ী ৪৮০ মগাব্দে (খ্রীষ্টীয় ১১১৮-১৯ সালে) চাকমাদের সর্বপ্রথম উল্লেখ পরিদৃষ্ট হয়। ‘‘ এ সময়ে পেগো (আধুনিক পেগু) দেশে আলং চিছু নামে জনৈক রাজা ছিলেন। পশ্চিমের বাঙালিদিগের সহিত মিলিত হয়ে চাকমাগণ তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ উপস্থিত করে। পেগো রাজা স্বীয় প্রধানমন্ত্রী কোরেংগরীকে সেনাপতি পদে বরণ করিয়া যুদ্ধার্থে প্রেরণ করিলেন। তিনি যুদ্ধ স্থলে উপনীত হইলে একটি সারসপক্ষী একখানি মৃত প্রাণীর চর্ম মুখে লইয়া তাঁহার সম্মুখে পতিত হইল। তিন তাহাকে ধরিয়া রাজার শিবিরে লইয়া গেলেন এবং বুঝিয়া দিলেন যে, এই সারস বাঙালি ও চর্মখানি-চাকমা, উভয়ের মিত্রতা ঘটিয়েছে। কিন্তু আমাদের এই যুদ্ধে নিশ্চয়ই বাঙালি ও চাকমাগণ এই সারসের ন্যায় বশ্যতা স্বীকার করিবে।

‘‘রাজা মন্ত্রীর এহেন যুক্তিগর্ভ আশ্বাস বাক্যে অতিশয় আহলাদিত হইয়া তাহাকে একটি হস্তী উপহার প্রদান করেন। অনন্তর হঠাৎ চতুর্দিকে নানা অশুভ লক্ষণ দেখা দিল, পবিত্র ‘মহামুনি’ মূর্তি স্বেদসিক্ত হইলেন। ঘন ঘন অশনি নিপাত, অকাল বৃষ্টি সমন্তাৎ হাহাকার পড়িয়া গেল। রাজা যুদ্ধে ক্ষান্ত হইয়া এই অমঙ্গল শান্তির নিমিত্ত পুরোহিতকে শতমুদ্রা প্রদান করিলেন।

‘‘ এই ঘটনার বহুকাল পরে আনালুম্বা নামক পেগু রাজার শাসন সময়ে পুনরায় বাঙালি ও চাকমাগণ মিলিয়া উত্থিত হয়। রাজা পঞ্চাশ হাজার সৈন্য লইয়া দাম্বাজিয়াকে সেনাপতি করিয়া পাঠাইলেন। দাম্বাজিয়া যাত্রা করিয়া সম্মুখে দেখিলেন একটি বক ও একটি কাক ঝগড়া করিতেছে, অবশেষে বক কাকের ডানা ভাঙ্গিয়া দিল। তিনি রাজার নিকট আসিয়া ইহা বিবৃত ককরিলেন। মন্ত্রী বুঝিয়া দিলেন, এই কাক বাঙালি এবং বক আমরা। ইহা দ্বারা সুস্পষ্ট দেখা যাইতেছে, এই যুদ্ধে আমাদের জয়লাভ নিশ্চিত। ‘‘সেনাপতি অমিত-উৎসাহে যুদ্ধারম্ভ করিলেন। পাঁচদিন অবিরাম যুদ্ধের পর বাঙালি ও চাকমাগণ পলায়ন করে।’’[iii]

ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত রাজমালায়ও[iv] একই কথার প্রতিধ্বনি বর্তমান। এ সম্বন্ধে ১৭৮৭ খ্রীস্টাব্দের ২জুন তারিখে চট্রগ্রামের তদানীন্তন শাসনকর্তাকে লিখিত ব্রক্ষ্মরাজের একটি চিঠির উদ্ধৃতি থেকেই আমাদের বক্তব্যের যথার্থতার কিছুটা প্রমাণ মিলবে:

‘আমরা পরস্পর এতদিন বন্ধুত্বসূত্রে আবদ্ধ ছিলাম এবং এক দেশের অধিবাসীরা অন্য দেশের অধিবাসীদের সাথে অবাধ মেলামেশা করতে পারতো। …ত্রুটি নামে এক ব্যক্তি আমাদের সাম্রাজ্য থেকে পালিয়ে গিয়ে আপনার সাম্রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছে। তাকে জোরপূর্বক আনার ইচ্ছে আমাদের ছিল না বলেই তাকে ফিরিয়ে দেবার অনুরোধ করে আমরা আপনাদের কাছে বিনয়সহকারে চিঠি লিখেছিলাম। কিন্তু আপনারা তাকে ফেরত পাঠাতে অস্বীকার করেন। আমাদের সাম্রাজ্যের পরিধি নেহাৎ কম নয় এবং ত্রুটি তার অবাধ্য আচরণে আমাদের রাজশক্তির অবমাননা ও শান্তি ভঙ্গ করেছে।…ডোমকান, চাকমা, কিরুপা, লেইস, মুরং এবং অন্যান্য জাতির লোকও আরাকান থেকে পালিয়ে গিয়েছে ও আপনাদের দেশের পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমানে তারা সীমান্তবর্তী উভয়দেশের অধিবাসীদের উপর অত্যাচার ও লুটতরাজ করেছে। তাছাড়া, তারা নাফ নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের একজন খ্রীস্টানকে হত্যা করে তার যথাসর্বস্ব হরণ করে নিয়ে গেছে। এই কথা শুনে আমি একদল সৈন্য নিয়ে সীমান্ত এলাকায় এসেছি তাদের ধরে নেবার জন্যে। যেহেতু, তারা আমাদের সাম্রাজ্যের অধিবাসী এবং আমাদের রাজশক্তির অবমাননা করে বর্তমানে ডাকাতি বৃত্তি গ্রহণ করেছে। …তাদেরকে আশ্রয় দেয়া আমাদের পক্ষে মোটেই সমীচীন নয় এবং মগরা যারা আরাকান থেকে পালিয়ে গিয়েছে, তাদেরকেও ফেরত পাঠাতে যথাবিহিত ব্যবস্থা করবেন। এতে আমাদের পরস্পরেরর বন্ধুত্বসূত্র আরও দৃঢ় হবে এবং দুই দেশের পথিক এবং ব্যবসায়ীরাও ডাকাতির হাত থেকে অব্যাহতি পাবে।… মোহাম্মদ ওয়াসিমের মারফত এই চিঠি পাঠাচ্ছি। চিঠি পেয়ে যথাবিহিত ব্যবস্থা করবেন এবং অনুগ্রহ করে চিঠিটার উত্তরও তাড়াতাড়ি দিবেন।…’

এ চিঠির উত্তরে কি বলা হয়েছিল তা অবশ্য আমাদের প্রতিপাদ্য নয়, তবে চিঠিটার ঐতিহাসিক মূল্য যে যথেষ্ট তাতে সন্দেহ নেই। এ থেকে চাকমারা কি করে ব্রক্ষ্মদেশ থেকে চট্রগ্রামে আগমন করেছিল তার হদিস পাওয়া যায়।

শাসন ব্যবস্থার সুবিধার জন্য বেঙ্গল গভর্নমেন্ট ১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দের পহেলা সেপ্টেম্বর[v] এই বিস্তৃত পার্বত্যভূমিকে তিনটি সার্কেল যথা: চাকমা সার্কেল, বোমাং সার্কেল ও মঙ সার্কেলে বিভক্ত করেন এবং প্রত্যেক সার্কেলের জন্য একজন রাজা বা প্রধান নিযুক্ত করেন। চাকমা সার্কেলের (২৪২১ বর্গমাইল) রাজা রাঙামাটিতে, বোমাং সার্কেলের (২০৬৪ বর্গমাইল) রাজা বান্দরবানে, এবং মঙ সার্কেলের (৬৫৩ বর্গমাইল) রাজা রামগড় মহকুমার মানিকছড়িতে  অবস্থান করেন। উল্লিখিত জাতিদের মধ্যে চাকমারা সংখ্যার দিক থেকে রাঙামাটিতেই সর্বাধিক এবং অন্যান্য জায়গায়ও এদেরকে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় দেখা যায়।

পার্বত্য চট্রগ্রামের এসব উপজাতি যে এখানকার ভূমিজ সন্তান নয় তা আমাদের উপরোক্ত আলোচনা থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়। নৃতত্ত্ববিদদের মতে, উপমহাদেশের আদিম অধিবাসী মাত্রই বাইরে থেকে এখানে আগমন করেছে এবং ভাষাতত্ত্ববিদরাও বিভিন্ন আদিম জাতির ভাষা বিশ্লেষণ করে একই কথার সমর্থন জানিয়েছেন। ‘সুদূর অতীতে অন্যান্য ভূখণ্ডের মত এই উপমহাদেশের মাটিতেও হয়তো এক শ্রেণীর দ্বিপদ বৃক্ষচর প্রাণী নিতান্ত জন্তুদশা থেকে কালক্রমে বিবর্তিত হয়ে নরদশা লাভ করেছে।’ নৃতত্ত্ববিদ ড. জে এইচ হাটনও[vi] এখানকার আদি অধিবাসী সম্বন্ধে এই মতপোষণ করেন এবং তাঁর ধারণা ক্রমবিবর্তন ও বিভিন্ন সময়ের বংশানুক্রমিক রক্তের মিশ্রণে এইসব আদি মানব নিজেদের আদিম অবস্থা হারিয়ে ফেলেছে[vii]

পার্বত্য চট্রগ্রামের চাকমাদের বেলায় এই যুক্তি আংশিক সত্য। এদের ধর্ম ভাষ্য আচার-ব্যবহার এবং সামাজিক জীবনের রীতিনীতি বিভিন্ন ধর্মের সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে, তাদের আদিম বৈশিষ্ট্য অনেক ক্ষেত্রে খুঁজে বের করা অসম্ভব।

চাকমারা মূলত কি ছিল কিংবা কোন জাতি থেকে এদের উৎপত্তি, সে বিষয়টি জানা নিতান্ত কষ্টসাধ্য হলেও অনুসন্ধানের অপেক্ষা রাখে। কোনও জাতির সঠিক পরিচয় নির্ণয়ে সে জাতির অতীত ইতিহাস অনেকটা সহায়ক। ইতিহাসের অভাবে সেসব মানবগোষ্ঠির আকৃতি-প্রকৃতি, বেশ-ভূষা, আচার-ব্যবহার, ধর্ম-কর্ম, ভাব-ভাষা ইত্যাদির সাথে সম্যক পরিচয় কিংবা তাদের কালস্থায়ী পরিবেশের গূঢ় উবলব্ধি না থাকলে সেসব জাতি সম্বন্ধে কিছু বলা সম্ভব নয়।

স্যার রিজলীর মতে, ব্রক্ষ্ম ভাষার ‘সাক’ বা ‘সেক’ জাতি থেকে চাকমাদের উৎপত্তি। ক্যাপ্টেন লুইন বলেন:

‘…the name chakma is given to this tribe in general by the inhabitants of the Chittagong District, and the largest and dominant section of the tribe recognizes this as its rightful appellation. It is also sometimes spelt Tsakma or Tsak, or as it called in Burmese Thek’[viii].

এই মন্তব্যে চাকমা কথাটি যে মূলত পার্বত্য চট্রগ্রামের নয় সম্ভবত এ কথাটি তিনি বোঝাতে চেয়েছেন।

আরাকানের প্রাচীন রাজধানী রামাবতী নগরের নিকটবর্তী অঞ্চলে এই সাক বা সেক জাতি এককালে খুব প্রবল ও প্রতিপত্তিশালী হয়ে উঠেছিল। তাদের সাহায্যে ব্রক্ষ্মরাজ ন্যা সিং ন্যা থৈন ৩৫৬ মগাব্দে (৯৯৪ খ্রীষ্টাব্দ) সিংহাসন অধিকার করেছিলেন।

কর্নেল ফেইরী এর মতে[ix], তখন সেই অঞ্চলে পশ্চিম দেশের বিভিন্ন লোক বাণিজ্য উপলক্ষ্যে আগমন করে এবং পরিশেষে উপনিবেশ স্থাপন করে। তাদের উপাধি ছিল ‘সাক’ বা ‘সক’।

কেউ কেউ অনুমান করেন, তখন আরব-ইরান তুরস্ক  থেকে বহু মুসলমান সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যর উদ্যেশে আগমন করে এবং তাদের অনেকেই দেশে ফিরে না গিয়ে সে অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। অতএব বোঝা যাচ্ছে, এইসব সাক বা সেক শব্দ ইসলামি শব্দের অপভ্রংশ।

এখনও ব্রক্ষ্মদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী স্থানে এই সাক সম্প্রদায় দেখা যায়। ধর্মীয় রীতিনীতিতে তাদের সাথে পার্বত্য চট্রগ্রামের চাকমাদের মিল না খাকলেও আকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে চাকমারা সাকদেরই উত্তর পুরুষ। মগদের মতে, চাকমারা মুঘলদের বংশধর[x]। কোন এক সময়ে মুঘলরা আরাকান রাজ্যের হাতে পরাজয়বরণ করে; ফলে বহু মূঘল সৈন্য বন্দিদশায় আরাকানে অবস্থান করতে বাধ্য হয়। আরাকান রাজ তাদেরকে স্বদেশের মেয়েদের সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হবার আদেশ জানিয়ে আরাকানেই অন্তরীণ করে রাখেন। এসব মুঘল সৈন্যদের ঔরসে এবং আরাকানি নারীদের গর্ভে যে জাতির উদ্ভব হয়েছিল তারাই ‘সেক’ বা ‘সাক’।

জে. পি. মিলস্-ও একই মত পোষণ করেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘‘চাকমাগণ মগনারী ও মুঘল সৈন্যদের সমন্বরজাত। সপ্তদশ শতাব্দীতে চাকমাদের অনেকেই মুঘল ধর্ম গ্রহণ করে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এবং তখনকার চাকমা প্রধানগণও মুসলমানী নাম ধারণ করেন। অতঃপর সেখানে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় ফলে তারা হিন্দু ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়, কিন্তু পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব প্রকট হয়ে দেখা দেয় এবং হিন্দু ধর্ম অন্তর্হিত হয়[xi]।’’

ক্যাপ্টেন হার্বার্ট লুইন এর মন্তব্যেও এই উক্তির সমর্থন মিলে। তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন চাকমারা মুঘলদের বংশধর না হলেও এককালে এরা মুসলমান ছিল। কালের বিবর্তনে হয়তো ধর্মীয় ধারা পরিবর্তিত হয়েছে। এই মন্তব্যের সমর্থনে শ্রী সতীশচন্দ্র ঘোষ প্রতিপন্ন করেছেন যে, ‘১৭১৫ খ্রীষ্টাব্দ হতে ১৮৩০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত জামুল খাঁ, সেরমুস্ত খাঁ, সের দৌলত খাঁ, জান বক্স খাঁ, জব্বার খাঁ, টব্বার খাঁ, ধরম বক্স খাঁ প্রভৃতি চাকমা ভূপতিবর্গ ‘খাঁ’ উপাধি পরিগ্রহ করতেন। তদানুসষঙ্গিক ইহাও উল্লিখিত হইতে পারে যে, এই সময়ে তাঁহাদের কুলবধূগণেরও ‘বিবি’ খেতাব প্রচলিত ছিল। এখনও অশিক্ষিত সাধারণে ‘সালাম’ শব্দে অভিবাদন করে এবং আশ্চর্য বা খেদসূচক আবেগে ‘খোদায়’ নাম স্বরণ করিয়া থাকে[xii]।’

কেউ কেউ অনুমান করেন তখন মুসলিম (মুঘল শাসন) শাসনের প্রাধান্য ছিল বলে চাকমা রাজারা তাদের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য মুসলমানী নাম, ‘খা’ খেতাব[xiii] ইত্যাদি গ্রহণ করেছিলেন, ফলে তাদের চাল-চলনে মুসলমানী ভাব এবং কথা-বার্তায়ও অনেক আরবী-ফারসি শব্দ প্রবেশ করেছিল।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, ‘খাঁ’ উপাধি গ্রহণের বেলায় এই মতবাদ কতকটা শিথিল বলে ধরা যেতে পারে; কেননা, মধ্যপ্রদেশের কোন কোন স্থানে হিন্দুরাজাদের মধ্যেও ‘খাঁ’ খেতাব পরিলক্ষিত হয় এবং বাংলাদেশেরও কোন কোন হিন্দু পরিবারের ‘খাঁ’ পদবী দেখা যায়। কিন্তু মুসলমানী নাম আচার-ব্যবহার এবং কথা-বার্তায় ইসলামী ভাবগ্রহণ করে এভাবে নিজের সত্তাকে বিলিয়ে দেবার প্রমাণ একমাত্র চাকমা সমাজেই দেখা গেছে। অনুরূপ দৃষ্টান্ত দুনিয়ার আর কোন জাতির ইতিহাসে দেখা যায় না।

প্রসঙ্গত আরও উল্লেখযোগ্য যে, চাকমা রাজাদের মুদ্রার প্রতিকৃতি খাস ফরাসী ভাষায় উৎকীর্ণ ছিল। মুদ্রাগুলোর মধ্যে একটিতে খোদিত আছে ‘আল্লাহ রাব্বী’[xiv]। এমনকি চাকমা রাজাদের কামানগুলোও ‘ফতেহ খাঁ’ ‘কালু খাঁ’ নামে পরিচিত।

‘শ্রী শ্রী জয়কালী জয়নারায়ণ                      জব্বর খাঁ ১১৬৩’

[রাজা জব্বর খাঁর আমলের ফারসিতে উৎকীর্ণ (১১৬৩ মগাব্দ) মুদ্রার প্রতিকৃতি]

‘জান বখশ্ খাঁ                                       জামেনদার’

[চাকমা রাজা জান বখ্শ খাঁ জমিদারের আমলের ফারসিতে উৎকীর্ণ মুদ্রার প্রতিকৃতি]

চাকমা রাজাদের মধ্যে শের দৌলত খাঁর (১৭৫৪ খ্রীষ্টাব্দ) উপসনা পদ্ধতি ছিল খাঁটি ইসলামী ভাবধারার সম্ভূত এবং মারেফতের শিক্ষাই ছিল তার সাধনার প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়। সেই সাধনার বলে তিনি এতদূর উন্নীত হয়েছিলেন বলে জানা যায় যে, নিজের নাড়ীভূড়ি পর্যন্ত বের করে পানিতে পরিষ্কার করে পুনরায় তা যথাস্থানে সংস্থাপন করতে পারতেন। গৃহের এক নিভৃত কক্ষে তিনি আরাধনায় রত থাকতেন। তাঁর উপাসনাকালে কেউ যাতে তাঁর গৃহে প্রবেশ না করে এমন নির্দেশও দেওয়া থকতো। কিন্তু একদিন তাঁর স্ত্রী কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে সেই সাধনা কক্ষের ছিদ্র পথে  দৃষ্টি দিতেই দেখতে পান যে, রাজা তাঁর নিজের অন্ত্র বের করে পরিষ্কার করছেন। এই দৃশ্য অবলোকন করে রাণী অবাক হয়ে চীৎকার দিয়ে ওঠেন, ফলে রাজার ধ্যান ভেঙে যায়। কথিত আছে তিনি সবগুলো অন্ত্র যথাস্থানে সংস্থাপন করতে পারেননি, যার ফলে তিনি উম্মাদ হয়ে যান। এ সম্পর্কে এখনও চাকমা সমাজে একটা গান প্রচলিত আছে:

   মুনি দরবেশ ধ্যান করে

  পাগলা রাজা আপন চিৎ-কল্জা খৈ-নাই স্যান গরে।

[সাধু-দরবেশ যেমন ধ্যান ধরে থাকে, সেই রকম পাগলা রাজা নিজের কলজে বের করে স্নান করাতেন]

এ ছাড়াও চাকমা রাজারা যে ইসলাম ধর্মের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত ছিলেন তার আরও অনেক প্রমাণ উপস্থিত করা যায়।

চাকমা রাজমহিষী প্রীমতী কালিন্দী রাণী প্রথমদিকে ইসলাম ধর্মের প্রতি অটল বিশ্বাসী ছিলেন এবং ইসলামের অনেক অনুশাসনও তিনি মেনে চলতেন। রাজানগরে বিরাট মসজিদ তাঁর নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মসজিদ তদারক ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মুসল্লিদের ইমামত করার জন্য তিনি একজন মৌলানা নিযুক্ত করেন। কথিত আছে, রাণী সেই মৌলানার কাছ থেকে অনেক সময় ইসলাম ধর্মের মর্মবাণী সম্পর্কে জ্ঞান সংগ্রহ করতেন। চাকমা রাজ পরিবারের মহিলাদের অবরোধ প্রথা প্রচলিত ছিল। ইসলাম ধর্মের প্রতি বিশেষ বিশ্বাসী থাকা সত্ত্বেও শ্রীমতী কালিন্দী রাণী পরবর্তীকালে ধর্মবিশ্বাস পরিবর্তন করেন। তিনি প্রথমে হিন্দু ধর্ম এবং পরিশেষে বৌদ্ধ ধর্মগ্রহণ করেন।

এসব প্রমাণাদি থেকে অনুমিত হয় যে, চাকমারা হয়ত বা মুসলমান ছিল। মুঘল বংশধর না হলেও এরা যে ব্রক্ষ্ম দেশের সাক বা সেক জাতির (ইসলামী শায়েখ বা শেখ থেকে) অন্তর্ভুক্ত ছিল তা অনুমান করা যায়।

কিন্তু চাকমাদের নিজেদের মতে, উপরোক্ত যুক্তিসমূহ সর্বৈব মিথ্যা। মুসলমানী নাম গ্রহণ এবং তাদের মধ্যে মুসলিম প্রভাবের কারণ সম্পর্কে তারা শুধু এই বলতে চায় যে, অতীতকালে কোন এক চাকমা রাজা জনৈক মুসলমান নবাব কন্যার প্রেমে পড়ে তাঁকে বিয়ে করেন। সেই নবাব কন্যার প্রভাবে চকমা রাজ ইসলামী ভাবধারার সমর্থক হয়ে ওঠে। যার ফলে পরবর্তীকালে তাঁদের নামকরণ উপাধি গ্রহণ আচার-ব্যবহার প্রভৃতিতেও ইসলামী প্রভাব পরিলক্ষিত হয়[xv]। এক সময় চাকমা সমাজে কোনও রমণীর মৃত্যু ঘটলে তাকে রীতিমত কাফন পরিবৃত করে উত্তর শিয়রে কবরস্থ করা হতো এরূপ ঘটনাও বিরল নয়।

কোন জাতির আদি পরিচয় উদঘাটনে প্রাচীন সংস্কারের দান অপরিসীম। এ দিক দিয়ে বিচার করলে চাকমাদের এই যুক্তি অনেকটা শিথিল মনে হয়। কিন্তু চাকমারা কোনক্রমেই মানতে রাজি নয় যে, তারা কোনকালে মুসলমান ছিল। চাকমারাজ শ্রী ভুবনমোহন রায় (মৃত্যু ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৬ খ্রীষ্টাব্দ) দেখাতে চেয়েছেন যে, চাকমারা আসলে শাক্য বংসম্ভূত মহামুনি বুদ্ধের বংশধর[xvi]। পুরাকালে যে তাঁরা পৈতাধারী ক্ষত্রিয় ছিলেন- একথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

মগভাষায় ‘শাক্য’ অর্থ ‘সাক’ আর যারা রাজবংশম্ভূত তাঁদেরকে বলা হয় ‘সাকমাং’ (মাং রাজা অর্থে)। এই ‘সাকমাং’ থেকে ‘চাকমা’। এই বিশেষ কথাটির উপর চাকমারা সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করে থাকেন। চাকমাদের এই নিজস্ব মতামত এবং মগদের এই ভাষাগত অর্থের পরিপ্রেক্ষিতেই তারা প্রমাণ করতে চান যে, তাঁরা শাক্য বংশম্ভূত মহামুনি বুদ্ধের বংশধর।

চাকমা জাতির আদি উৎস সম্পর্কে চাকমা সমাজে দুটি পুরাকাহিনী প্রচলিত আছে- ‘রাধামহন-ধনপতি’ উপাখ্যান এবং ‘চাটিগাঁ ছাড়া’। এই কাহিনী দুটি মূলত এক এবং দ্বিতীয়টি প্রথমটির দ্বিতীয় অধ্যায় মাত্র। উক্ত কাহিনীতে রাজা সাধ্বিংগিরির উল্লেখ রয়েছে। রাজা সাধ্বিংগিরি চম্পকনগরে (মতান্তরে চম্পানগরে) বাস করতেন। এই চম্পক বা চম্পা থেকে না-কি চাকমা জাতির নামকরণ করা হয়েছে। সেকালে চম্পনগরে বিজয়গিরি হরিশচন্দ্র নামে আরও দুজন সামন্ত রাজা ছিলেন। তাঁরা সবাই চন্দ্রবংশীয় ক্ষত্রিয়। চাকমারা নিজেদের এঁদেরই বংশধর বলে দাবি করে। ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত ‘রাজমালায়’ অবশ্য উক্ত কাহিনী দুটি সম্বন্ধে মতভেদ রয়েছে।

আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, এই চম্পকনগর বা চম্পানগরের ভৌগলিক অবস্থান সম্পর্কে কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ উপস্থিত করা যায় কি-না। কেউ কেউ অনুমান করেন, চম্পানগর বিহারে অবস্থিত। আবার চীনা পর্যটক ফা-হিয়েনের (৪২৯ খ্রীষ্টাব্দ) বর্ণনায় পাওয়া যায় চম্পানগর ছিল তখনকার সময়ে ভাগলপুরের কর্ণপুর রাজ্যের রাজধানী। ক্যাপ্টেন থমাস হার্বার্ট লুইন বলেন, চম্পানগর মালাক্কার নিকটবর্তী একটি শহর।’ এ থেকে কেউ কেউ ধারণা করে থাকেন যে, চাকমারা ‘মালয় বংশজ’। অবশ্য এ সম্পর্কেও মতভেদ রয়েছে।

ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত ‘রাজমালায়’য় চম্পা বা চম্পকনগরের সরাসরি কোন উল্লেখ নাই। তবে চাকমা সমাজে প্রচলিত একটি গানে চম্পানগর নয় নুর নগরের উল্লেখ রয়েছে। গানটির রচনাকাল জানা যায়নি, তবে চাকমা রাজাদের কেউ হয়তো একবার নিজ দেশ ছেড়ে ব্রক্ষ্ম দেশে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠার ফলে দেশে ফিরে আসার অভিলাষ জ্ঞাপন করে তাঁরা ছড়া কেটে গান করতেন (আনুমানিক ৭০০ মগাব্দ):

ডোমে বাজায় দোল্ দগর          ফিরে যাইয়ম্ নুরনগর

(বাদ্যকেরা ঢোল-ডগরা বাজায়। আমাদের নুরনগর ফিরে যেতে ইচ্ছা হয়)

এই নুরনগর পার্বত্য ত্রিপুরায় অবস্থিত। চাকমারা আগে (বর্তমানেও আছে) পার্বত্য ত্রিপুরায় ছিল। ত্রিপুরা জেলায় অবস্থিত গোমতী নদীর উৎস সম্বন্ধে যে আখ্যান প্রচলিত আছে চাকমা সমাজে এখনও তা পবিত্র জ্ঞান করা হয়। পার্বত্য ত্রিপুরার সাথে চাকমাদের যোগসূত্র প্রাচীনকাল থেকেই। বস্তুত, এই নুরনগরই আসলে চম্পানগর কি-না তাও অবশ্য গবেষণার বিষয়।

সুতরাং এসব কাহিনীর উপর ভিত্তি করে একটা জাতির আসল পরিচয় উদঘাটন সম্ভব নয়। চাকমাদের ধর্মভাবের পরিবর্তন সম্পর্কে প্রসঙ্গত আরও একটি প্রমাণ উপস্থিত করা যায়। নিম্নে কয়েকজন চাকমা রাজার নাম এবং তাঁদের সিংহাসন লাভের সময়কাল উল্লেখ করা হলো:

জব্বার খান ১৬৮৬ খ্রীষ্টাব্দ

বেল্লাল খান ১৭০০ খ্রীষ্টাব্দ

জালাল খান ১৭০৬ খ্রীষ্টাব্দ

শেরমুস্ত খান ১৭৩১ খ্রীষ্টাব্দ

শের দৌলত খান ১৭৫৪ খ্রীষ্টাব্দ

জান বখ্স খান ১৭৮২ খ্রীষ্টাব্দ

ধরম বখ্স খান ১৮১৮ খ্রীষ্টাব্দ ইত্যাদি।

শেষের নামটির ‘ধরম’ (সংস্কৃত) কথাটি সম্ভবত বাংলা ‘ধর্ম’ শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে এবং ‘বখ্স কথাটি খাঁটি ফরাসি ভাষার শব্দ।

‘ফতেহ্ খাঁ ১১৩৩’- [চাকমা রাজা ফতেহ্ খাঁর আমলের (১১৩৩ হিজরী) ফরাসীতে উৎকীর্ণ মুদ্রা]

‘শুকদের রায় ১২১০ হিজরী’ [চাকমা রাজা শুকদের রায় (১২১০ হিজরী) এর আমলের মুদ্রার প্রতিকৃতি]

‘জয়কালী সহায় ধরম্ বখ্শ খাঁ’ [রাজা ধরম বখ্শ খাঁর আমলের মুদ্রার প্রতিকৃতি]

‘সিংহ চিহ্নিত চাকমা মুদ্রা’

ধরম বখশের স্ত্রী শ্রীমতী কালিন্দী রাণী এই সময়েই হিন্দু ভাবাপন্ন হন। পূর্বে চাকমা রাজাদের মুদ্রায় আরবী ফারসী শব্দের প্রতিকৃতি ‘আল্লাহ’ ‘খোদা’ ইত্যাদি লেখা থাকতো; কিন্তু এই ধরম বখ্শ খান তাঁর মুদ্রার মধ্যে ‘জয়কালী সহায়’ খুদিত করেন।

পরে শ্রীমতী কালিন্দী রাণী বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন এবং রাজানগরে বাংলা ১২৭৬ সালের ৮ চৈত্র ‘মহামুনি’ সংস্থাপন করেন। মন্দিরগাত্রে সর্বসাধারণের জ্ঞাপনার্থে একটি প্রস্তরফলক স্থাপিত হয়। নিম্নে প্রস্তর ফলকটির হুবহু উদ্ধৃতি দিচ্ছি:

শ্রী শ্রী ভোক্ত

ফড়া

বিজ্ঞাপন

সর্বসাধারণের অবগতার্থে এ বিজ্ঞাপন প্রচার করিতেছি যে, অত্র চট্রগ্রামস্থ পার্বত্যাধিপতি আদৌ রাজা শেরমস্থ খাঁ তৎপর রাজা শুকদের রায় অতঃপর রাজা সের দৌলত খাঁ পরে রাজা জানবকস্ খাঁ অপরে রাজা টর্বর খাঁ অনন্তর রাজা জব্বর খাঁ আর্য্যপুত্র রাজা ধরম বকস্ খাঁ তৎসহধর্মিনী আমি শ্রীমতী কালিন্দী রাণী আপোন অদৃষ্ট সাফল্যাভিলাসে তাহানদ্বিগের প্রতি কৃতাজ্ঞাতাসূচক নমস্কার প্রদান করিলাম যদিও পূর্ববর্তীর ধর্মার্থে বৌদ্ধ ধর্মের শ্রীবৃদ্ধিসাধন জন্য দ্বিগদ্বেসিয় অনেকানেক ষুধিগণ কর্তৃক সাস্ত্রানুসারে ১২৭৬ বাংলার ৮ই চৈত্র দিবস অত্র রাজানগর মোকামে স্থলকুল রত্নাকর ‘চিঙ্গঁ’ সংস্থাপন হইয়াছে তাহাতে আজাবধি বিনা করে বৌদ্ধধর্মাবলম্বি ঠাকুর হইতে পারিবেক উল্যেকিত পৃণ্যক্ষেত্রের দক্ষিণাংশে শ্রী শ্রী ছাইক্য মুনি স্থাপিত হইয়া তদুপলক্ষ্যে প্রত্যেক সনাখেরিতে মহাবিষুর যে সমারোহ হইয়া থাকে ঐ সমারোহতে ক্রয়-বিক্রয় করণার্থে যে সমস্ত দোকানি ব্যাপারি আগমন করে ও মঙ্গলময় মুনি দর্শনে যে যাত্রিক উপনিত হয়, তাহারার দ্বিগ হইতে কোন প্রকারের মহাষুল অর্থাৎ কর গ্রহণ করা জাইবেক না ইদানিক কি করে বা করায় তব এই জর্ন্মে ঐ জর্ন্মে এবং জর্ন্মে জর্ন্মে মহাপতিকিপাত্র পরিগণিত হইবেন।

কিমাধিক মিতি … কালিন্দী রাণী

শ্রীমতী কালিন্দী রাণীর হস্তলিপি

শ্রীমতী কালিন্দী রাণী যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন এই অনুশাসন লিপির প্রতিটি অক্ষর তিনি যথাযথ প্রতিপালন করে গিয়েছেন। শ্রীমতী কালিন্দী রাণীর সময়ই চাকমারা পুরোপুরি বৌদ্ধ ধর্মের শাসনে চলে যায়।

চাকমাদের আদি উৎস নির্ণয় সম্পর্কে যেসব যুক্তি ও প্রমাণাদির উল্লেখ করা হয়েছে তার সঙ্গে তার ধর্মীয় বিষয়াদিও জড়িত। পাহাড়ি জাতি মাত্রই অপেক্ষাকৃত সরল। এদের মনোভাবও বিশেষ কোমল। এ কারণে তাদের ধর্মবিশ্বাসেও স্থৈর্য লক্ষ্য করা যায় না। বর্তমানে অবশ্য মিশনারীদের প্রচেষ্টায় অনেক পাহাড়ি সম্প্রদায়ও খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করতে আরম্ভ করেছে; কাজেই প্রবহমান ধর্মনীতির উপর নির্ভর করে কোন জাতির উৎস নির্ণয় সবক্ষেত্রে সঠিক ও নিরাপদ নয়।

তথ্যসূত্র

[i]  Vide Bengal Govt. Act XXIII dt. 1.8.1860.

[ii] Colonel Phayre : The History of Burma, p 39.

[iii]  দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদফুং, পৃ ১৭-১৯।

[iv]  ‘দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদফুং’, এবং ‘রাজমালা’র বর্ণণায় যথেষ্ট সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। শুধুমাত্র রাজা-বাদশাহদের নামের মধ্যে কিছু কিছু তফাৎ দেখা যায়। যথা: রাজমালা দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদফং অরুণযুগ (চাকমা-রাজা ৬৯৬ মগাব্দ) ইয়াংজ (৬৯৬ মগাব্দ) মইসাং রাজা প্রি ৯৮ মংছুই রাজা প্রি ১১২ মারিক্যা রাজা প্রি ৫৭ মরেক্যজ রাজা প্রি ৫৫ জনু রাজা(৮৮০ মগাব্দ) প্রি ৩৯ চনুই রাজা(৮৮০ মগাব্দ) প্রি ৫৮ সাজেম্বী(৮৮১ মগাব্দ) প্রি ২৩ সাজাইয়ু(৮৮১ মগাব্দ) প্রি ৫৯ ইত্যাদি।

[v]  Vide letter No. 1985/797 LR dt. 1. 9. 1881.

[vi] সুবোধ ঘোষ: ভারতের আদিবাসী(উদ্ধৃত), ‍পৃ ৪।

[vii] Census Report Of Bengal 1931.

[viii] T. H. Lewin: The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein, p. 62.

[ix] Colonel Phayre: Journal of Asiatic Society of Bengal, No. 145, 1844, pp. 201-202.

[x] সতীশ চন্দ্র ঘোষ: চাকমা জাতি, পৃ ৫।

[xi]  J. P. Mills: Notes on a Tour: In the Chittagong Hill Tracts in 1926:  Census of India 1931.

[xii]  সতীশ চন্দ্র ঘোষ: প্রাগুক্ত, পৃ ৬।

[xiii]  ড. দীনেশ চন্দ্র সেন: ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’। ‘সেকালের উপাধিগুলি কিছু অদ্ভুত রকমের ছিল।‘পুরন্দর খাঁ’ ‘গুণরাজ খাঁ’ এসব রাজদত্ত খেতাব।’

[xiv]  সতীশ চন্দ্র ঘোষ: প্রাগুক্ত, পৃ ৬৯।

[xv]  শ্রী মাধবচন্দ্র চাকমাধর্মী: শ্রী শ্রী রাজনামা, পৃষ্ঠা, ভূমিকা e/o.

[xvi] ভুবন মোহন রায়: চাকমা রাজবংশের ইতিহাস,(১৯১৯) পৃ ৩৭।

♦ আবদুস সাত্তার: কবি, গবেষক ও আরণ্য জনপদের লেখক।

3 thoughts on “চাকমা: আদিবাসী নয় বহিরাগত

  1. পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক আতিকুর রহমানের লেখা পড়ে চাকমা জাতির ইতিহাস এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বই সম্পর্কে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে বিরাজ মোহন দেওয়ান বিরচিত ‘চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত (১৯৬৯)’, সাবেক চাকমা রাজা ভুবন মোহন রায়ের ‘চাকমা রাজবংশের ইতিহাস (১৯১৯)’, মাধব চন্দ্র চাকমা কর্মীর ‘শ্রী শ্রী রাজনামা’, সতীশচন্দ্র ঘোষ প্রণীত ‘চাকমা জাতি (১৯০৯)’, সুগত চাকমার ‘বাংলাদেশের উপজাতি (বাংলা একাডেমী, ১৯৮৫)’, প্রফেসর পিয়ের বেসেইনে প্রণীত Tribesmen of Chittagong Hill Tracts (1957-58) এর অনুবাদগ্রন্থ ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি’ (বাংলা একাডেমী, ১৯৭৭), পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম ডেপুটি কমিশনার ক্যাপ্টেন টিএইচ লুইন প্রণীত WILLD RACES OF SOUTH-ESTERN INDIA (1870) এর জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা কর্তৃক অনুদিত ‘বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের আদিম জনগোষ্ঠী (উসাই রাঙ্গামাটি, ১৯৯৮)’, লে. কর্নেল টিএইচ লুইন প্রণীত A FLY ON THE WHEEL (1912)-এর জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা কর্তৃক অনুদিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ও লুসাই পাহাড় (উসাই রাঙ্গামাটি, ১৯৯৬), শীর্ষক বইসমূহ পড়ে ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি ক্রমেই বেড়েছে। কেননা পার্বত্যাঞ্চলের ইতিহাস বিষয়ক বইগুলো চাকমা রাজবংশের ইতিহাসকেন্দ্রিক রচিত হলেও একটির সাথে আরেকটির বর্ণনার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। চাকমা রাজাদের নাম এবং তাদের ধারাবাহিকতার মধ্যেও গড়মিল স্পষ্ট। এক পর্যায়ে হাতে আসে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অশোক কুমার দেওয়ান রচিত ‘চাকমা জাতির ইতিহাস বিচার (১৯৯১)’, বইটি। এই বইটি পড়ে নিশ্চিৎ হই যে, পার্বত্যাঞ্চল বিশেষ করে চাকমা রাজবংশকেন্দ্রিক চাকমা জাতির ইতিহাসের বেশিরভাগটাই ভিত্তিহীন এবং কল্পনা প্রসূত।

  2. আরাকানী রাজা উপজাতিদের আগমন সম্পর্কে ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জুন তারিখে আরাকানী রাজা কর্তৃক চট্টগ্রামের চীফের প্রতি লেখা একটি চিঠি হতে কিছু চমকপ্রদ ঐতিহাসিক তথ্য জানা যায়। আরাকান রাজ্য হতে পালিয়ে আসা কিছু উপজাতির নাম রাজা উল্লেখ করেছিলেন, যারা চট্টগ্রামের পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছিল এবং উভয় দেশের জনগণের উপরই অত্যাচার করতো। এই চিঠিতে পার্বত্য অঞ্চলে বর্তমানে বসবাসরত অন্ততঃ চারটি উপজাতির নাম উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন- মগ, চাকমা, ম্যারিং বা মুরং এবং লাইস (পাংখু, বনযোগী)। আরাকানী রাজা চেয়েছিলেন যে, এ সকল দস্যুদেরকে পার্বত্য এলাকার হতে বিতাড়িত করা উচিত যাতে ‘‘আমাদের বন্ধুত্ব নিষ্কলঙ্ক থাকে এবং পর্যটকদের ও ব্যবসায়ীদের জন্য রাস্তা নিরাপদ থাকে।’’

    • এখন আপনাদের মত বড় জ্ঞানী লোকেরা লিখতে পারেন। কেন না এখন যাহা করেন।, বলেন।, করেন সবই সঠিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *