কাউখালীর কলাবাগান ঝর্ণা হয়ে উঠতে পারে অন্যতম পর্যটন স্পট



আরিফুল হক মাহবুব:

পর্যটন নগরী রাঙামাটির প্রবেশ দ্বার কাউখালী উপজেলা। চট্টগ্রামের রাউজান সীমানা পেরুলেই কাউখালীর অবস্থান। ভৌগোলিক দিক থেকে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ার সীমান্ত ঘেঁষা কাউখালী বেশ বৈচিত্র্যময়। পাহাড়ি-বাঙালিরসহ অবস্থানে গড়ে উঠা এ উপজেলার মানুষের উপার্জনের উৎস হচ্ছে পাহাড় থেকে গাছ, বাঁশ সংগ্রহ করা ও কৃষি। এখানে রয়েছে সম্ভাবনাময় বিশাল বিশাল পর্যটন স্পট।

দেশের বেশিরভাগ মানুষ একটু অবসর পেলেই ছুটে আসেন বিশাল জলপ্রপাত, গিরিঝর্ণা আর সবুজে ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রাণকেন্দ্র রাঙামাটির রূপ উপভোগ করতে। রাঙামাটির অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে শুভলং ঝর্ণা। এ ঝর্ণায় নিজেদের একটুখানি ভিজিয়ে নিতে কতইনা আয়োজন।

কিন্তু অনেকেই জানে না যে, রাঙামাটি প্রবেশের আগেই চট্টগ্রাম-রাঙামাটির সড়কে কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া সেনা ক্যাম্প পেরুলেই কলাবাগান। মূল সড়ক থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে অন্তত পাঁচটি প্রাকৃতিক ঝর্ণা। ঝর্ণাগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উঁচু পাহাড় থেকে ধাপে ধাপে অন্তত দেড় থেকে দু’শ ফুট নিচে নেমে আসছে পানিধারা। প্রতিটি ঝর্ণারই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য। সৌন্দর্যের দিক থেকে কেউ কাউকে ইঞ্চি পরিমাণ ছাড় দিতে রাজি না। যা স্বচোক্ষে না দেখলে কারো বিশ্বাস হবে না। পরিকল্পনা নিয়ে এগুলো এ ঝর্ণাগুলো পর্যটন নগরী রাঙামাটির সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

ঘাগড়ার কলাবাগন থেকে বয়ে চলা ছোট্ট একটি ছড়ার উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অংসখ্য পাথরের উপর দিয়ে পায়ে হেঁটে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে এগুতে হয় মূল ঝর্ণার দিকে। যেতে যেতে অসংখ্য ছোট ছোট ঝর্ণার ছুটে চলা পর্যটকদের নজর কেড়ে নেয়। দেড় কিলোমিটার হেঁটে গেলেই দৃষ্টিনন্দন প্রথম ঝর্ণাটি ভ্রমণ পিপাসুদের স্বাগত জানাবে। এরপর আরেকটু সামনে গেলে তার থেকে আরো উঁচুতে অপর ঝর্ণাটি পর্যটকদের ক্লান্তি দূর করে বিমোহিত করবে। এভাবে একের পর এক যত উঁচুতে উঠবে মানুষ ততই মুগ্ধ হতে থাকবে। সবশেষ আকাশচুম্বী যে ঝর্ণাটি রয়েছে তার উচ্চতা এতই বেশি যে কোন পর্যটক ভয়ে তার কাছে ঘেঁষতে চায় না।

অপার সম্ভাবনাময় প্রকৃতির নিজ হাতে গড়া অপরূপ দৃশ্য ও সৌন্দর্যের সমারোহ উপভোগ করতে ঝর বৃষ্টি উপেক্ষা করে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দৈনিক অসংখ্য পর্যটকের পদচারণায় নির্জন কলাবাগান এলাকার নিরবতাকে জাগিয়ে তোলে। রাঙামাটি পার্বত্য জেলার সবচাইতে বড় দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক এ ঝর্ণাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠতে পারে বিশাল পর্যটন স্পট। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় মাত্র দেড় কিলোমিটার রাস্তার ব্যবস্থা করা গেলে গড়ে উঠতে পারে অর্থনৈতিক জোন হিসেবে, যা বদলে দেবে কাউখালীর চিত্র। পর্যটন শিল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে গত বছর রাঙামাটির জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গেছেন।

এটিকে পরিপূর্ণ পর্যটন জোন হিসেবে গড়ে তোলতে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াতে পাড়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। এ অঞ্চলটি জেএসএস অধ্যুষিত হওয়ায় পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি মুখ্য হয়ে দাঁড়াবে এতে কোন সন্দেহ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে জেএসএস নেতাদের বক্তব্যে এমন ইঙ্গিতই বহন করে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও পর্যটন শিল্পের বিকাশে করণীয় সম্পর্কে কথা হয় জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি ও রাঙামাটি আসনের সাংসদ ঊষাতন তালুকদারের সাথে। তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, শান্তি চুক্তির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন ব্যাতিরেকে পার্বত্য অঞ্চলে কোন উন্নয়ন কর্মকা- এগুতে দেয়া যায় না। তিনি আরো জানালেন, পার্বত্য অঞ্চল থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার ও পুলিশ বাহিনীকে আঞ্চলিক পরিষদে ন্যাস্ত করলে তবেই পর্যটনসহ উন্নয়ন কর্মকা- এগিয়ে নেয়া যেতে পারে।

তাছাড়া এ পর্যটন স্পট ঘিরে নেই কোন আবাসিক ব্যবস্থা, নেই খাবারের হোটেল। প্রধান সড়ক থেকে মূল স্পটে যেতে ঝর্ণা বেয়ে উপরে উঠা ছাড়া যাতায়াতের আর কোন ব্যবস্থা নেই। ফলে এটিকে অর্থনৈতিক জোন হিসেবে গড়ে তোলতে আশপাশের এলাকার নিরাপত্তা, আবাসিক ও যাতায়াত ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন প্রয়োজন।
চট্টগ্রামের রাউজান থেকে বেড়াতে আসা আবু সাঈদ জানান, অপূর্ব অনেকগুলো ঝর্ণার রূপ উপভোগ করলাম। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় অনেক কষ্টে সেখানে যেতে হয়েছে। রাঙামাটি থেকে আসা কলেজ ছাত্রী উর্মি জানান, জায়গাটি রাঙামাটির শুভলং থেকেও অনেক সুন্দর। কিন্তু খুব ভয় ভয় লাগছে, নিরাপত্তার বিষয়টি চিন্তা করলে এখানে আসতে ইচ্ছে হয় না।

হাটহাজারী থেকে বেড়াতে আসা সাহাব উদ্দিন রাজু জানালেন, রাঙামাটির অন্যতম সম্ভাবনাময় এ শিল্পকে এগিয়ে নিতে এখন সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি জানালেন, সমতলে যদি জঙ্গী, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হতে পারে তবে পাহাড় বাদ যাবে কেন? রাষ্ট্রের উন্নয়ন কর্মকা-ে যারা বাধাগ্রস্থ করে তারা জঙ্গীদের চেয়ে কম কিসের? তাদের দাবী গুম, খুন কিংবা অপহরণের মতো অনাকাঙ্খিত ঘটনার ঘটার পূর্বেই পর্যটকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা।

 

সূত্র: পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ, বর্ষ ১, সংখ্যা ২ ও ৩।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *