গুলশাখালী উপজেলা গঠন প্রসঙ্গে প্রস্তাব


সৈয়দ ইবনে রহমত::

দেশে বর্তমানে ৪৯২টি উপজেলা আছে। সর্বশেষ উপজেলা গঠিত হয়েছে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ। ২০১৭ সালের ২০ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি এর অনুমোদন দেয়। ৪৯৩তম উপজেলা হওয়ার কথা রয়েছে মাদারীপুরের ডাসার উপজেলা। অন্যদিকে ২০১৪ সালে খাগড়াছড়ির রামগড়, মাটিরাঙ্গা এবং মহালছড়ি এই তিন উপজেলা থেকে একটি করে ইউনিয়ন নিয়ে গুইমারা উপজেলা গঠিত হয়। বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাইতং, সরই, গজালিয়া এবং আজিজনগর এই ৪টি ইউনিয়ন নিয়ে সরই উপজেলা গঠনের প্রস্তাব বিবেচনাধীন রয়েছে। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলা ভেঙে তবলছড়ি নামে নতুন আরো একটি উপজেলা গঠনের দাবি উঠেছে।

প্রান্তিক পর্যায়ে বসবাস করা মানুষের দোরগোড়ায় নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সহজেই পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে নতুন নতুন উপজেলা বা প্রশাসনিক ইউনিট গঠন করা একটি চলমান প্রক্রিয়া। এর ধারাবাহিকতায় লংগদু উপজেলাধীন কাপ্তাই লেকের পূর্বপাড়ে অবস্থিত ভাসান্যাদম, বগাচতর, গুলশাখালী এবং বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন আমতলী ইউনিয়নকে নিয়ে একটি উপজেলা গঠন করা এখন সময়ের দাবি। আমতলী বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন হলেও উপজেলা সদর হতে এর দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার, ফলে আমতলীবাসীকে সরকারি বা প্রশাসনিক যে কোনো সুবিধা পেতে ব্যাপক ভোগান্তি পোহাতে হয়। অন্যদিকে ভাসান্যাদম, বগাচতর, গুলশাখালী এবং আমতলী ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি। তাছাড়াও এই চারটি ইউনিয়নের অধিবাসীরা গত কয়েক দশক ধরে রাজনগর বিজিবি জোনের আওতাধীন একই নিরাপত্তার ছাতার নিচে বসবাস করছে। এসব বিবেচনায় এই চারটি ইউনিয়নের অধিবাসীদের অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতিসহ সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য নতুন একটি উপজেলা গঠনের বিকল্প নেই।

নতুন উপজেলার নামকরণ:
সম্ভাব্য নতুন উপজেলার সদর এবং এর নাম আমরা প্রস্তাব করতে পারি ‘গুলশাখালী’। কারণ ইউনিয়নগুলোর মধ্যে গুলশাখালীর অবস্থান মধ্যস্থলে। চারটি ইউনিয়নের মধ্যে গুলশাখালীর ভূমি বেশি সমতল, ফলে এখান থেকে সর্বত্র চলাচল করা সুবিধাজনক। রাজনগর বিজিবি জোন সদরও এখানেই অবস্থিত। কাপ্তাইলেকের পূর্বপাড়ের একমাত্র কলেজটির অবস্থানও এখানে। আয়তনের দিক থেকেও গুলশাখালী সব চেয়ে বড় ইউনিয়ন। তবে উপজেলা সদরের জন্য গুলশাখালী এবং বগাচতর ইউনিয়ন সীমান্তের কোনো একটি উপযুক্ত স্থানকে বেছে নেয়া যেতে পারে। চার ইউনিয়নবাসীকে উপজেলা সদরের সুবিধা সহজেই পেতে হলে এটাই হতে পারে উপযুক্ত স্থান।

বর্তমান উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থার করুণদশা:
লংগদু উপজেলাধীন গুলশাখালী, বগাচতর এবং ভাসান্যাদম ইউনিয়ন কাপ্তাই লেক দ্বারা উপজেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন। উপজেলা সদর থেকে গুলশাখালী ইউনিয়ন পরিষদের দূরত্ব ৮ কিলোমিটার, বগাচতর ইউনিয়ন পরিষদের দূরত্ব ৮ কিলোমিটার এবং ভাসান্যাদম ইউনিয়ন পরিষদের দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। তবে যেসব মানুষ ইউনিয়নগুলোর উত্তর, পূর্ব এবং দক্ষিণ সীমানার দিকে বসবাস করে তাদের উপজেলা সদরে যেতে উল্লেখিত দূরত্বের দেড় থেকে দ্বিগুণ দূরত্ব পাড়ি দিতে হয়। অপরদিকে বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন আমতলী ইউনিয়নের দূরত্ব বাঘাইছড়ি সদর থেকে ৩৫ কিলোমিটার। আর এসব এলাকার সাথে উপজেলা সদরের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম পানিপথ। বছরের পাঁচ মাস কাপ্তাই লেকে পানি থাকে, এ সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা কিছুটা সহজ। কিন্তু লেকের পানি শুকিয়ে গেলে উপজেলা সদরে আসা-যাওয়া করতে অবশিষ্ট সাত মাস কী পরিমাণ ভোগান্তি পোহাতে হয় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কোথাও হেঁটে, কোথাও নৌকা আবার কোথাও যেতে হয় মোটরসাইকেলে চড়ে। এ সময় যাতায়াত খরচও বেড়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে যায়। সময়ের হিসাব নাইবা করলাম, আসা-যাওয়াতেই দিন শেষ। আর কোনো মরণাপন্ন রোগীকে উপজেলা সদরে অবস্থিত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পর্যন্ত নিতে হলে তো কথাই নেই। নিতে নিতেই রোগীর অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায়। অন্যদিকে উল্লেখিত চার ইউনিয়নের মধ্যে আভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ রয়েছে। গুলশাখালী এবং আমতলীর সীমানায় ডিপুরমুখ খালে একটিমাত্র ব্রিজ নির্মাণ করা হলে সেটি পূর্ণাঙ্গরূপ পেতে পারে।

গুলশাখালী উপজেলার আয়তন ও জনসংখ্যা:
লংগদু উপজেলাধীন গুলশাখালীর আয়তন ১১৫ বর্গ কিলোমিটার, জনসংখ্যা ২০১৮ সালে ১৩,২৮৯ (২০১১ সালে ছিল ৯৫৪০) জন; বগাচতরের আয়তন ৬৯ বর্গ কিলোমিটার, জনসংখ্যা ২০১৮ সালে ১৮,৩৮৯ (২০১১ সালে ছিল ১৩২০১) জন; ভাসান্যাদমের আয়তন ৯৩ বর্গ কিলোমিটার, জনসংখ্যা ২০১৮ সালে ১০,৯০৭ (২০১১ সালে ছিল ৭৮৩০) জন এবং বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন আমতলী ইউনিয়নের আয়তন ১২.১৪৫ বর্গ কিলোমিটার ও লোকসংখ্যা ১০,২৪৪ জন (২০১৬ সালের হোল্ডিং অনুযায়ী)। চার ইউনিয়নের মোট আয়তন দাঁড়াচ্ছে ২৮৯.১৪৫ বর্গ কিলোমিটার এবং মোট জনসংখ্যা ৫২,৮২৯ জন। (২০১১ সালের শুমারী মতে, লংগদু উপজেলার বার্ষিক জনসংখ্যার শতকরা বৃদ্ধির হার ১৯.৯। এখানে ২০১১ সালের জনসংখ্যা এবং বৃদ্ধির হার থেকে সরল বৃদ্ধির সূত্র ব্যবহার করে ২০১৮ সালের জনসংখ্যা নির্ণয় করা হয়েছে।) প্রকৃত জনসংখ্যা ৬০ হাজারের বেশি হবে।

উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, আয়তনে বাংলাদেশের ক্ষুদ্রতম উপজেলা নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলা। যার আয়তন প্রায় ৫৪.৩৯ বর্গ কিলোমিটার। অন্যদিকে জনসংখ্যায় দেশের ক্ষুদ্রতম উপজেলা হলো বান্দরবানের থানচি। ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুয়ায়ী এর মোট জনসংখ্যা হল ২৭,৫৮৬ জন। প্রস্তাবিত গুলশাখালী উপজেলার আয়তন দেশের ক্ষুদ্রতম উপজেলা নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার প্রায় ছয় গুণ এবং জনসংখ্যার দিক থেকে ক্ষুদ্রতম উপজেলা বান্দরবানের থানচির চেয়ে দ্বিগুণ জনসংখ্যার অধিকারী হবে।

উপর্যুক্ত চারটি ইউনিয়নের ভৌগোলিক অবস্থান, আয়তন এবং জনসংখ্যা বিবেচনায় এখানে একটি উপজেলা গঠন করা এখন সময়ের দাবি। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।

sayedibnrahmat@gmail.com

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *