খাগড়াছড়ির হত্যাকাণ্ডে তদন্ত কমিটির কাছে তিন সংগঠনের স্মারকলিপি পেশ


প্রেস বিজ্ঞপ্তি:

গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন খাগড়াছড়ি জেলা ইউনিটের পক্ষ থেকে সোমবার (১৮ আগস্ট) খাগড়াছড়ির স্বনির্ভর-পেরাছড়ায় জেএসএস সংস্কারবাদীদের সশস্ত্র হামলায় তিন সংগঠনের নেতাসহ ৭ ব্যক্তি নিহত হওয়ার ঘটনা তদন্তের জন্য গঠিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত কমিটির কাছে একটি যৌথ স্মারকলিপি পেশ করা হয়েছে।

সোমবার (২৭ আগস্ট) খাগড়াছড়ির স্বনির্ভর বাজারে গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রতন স্মৃতি চাকমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অমল বিকাশ ত্রিপুরা ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন খাগড়াছড়ি জেলা শাখার নেত্রী এন্টি চাকমার নেতৃত্বে তিন সংগঠনের একটি প্রতিনিধি দল সফররত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত দলের কাছে উক্ত স্মারকলিপি হস্তান্তর করেন।

প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য ও পিসিপি নেতা সমর চাকমা হামলার সময় মুহুর্মুহু গুলির মধ্যে কিভাবে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন তার বিশদ বর্ণনা তদন্ত কমিটির কাছে তুলে ধরেন।

নেতৃবৃন্দ তদন্ত দলের কাছে স্বনির্ভরে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে অন্যতম বর্বর ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘জেএসএস সংস্কারবাদী দলের আনুমানিক ৮-১০ জন সদস্য টম টম অটোরিক্সা যোগে এসে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে’ এবং ‘২৫ মিনিট ধরে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানোর পর খাগড়াছড়ি-পানছড়ি সড়ক দিয়ে উত্তর দিকে বিজিবি চেক পোস্টের পাশ দিয়ে হেঁটে পালিয়ে যায়।

স্বনির্ভর হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘন্টা পর পেরাছড়ায় বিক্ষুদ্ধ জনতার মিছিলে হামলা প্রসঙ্গে স্মারকলিপিতে বলা হয়, ‘স্বনির্ভরে হামলার খবর শুনে এলাকাবাসী বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং প্রতিবাদ সভা বন্ধ করে রাজপথে নেমে পড়ে। পরে আনুমানিক ৪ হাজার জনতা মিছিল করে স্বনির্ভরে আসার সময় পেরাছড়া ব্রিজে সংস্কারবাদীদের হামলার শিকার হয়। সংস্কারবাদীরা মিছিলে গুলি চালালে এতে সন কুমার চাকমা নামে ৭০ বছরের এক বৃদ্ধ আহত হয়ে পরে হাসপাতালে মারা যান।

নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা প্রসঙ্গে, হামলার সময় নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে স্মারকলিপিতে তিন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বলেন, ঘটনাস্থলেই রয়েছে একটি পুলিশ বক্স এবং ঘটনাস্থলের ২৫ গজের মধ্যে রয়েছে বিজিবির একটি চেকপোস্ট, যেখানে তারা দিন রাত ২৪ ঘন্টা পাহারায় নিয়োজিত থাকেন।

চলমান সহিংসতা প্রসঙ্গে স্মারকলিপিতে বলা হয়, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমান সংঘাত-সহিংসতার মূল কারণ হলো বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ইউপিডিএফের ন্যায়সঙ্গত গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমনের রাষ্ট্রীয় নীতি। আর দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেনা-সৃষ্ট নব্য মুখোশ বাহিনী এবং জেএসএস সংস্কারবাদী অংশকে। তাদেরকে দিয়ে একের পর এক খুন গুম অপহরণ করানো হচ্ছে, অথচ তার কোন বিচার ও শাস্তি হচ্ছে না। বরং এইসব সন্ত্রাসী অপরাধীদের রক্ষা করা হচ্ছে এবং আরো অপরাধ সংঘটনে তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।’

‘জেএসএস সংস্কারবাদী ও নব্য মুখোশ বাহিনীদের দিয়ে সংঘটিত বিচার বহির্ভূত হত্যাকা- সমতলের ‘ক্রসফায়ারের’ পার্বত্য চট্টগ্রাম সংস্করণ ছাড়া কিছুই নয়’ বলে নেতৃবৃন্দ মন্তব্য করেন।

চলমান সহিংসতার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে জেএসএস সংস্কারবাদী নেতাদের চরম অগণতান্ত্রিক মানসিকতাকে দায়ি করে নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘দুই যুগেরও বেশী সময় ধরে চলা তাদের সশস্ত্র ও অনিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন তাদের এই অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিষ্ট মানসিকতার জন্ম দিয়েছে। চুক্তির পর স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফিরে এলেও তারা তাদের সেই পূর্বের মানসিকতা ও আচরণ বদলাতে পারেনি। তার প্রভাব পড়েছে পাহাড়ের রাজনীতিতে।’

সংঘাত বন্ধের জন্য সুপারিশ, অপারেশন উত্তরণের’ আলোকে ইউপিডিএফের উপর চলমান ফ্যাসিস্ট দমন নীতিকে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমান সময়ের সকল সমস্যার জননী’ আখ্যায়িত করে তিন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চার দফা সুপারিশ পেশ করেন।

এগুলো হলো এক. ‘অপারেশন উত্তরণ’ বাতিল এবং ইউপিডিএফের গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ তথা দমনপীড়ন বন্ধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, দুই. ইউপিডিএফকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে জেএসএস সংস্কারবাদী-নব্যমুখোশ বাহিনীকে ব্যবহার বন্ধ করা, তিন. জেএসএস সংস্কারবাদীদের অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিষ্ট আচরণ বন্ধ করা এবং চার. পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বায়ত্তশাসন প্রদানের লক্ষ্যে রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

স্মারকলিপির সাথে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সম্বলিত বেশ কিছু দলিলপত্রও তদন্ত কমিটির কাছে পেশ করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *