খরায় পুড়ছে ফটিকছড়ির ১৭ চা বাগান, উৎপাদনে ধস


Ramgarh pic 24

নিজাম উদ্দিন লাভলু, রামগড়:

খরার কারণে ফটিকছড়ির চা বাগানগুলোতে উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। আগামী ১০-১৫ দিন এভাবে অনাবৃষ্টি থাকলে বাগানের চা গাছগুলোই শুকিয়ে মারা যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ফটিকছড়ি উপজেলার ১৭টি চা বাগানে এ বছর উৎপাদন কম হয়েছে ৬৩ লাখ ৪৬ হাজার ৯৫২ কেজি । গেল বছর উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৬৫ লাখ ৬০ হাজার ৩০১ কেজি। এ বছর দুই লাখ ১৩ হাজার ৩৪৯ কেজি চা উৎপাদন কম হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৩.২৫ শতাংশ কম।

অব্যাহত খরার কারণেই মূলত উৎপাদনে ধস নেমেছে বলে জানান চা সংসদ চট্টগ্রাম অঞ্চলের চেয়ারম্যান ও ফটিকছড়ির আছিয়া চা বাগানের ম্যানেজার মমতাজুল হাসান। তিনি জানান, ফটিকছড়ির ১৭টি চা বাগানের গড় উৎপাদনের পরিমাণ ৬৩ লাখ কেজি।

এদিকে বর্তমানে চা রপ্তানী অনেকটা বন্ধের পথেই বলে জানা যায়। উৎপাদন কমে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানী করা অনেকটা কঠিন হয়ে পড়েছে। উদালিয়া চা বাগানের ম্যানেজার শাহাব উল্লাহ সরকার জানান, গত বছর ফেব্রুয়ারী মাসে কিছু বৃষ্টি হলেও এবছর হয় নি। উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসা ছাড়াও ইয়াং চা গাছগুলো মরে মরে অবস্থা। নার্সারির চারা শুকিয়ে যাচ্ছে।

নেপচুন চা বাগানের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার(ডিজিএম) কাজী আরফান উল্লাহ জানান, বৃষ্টির কারণে চা উৎপাদনে চট্টগ্রাম অঞ্চল সব সময় সিলেটের চেয়ে পিছিয়ে থাকে। সিলেটে ইতিমধ্যে বৃষ্টি হলেও চট্টগ্রাম অঞ্চলে এখনও দেখা নেই। তিনি বলেন, এখন উৎপাদনের কথা চিন্তার চেয়ে বাগানের গাছগুলোর জীবন বাঁচানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তাঁরা। আগামী ১০-১৫ দিনের মধ্যে বৃষ্টি না হলে ভয়াবহ অবস্থা হবে বাগানগুলোর।

তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই আবহাওয়ার এ বিরুপ অবস্থা। এ অবস্থায় চা বাগান তথা চা শিল্পকে বাঁচাতে হলে প্রকৃতির উপর নির্ভরতা ত্যাগ করতে হবে। খরা, অনাবৃষ্টি মোকাবেলার জন্য প্রতিটি বাগানে স্থায়ী সেচ ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। আর এ সেচ ব্যবস্থা করতে না পারলে চা চাষ বাদ দিতে হবে।

এদিকে স্থায়ী সেচ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনাবৃষ্টির মধ্যেও ফটিকছড়ির হালদাভ্যালী চা বাগানে উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানাগেছে। বাগানটির সিনিয়র ম্যানেজার মো: জাহাঙ্গীর আলম জানান, প্রাকৃতিক এ খরা মোকাবেলা করে তারা দৈনিক গড়ে তিন হাজার কেজি গ্রীন লিফ উৎপাদন করছেন। গেল বছরে এ পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৫০০ কেজি।

তিনি জানান, হালদাভ্যালী বাগানে ৭০০ একর প্লান্টেশনে ৪৫০ কিলোমিটার মাটির অভ্যন্তরে স্থায়ী সেচ লাইন স্থাপন করা হয়েছে। বাগানের প্রতিটি সেকশনে সেচ লাইনে স্পীংলারের মাধ্যমে বৃষ্টির মত সেচের পানি ছিটানো হচ্ছে। তিনি জানান, ২০০৯ সাল থেকে স্থায়ী সেচ ব্যবস্থাপনার কাজ শুরু করা হয়। বাংলাদেশে সর্বপ্রথম হালদাভ্যালী চা বাগানেই এ স্থায়ী সেচ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়। তিনি জানান, পিএনএল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট নামে পেড্রোলো গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান চা বাগানে এ স্থায়ী সেচ ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ করছে।

হালদাভ্যালী চা বাগানের সফল এ সেচ ব্যবস্থাপনা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে অনেক বাগান মালিক ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। পিএনএল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট বর্তমানে ফটিকছড়ির কর্ণফুলী চা বাগান ও সিলেটের দুটি চা বাগানে স্থায়ী সেচ ব্যবস্থাপনা স্থাপনের কাজ করছে।

এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বাগানের ব্যবস্থাপক বলেন, স্থায়ী সেচ ব্যবস্থাপনা বেশ কার্যকর পদ্ধতি হলেও এটি স্থাপন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। যা ফটিকছড়ির অধিকাংশ বাগানের মালিকের পক্ষে সম্ভব নয়। ঐ ব্যবস্থাপক আরও জানান, অবাধে চা আমদানীর কারণে দেশে চায়ের দাম এত নিম্মমুখি যে, এখন বাগানের মালিকরা চা চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

এদিকে চা বোর্ড সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ১৯৮০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত চায়ের উৎপাদন বৃদ্ধির হার হতাশাব্যঞ্জক। অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রতি বছর ৮ থেকে ৯ শতাংশ বাড়ছে। কিন্তু সে হারে উৎপাদন বাড়ে নি। চা শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে প্রতি বছর যেখানে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ছে ৩.৫ শতাংশ হারে, সেখানে উৎপাদন বাড়ছে মাত্র এক থেকে দেড় শতাংশ হারে। ফলে প্রতি বছর ঘাটতি বেড়েছে। খরা এবং বিদ্যুতের সঙ্কটসহ নানা কারণে উৎপাদন আশানুরূপ নয়। দু’দশক আগেও উৎপাদিত চায়ের প্রায় ৯০ শতাংশ রপ্তানি হতো। আর অবশিষ্ট ১০ শতাংশে দেশের চাহিদা পুরণ করা হতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *