ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর লোকেরা আদিবাসী নয়


chakma

আশিক জামান 

প্রতিবছর ৯ আগস্ট বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ পালন করা হয়। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে দেশে দেশে নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়ে থাকে। আদিবাসীদের অধিকার এবং তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে দাবি দাওয়া উত্থাপিত হয়। উত্থাপিত দাবির যৌক্তিকতা নিরূপণে ‘আদিবাসী’ কারা সে বিষয়ে সম্যক ধারণা আবশ্যক। নৃতাত্ত্বিক সংজ্ঞায় আদিবাসী বা ‘এবোরিজিন্যালস হচ্ছে কোনো অঞ্চলের আদি ও অকৃত্রিম ভূমিপুত্র বা Son of the soil. প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ মর্গানের সংজ্ঞানুযায়ী, আদিবাসী হচ্ছে, কোন স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী, যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই। মর্গান বলেন, The Aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial … they are the true Sons of the soil…(Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972).

আদিবাসী বিষয়ে আভিধানিক সংজ্ঞার বাইরে জাতিসংঘের তরফ থেকে একটি সংজ্ঞা আমরা পেয়ে থাকি। এ বিষয়ে জাতিসংঘ ও এর অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে এ পর্যন্ত প্রধানত তিনটি চার্টারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এগুলো হলো : ১৯৫৭ সালের ০৫ জুন অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ৪০তম অধিবেশনে প্রদত্ত-Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107); আইএলও’র ১৯৮৯ সালের ৭ জুন অনুষ্ঠিত ৭৬তম অধিবেশনে প্রদত্ত Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169) এবং ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে The United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples. এখানে আইএলও’র প্রথম চার্টার দুটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। চার্টার দুটির শিরোনাম হচ্ছে Indigenous and Tribal Populations Convention.  অর্থাৎ আদিবাসী ও উপজাতি জনগোষ্ঠী বিষয়ক কনভেনশন। অর্থাৎ এই কনভেনশনটি আদিবাসী ও উপজাতি সংশ্লিষ্ট । কনভেনশনে পাস হওয়া ধারাগুলো একই সাথে আদিবাসী ও উপজাতি নির্ধারণ ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। Indigenous and Tribal Peoples Convention 1989-এ আদিবাসীর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে: আদিবাসী তারা যারা একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস করছে বা অধিকৃত হওয়া ও উপনিবেশ সৃষ্টির পূর্ব থেকে বসবাস করছে এবং যারা তাদের কিছু বা সকল নিজস্ব সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত অধিকার এবং প্রতিষ্ঠানসমূহ ধরে রাখে। এবার আসা যাক বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে।

উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষণ করে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায়, বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীরাই বাংলাদেশে আদিবাসী। কারণ তারাই আদি জনধারার অংশ। বাংলাদেশের তারাই একমাত্র আদিবাসী এবং Son of the soil বলে দাবি করতে পারে। এর পেছনে অনেক জাতিতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও প্রমাণ রয়েছে। বাঙালি নামের বাংলাদেশের এই আদিবাসীরা যদিও একটি মিশ্র জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত যেখানে বহু জানা-অজানা আদি জনধারার সংমিশ্রণ সাধিত হয়েছে। তবুও যেহেতু এসব জনগোষ্ঠীর এদেশ সুস্পষ্ট অস্তিত্বের ইতিহাস সম্পূর্ণভাবে অজানা এবং স্মরণাতীতকাল থেকে এদের পূর্বপুরুষরা এই সমভূমিতে এসে বসতি স্থাপন করেছে সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই একমাত্র তারাই অর্থাৎ বাঙালিরাই Son of the soil বা আদিবাসী। বিশ্বের তাবৎ শীর্ষস্থানীয় নৃবিজ্ঞানী এবং গবেষক এ ব্যাপারে একমত।

বাংলাদেশে অবস্থিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো কেন আদিবাসী নয়, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর আগমনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। ৫৯০ খ্রিস্টাব্দে পার্বত্য ত্রিপুরা রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা জুয়া রুপা (বীর রাজা) আরাকান রাজাকে পরাজিত করে রাঙ্গামাটিতে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। ৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে আরাকান রাজা সুলা সান্দ্র (Tsula Tsandra, 951-957 A.D) চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আবার দখল করে নেন। ১২৪০ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা রাজা পুনরায় এটিকে উদ্ধার করেন। সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ (১৩৩৮-১৩৪৯) চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু অংশ অধিকার করেন। বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শনের কারনে ১৪১৮ সালে চাকমা রাজা মেয়ান শ্লী (Mowan Tsni) বর্মা হতে বিতাড়িত হয়ে আলীকদমে একজন মুসলিম রাজকর্মচারীর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি (রাজকর্মচারী) রামু এবং টেকনাফে চাকমাদের বসতি স্থাপনের অনুমতি দেন। পার্বত্য এলাকায় সর্বপ্রথম বসতি স্থাপন করে কুকী গোত্রের (লসাই, পাংখু, মোরো, খুমি) উপজাতীয়রা। তাদের আগমন ঘটে উত্তর-পূর্ব দিক (সিনলুই ও চীন) হতে। এরপর ভারতের ত্রিপুরা এবং পার্শ্ববর্তী প্রদেশ হতে ত্রিপুরা গোত্রীয় বিভিন্ন উপজাতীয় (ত্রিপুরা, মরং, তংচংগা ও রিয়াং) আসে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকানী গোত্র (চাকমা ও মগ) এ এলাকায় আগমন করে। কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকান-বার্মা যুদ্ধের সময় মগরা তাদের এ এলাকা ছেড়ে উত্তর দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে চলে যেতে বাধ্য করে। উত্তর দিকে আরকানী গোত্রদের আগমনের ফলে কুকীরা উত্তর-পূর্ব দিকে সরে যেতে বাধ্য হয়। সংক্ষিপ্ত ইতিহাস হতে সহজেই বুঝা যায়, বাংলাদেশে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এদেশের আদিবাসী নয়।

একইভাবে ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, সমতলের উপজাতীয় সম্প্রদায় যেমন সাঁওতাল, গারো, হাজং, মনিপুরী প্রভৃতির বাংলাদেশে আগমনের ইতিহাস তিন-চারশ’ বছরের বেশি নয়। উত্তরাঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, সাঁওতাল সম্প্রদায় রেল সম্প্রসারণের কাজে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ভারতের উড়িষ্যা ও বিহার অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে আসে। কাজেই উপযুক্ত আলোচনায় প্রমাণিত হয় আভিধানিকভাবে বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী কোনোভাবেই এখানকার স্বদেশজাত বা ভূমিপুত্র বা আদিবাসী নয়। প্রখ্যাত উপজাতি গবেষক ও নৃতত্ত্ববিদ RHS Hutchison (1960), TH Lewin (1869), অমেরেন্দ্র লাল খিসা, Jaffa (1989) Ges  Ahmed (1959) প্রমুখের লেখা, গবেষণাপত্র, থিসিস এবং রিপোর্ট বিশ্লেষণে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়, উপ-জাতীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী গুলো আদিবাসী নয়। তারা সবাই একবাক্যে বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজাতীয়রা নিকট অতীতের কয়েক দশক থেকে নিয়ে মাত্র কয়েক শতাব্দী আগে এদেশে স্থানান্তরিত হয়ে অভিবাসিত হয়েছে।

খোদ চাকমা পন্ডিত অমরেন্দ্র লাল খিসা অরিজিনস অব চাকমা পিপলস অব হিলট্রাক্ট চিটাগাং-এ লিখেছেন, তারা এসেছেন মংখেমারের আখড়া থেকে পরবর্তীতে আরাকান এলাকায় এবং মগ কর্তৃক তাড়িত হয়ে বান্দরবানে অনুপ্রবেশ করেন। আজ থেকে আড়াইশ-তিনশ’ বছর পূর্বে তারা ছড়িয়ে পড়েন উত্তর দিকে রাঙ্গামাটি এলাকায়। এর প্রমাণ ১৯৬৬ বাংলাদেশ জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি প্রকাশিত দি অরিয়েন্টাল জিওগ্রাফার জার্নাল। পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান লোকসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই বাঙালি এবং বাকি অর্ধেক বিভিন্ন মঙ্গোলীয় গোষ্ঠীভুক্ত উপজাতীয় শ্রেণীভুক্ত। এ কথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য, আদিকাল থেকে এ অঞ্চলে উপজাতি জনগোষ্ঠীর বাইরের ভূমিপুত্র বাঙালিরা বসবাস করে আসছে তবে জনবসতি কম হওয়ায় বিভিন্ন ঘটনা বা পরিস্থিতির কারণে আশপাসের দেশ থেকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন এসে বসতি স্থাপন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকি জাতিবহির্ভূত অন্য সব উপজাতীয় গোষ্ঠীই এখানে তুলনামূলকভাবে নতুন বসতি স্থাপনকারী। এখানকার আদিম জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ম্রো, খ্যাং, পাংখো, কুকিরা মূল কুকি উপজাতির ধারাভুক্ত। ধারণা করা হয়, এরা প্রায় ২শ’ থেকে ৫শ’ বছর আগে এখানে স্থানান্তরিত হয়ে আগমন করে। চাকমা রাজা দেড়শ’ থেকে ৩শ’ বছর পূর্বে মোগল শাসনামলের শেষ দিকে ব্রিটিশ শাসনামলের প্রথম দিকে মায়ানমার আরকান অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে (Lewin 1869)।

প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এবং ব্রিটিশ প্রশাসক টি.এইচ. লেইউইনের মতে \”A greater portion of the hill at present living in the Chittagong Hill Tracts undoubtedly come about two generations ago for Aracan. This is asserted both by their own traditions and by records in Chittagong Collectorate.\” (Lewin, 1869, P-28)। পার্বত্য অঞ্চলের মারমা বা মগ জনগোষ্ঠী ১৭৮৪ সালে এ অঞ্চলে দলে দলে অনুপ্রবেশ করে এবং আধিপত্য বিস্তার করে। (Shelley, 1992 and Lewin, 1869)। এরা ধর্মে বৌদ্ধ মতাবলম্বী। এরা তিনটি ধারায় বিভক্ত। যেমন : জুমিয়া, রোয়াং ও রাজবংশী মারমা। বোমরা মায়ানমার-চীন পর্বত থেকে নিয়ে তাশন পর্যন্ত বিস্তৃত পার্বত্য অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম আগমন করে। শুধু ভাষাতাত্ত্বিক বিবেচনায়ই নয়, বরং অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের নিরিখেও দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে ঐসব মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মিলের চেয়ে অমিল এবং বিস্তর অনৈক্য বর্তমান।এদের এক একটি জনগোষ্ঠীর বিবাহ রীতি, আত্মীয়তা সম্পর্ক (Keenship Relations), সম্পত্তির মালিকানা বণ্টন রীতি এবং উত্তরাধিকার প্রথা, জন্ম ও মৃত্যুর সামাজিক ও ধর্মীয় কৃত্যাদি বা অন্যান্য সামাজিক প্রথা এবং রীতি এক এক ধরনের এবং প্রায় প্রত্যেকটি আলাদা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত (Denise and Bernot, 1957)।

পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এসব জনগোষ্ঠীগুলো প্রায় সবাই যুদ্ধবিগ্রহ এবং হিং¯্র দাঙ্গা-হাঙ্গামার ফলে তাদের পুরাতন বসতিস্থান থেকে এখানে পালিয়ে এসেছে। নতুবা, এক জনগোষ্ঠী অন্য জনগোষ্ঠীর পশ্চাৎধাবন করে আক্রমণকারী হিসেবে এদেশে প্রবেশ করেছে (Huchinson 1909, Bernot 1960 and Risley 1991) | বর্তমানে এদের পরস্পরের মধ্যে প্রচুর রেষারেষি এবং দ্বন্দ্ব বিদ্যমান রয়েছে বলে জানা যায় (Belal, 1992) । পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের জনসংখ্যার বণ্টনচিত্রও সমান নয়। এরা গোষ্ঠী ও জাতিতে বিভক্ত হয়ে সারা পার্বত্য অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করে। তবে কোনো কোনো স্থানে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে মিশ্র জনসংখ্যা দৃষ্টিগোচর হয়। চাকমারা প্রধানত পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলের চাকমা সার্কেলে কর্ণফুলী অববাহিকা এবং রাঙ্গামাটি অঞ্চলে বাস করে।

মগরা (মারমা) পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণাংশের বোমাং এবং মং সার্কেলে বাস করে। ত্রিপুরা (টিপরা)গণ পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি সার্কেলে অর্থাৎ চাকমা সার্কেল, বোমাং সার্কেল এবং মং সার্কেল সকল স্থানেই ছড়িয়ে থাকলেও নিজেরা দলবেঁধে থাকে। ¤্রাে, থ্যাং, খুমী এবং মরং বোমাং সার্কেলের বাসিন্দা। বাংলাভাষী বাঙালি অভিবাসীরা সারা পার্বত্য চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়লেও এদের বেশিরভাগই দলবদ্ধভাবে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রামগড় প্রভৃতি শহরাঞ্চলে বসবাস করে। বাকি বাঙালি জনসংখ্যা এখানকার উর্বর উপত্যকাগুলো সমভূমিতে গুচ্ছগ্রামে বসবাস করে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের বাদ দিলে এখন আসে এদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট-মৌলভীবাজারের খাসিয়া, মনিপুরী, পাত্র (পাত্তর) গোষ্ঠীর কথা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল অঞ্চলের গারোদের কথা এবং দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুরের কুচ রাজবংশী সাঁওতাল, ওরাও ও মুন্ডাদের কথা। এদের সবাই সংখ্যার দিক বিচারে খুব নগণ্য ও বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, সিলেট অঞ্চলের খাসিয়া, মনিপুরী ও পাত্ররা তৎকালীন বৃহত্তর আসামের খাসিয়া-জয়ন্তী পাহাড়, মনিপুর, কাঁচাড় ও অন্যান্য সংলগ্ন দুর্গম বনাচ্ছাদিত আরণ্যক জনপদ থেকে যুদ্ধ, আগ্রাসন, মহামারী এবং জীবিকার অন্বেষণে সুরমা অববাহিকায় প্রবেশ করে ও সিলেটের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে বসতি স্থাপন করে।

নৃ-বিজ্ঞান ও ভৌগোলিক জ্ঞানের সকল বিশ্লেষণেই এরা উপজাতীয় এবং ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠী বৈ আর কিছুই নয়। এরা কোনো বিবেচনায়ই সিলেটের আদিবাসী হতে পারে না। এরা আদি আরণ্যক পার্বত্য নিবাসের (আসাম, মণিপুর, মেঘালয় ইত্যাদি) আদিবাসী হলেও যখন স্থানান্তরিত হয়ে নতুন ভূখণ্ডে আসে জাতি সেখানে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ক্ষুদ্র উপজাতীয় গোষ্ঠী কিংবা ভিন্ন সংস্কৃতির ক্ষুদ্র জাতিসত্তা হিসেবে সমান্তরালভাবে থাকতে পারে। কিন্তু কখনো তারা নতুন জায়গায় আদিবাসী হতে পারে না। ঠিক একইভাবে ময়মনসিংহ (হালুয়াঘাট অঞ্চল) এবং টাঙ্গাইল অঞ্চলের (মধুপুর) গারো সিংট্যানেরা ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালের পরে এদের অনেকে তাদের আদিনিবাস ভারতের উত্তরের গারো পাহাড়ে ফিরে গেলেও বেশ কিছুসংখ্যক গারো ও সিংট্যানা বাংলাদেশের ঐসব অঞ্চলে রয়ে গেছে। গারোদের আদি নিবাস ভারতের গারোল্যান্ড। কোনোক্রমেই ময়মনসিংহ কিংবা টাঙ্গাইলের তারা আদিবাসী নয়।

আরো বলা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে আজ থেকে ৬০-৭০ কিংবা একশ’-সোয়াশ’ বছর আগে সিলেটের শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং উত্তর সিলেটের কোন নিচু পাহাড়ি অঞ্চলে চা বাগান স্থাপনের জন্য ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা বর্তমান ভারতের বিহার, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন জঙ্গলাকীর্ণ মালভূমি অঞ্চল যেমন: ছোট নাগপুরের বীরভুম, সীঙভুম, মানভূম, বাকুড়া, দুমকা, বর্ধমান প্রভৃতি অঞ্চল যা তৎকালীন সাঁওতাল পরগণাখ্যাত ছিল সেসব অঞ্চলে গরিব অরণ্যচারী আদিবাসী সাঁওতাল, মুন্ডা, কুল, বীর, অঁরাও, বাউরী ইত্যাদি নানা নামের কৃষ্ণকায় আদিক জনগোষ্ঠীর মানুষকে শ্রমিক হিসেবে স্থানান্তরিত করে অভিবাসী হিসেবে নিয়ে আসে। একইভাবে যুদ্ধ, মহামারী থেকে আত্মরক্ষার জন্য এবং জীবিকার সন্ধানে রাজমহলের গিরিপথ ডিঙ্গিয়ে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের বরেন্দ্রভূমি অঞ্চলে (রাজশাহী, দিনাজপুর ও রংপুর) বসবাস শুরু করে। উত্তরাঞ্চলের কুচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলা থেকে দক্ষিণের রংপুর-দিনাজপুরের নদী অববাহিকাম-িত সমভূমিতে নেমে বসবাস শুরু করে কুচ-রাজবংশী জনগোষ্ঠী। এর সকলেই তাদের মূল নিবাসের আদিবাসী হিসেবে বিবেচ্য হলেও কোনো যুক্তিতে তাদের নতুন আবাসস্থল বাংলাদেশের ঐসব অঞ্চলের আদিবাসী বা ভূমিপুত্র হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে না।

উল্লেখ্য, রংপুর, দিনাজপুর ও রাজশাহী অঞ্চলের নি¤œবর্ণের হিন্দুদের সাথে ও স্থানীয় অন্যান্য বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর সাথে কুচ রাজবংশীদের অনেকে সমসংস্কৃতিকরণ প্রক্রিয়ার (Acculturation Process) মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একীভূত (Assimilated) হয়ে গেছে। মানবিক বিবেচনার মহানুভবতায় এদেশে বসবাসকারী মানবগোষ্ঠীর সমান মর্যাদা, অধিকার ও স্বীয় জাতি, ভাষা, ধর্ম অথবা সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের পূর্ণ অধিকার এবং সম্মান নিয়ে সবাই স্বকীয়তায় সমান্তরাল চলতে পারে বা মিশে যেতে পারে। কিন্তু কোনো বিবেচনায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ বাংলাদেশের আদিবাসী নয়।বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠীরা আদিবাসী হিসেবে কোথাও স্বীকৃত নয়। সরকার তাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকার করে না। এরা আদিবাসী হলে অবশ্যই জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে আমরা মানতাম। বাংলাদেশে বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীরাই আদি জনধারার অংশ। তাছাড়া আর কেউ আদিবাসী নয়।

কাজেই জাতিসংঘ ও আইএলওর সংজ্ঞার অপব্যাখ্যা করে বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীদের আদিবাসী বানানোর কোনো সুযোগ নেই। বরং ওইসব কনভেনশন ও চার্টার অনুযায়ী ট্রাইবাল বা উপজাতির যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা বিচার করেই নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো উপজাতি। একই কারণে আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘ চার্টার বাংলাদেশের উপজাতিদের জন্য প্রযোজ্য নয়। বিশ্ব আদিবাসী দিবসে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রকৃত আদিবাসীদের স্বার্থ সংরক্ষিত হোক এবং তাদের অধিকার বাস্তবায়িত হোক, এই আমাদের কামনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *