কল্পনা চাকমা কি বেঁচে আছেন?


পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

কল্পনা চাকমা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত নাম। ১২ জুন ১৯৯৬ সালে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ির নিউ লাইল্লাঘোনা গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে অপহৃত হয় কল্পনা চাকমা। অপহরণের সময় আঞ্চলিক সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। রাজনীতি, আন্দোলন ও নেতৃত্বে স্বল্প সময়ের মধ্যেই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। ফলে তার অপহরণ ঘটনা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলে। অপহরণের পরদিন কল্পনা চাকমার বড় ভাই কালিন্দী কুমার চাকমা বাদী হয়ে স্থানীয় থানায় একটি মামলা করেন।

সে সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. আবদুল জলিলকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল। কমিশন ৯৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেও এ অপহরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি। তবে সরকার সেই তদন্ত প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশও করেনি। মামলা দায়েরের ১৪ বছর পর ২০১০ সালের ২১ মে মামলাটির প্রথম চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। ১৪ বছর তদন্তাধীন থাকার পর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আসামিদের অজ্ঞাতনামা উল্লেখ করে তা দাখিল করা হয়। বাদী ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে নারাজি দিলে পরবর্তী সময়ে অধিকতর তদন্তের জন্য আদালত মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তর করেন। সিআইডি দুই বছর সময় নিয়ে অবশেষে ২০১২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে।সব মিলিয়ে এ ঘটনার তদন্ত হয়েছে তিনবার। এর মধ্যে দুবার তদন্ত করেছে সিআইডি। তাতে দু’বারই নারাজি আবেদন করে কল্পনা চাকমার পরিবার।

সর্বশেষ রাঙামাটির পুলিশ সুপার আমেনা বেগমের দেয়া তদন্ত রিপোর্টও প্রত্যাখ্যান করে মামলার বাদী। অপহরণের পর থেকে মামলার বাদী ও পাহাড়ি সংগঠনগুলো অপহরণের জন্য এক সেনা কর্মকর্তা লে. ফেরদৌস ও তিনজন ভিডিপি সদস্যকে দায়ী করে। কিন্তু দীর্ঘ ১৮ বছরের একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের নাম না আসায় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবী জানিয়ে নারাজি আবেদন দিয়ে যাচ্ছেন মামলার বাদী। বর্তমানে কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলাটি রাঙামাটি জেলা পুলিশ সুপারের অধীনে পুনঃ তদন্তাধীন।

রাঙামাটির বর্তমান পুলিশ সুপার সাইদ তারিকুল হাসানের কাছে এ মামলার তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি জানতে চাইলে তিনি আবারো বলেন, ‘মামলাটি তদন্তাধীন। আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্ত কাজ চলছে। আদালত যেসকল বিষয়ে আলাদা আলাদা করে অবজারভেশন নিয়ে তদন্ত করতে বলেছে আমরা সেগুলো তদন্ত করছি। এটি অনেক পুরাতন মামলা। তাই সময় লাগছে’।

কল্পনা চাকমার অপহরণের তদন্ত নিয়ে যেমন দীর্ঘসূত্রিতা হয়েছে। তেমনি জিইয়ে থাকার সুযোগে একটি মহল এই মামলাকে সামনে রেখে গত ২০ বছর ধরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালী ও সেনাবাহিনীর অবস্থান নিয়ে দেশে বিদেশে ব্যাপক প্রপাগাণ্ডা চালিয়েছে যার বেশিরভাগই মিথ্যা।

উদাহরণ স্বরূপ, চলছি বছর জুন মাসের শুরু থেকে পাহাড়ীদের বিভিন্ন ওয়েব সাইট ও ফেসবুক পেইজে বলা হয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কল্পনা চাকমার বিচার দাবীতে বাংলাদেশ সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির লক্ষে ‘ফটো একশন’ নামে একটি ক্যাম্পেইন চালু করেছে। এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের লোগোসহ কল্পনা চাকমার ছবি হাতে নিয়ে তা পাঠাতে বলা হয়েছে। কিন্তু এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইট খুঁজে এ ধরনের কোনো ক্যাম্পেইনের খবর পাওয়া যায়নি।  অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, একটি মহল থেকে এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের লোগো ও কল্পনা চাকমা ছবি দিয়ে একটি এ্যাপ তৈরী করা হয়েছে। এ্যাপটিতে নিজের ছবি লাগিয়ে পোস্ট করলে আয়োজকরা বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যমে এমনেস্টির লোগোসহ ব্যাক্তির ছবির সাথে কল্পনা চাকমার ছবি প্রচার করছে। অথচ এই প্রপাগাণ্ডায় ব্যবহার করা হচ্ছে এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের নাম।

প্রশ্ন হচ্ছে, কল্পনা চাকমা কোথায়? তিনি কি আদৌ অপহৃত হয়েছিলেন? তিনি কি সেনাবাহিনীর সদস্য কর্তৃক অপহৃত হয়েছিলেন? তিনি কি স্বজন বা পরিচিত কারো দ্বারা অপহৃত হয়েছিলেন? তিনি কি মারা গেছেন? তিনি কি বেঁচে আছেন? বেঁচে থাকলে কোথায় আছেন? — এমন প্রশ্ন বিগত ২০ বছর ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।

পার্বত্যনিউজের তরফে এসকল প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে গিয়ে বিগত ২০ বছরের অনেক তথ্য, উপাত্ত, প্রমাণ, রিপোর্ট, বর্ণণা আমাদের পরীক্ষা করে দেখতে হয়। এই মামলা নিয়ে কাজ করেছেন, শুরু থেকে মামলা পর্যবেক্ষণ করেছেন এমন কিছু লোকের সাথেও কথা হয়।


এ সংক্রান্ত আরো খবর পড়ুন


রাঙামাটি জেলার একজন আইনজীবী শুরু থেকেই কল্পনা চাকমা অপহরণের ঘটনাবলীর উপর নজর রেখেছিলেন।  নিরাপত্তার কারণে না প্রকাশ না করার শর্তে পার্বত্যনিউজকে বলেন, কল্পনা চাকমার অপহরণ তদন্ত করতে গেলে ঘটনার সময় বিচার করা জরুরী। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙ্গামাটি জেলায় পাহাড়ী সংগঠনগুলো নিজস্ব প্রার্থী হিসেবে তাদের অঙ্গ সংগঠন পাহাড়ী গণপরিষদ কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য বিজয় কেতন চাকমাকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে (প্রজাপতি মার্কা) দাঁড় করায়। তার পক্ষে প্রচারণা চালানোর জন্য তাদের প্রকাশ্য সংগঠন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি), পাহাড়ী গণপরিষদ (পিজিপি) ও হিল উইমেন ফেডারেশন (এইচডব্লিউএফ)কে নির্দেশ দেয়। অপরদিকে রাঙামাটিতে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী দীপংকর তালুকদারের পক্ষে নাগরিক কমিটিসহ বেশিরভাগ ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠী ও বাঙ্গালী জনগন সমর্থন দেয় এবং প্রচারণায় নামে । তৎকালীন শান্তিবাহিনীর দোসর পিসিপি, পিজিপি ও এইচডব্লিউএফ দীপংকর  তালুকদারের জনপ্রিয়তায় শঙ্কিত হয়ে তার সমর্থক বিভিন্ন নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ উপজাতীয়দের হুমকি দেয়া ও হয়রানি করা শুরু করে ।

পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা সেসময় সমগ্র পার্বত্যাঞ্চলে প্রায় ৩৫ জন আওয়ামীলীগ সমর্থককে নির্বাচনের আগে ও পরে অপহরণ করে । এদিকে কল্পনা চাকমা আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর হয়ে প্রচার কাজ চালাচ্ছিলেন যদিও তিনি হিল উইমেন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদিকা ছিলেন। এসব মিলিয়ে ঘটনাটি তাদের উপদলীয় কোন্দলের সৃষ্টি করেছিল এবং তাকে উক্ত প্রচার থেকে বিরত থাকার জন্য সন্ত্রাসীরা বেশ কয়েকবার হুমকিও দিয়েছিল। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে কল্পনা চাকমাকে অপহরণের নাটক সাজিয়ে শান্তিবাহিনী ও পিসিপি ভোটের পূর্বের রাতে তাৎক্ষণিক একটি ইস্যু তৈরি করে নির্বাচনে জনমতকে তাদের পক্ষে নিয়ে যাবার অপচেষ্টা চালিয়েছিল।

উক্ত ঘটনার আকষ্মিকতায় এমন পরিস্থিতি তৈরী হয়েছিল যে, প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারদের তথ্য মতে, পাহাড়ী ভোটাররা সকাল ৮ ঘটিকায় ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও ভোট দেয়া থেকে বেশ কিছুক্ষণ বিরত থাকেন। ঐ সময় প্রার্থী নির্বাচনে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বিলম্ব করেন বলেও জানা যায়।

পুরাতন তথ্য বিশ্লেষণ করে ওই আইনজীবী আরো জানান, এরপর ১৭ জুন ১৯৯৬ তারিখ পাহাড়ী গণপরিষদ, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ এবং হিল উইমেন ফেডারেশন কর্তৃক জেলা প্রশাসক বরাবর একটি স্বারকলিপি প্রেরণ করে। কল্পনা চাকমার অপহরণের জন্য সংগঠনগুলো তৎকালীন উগলছড়ি ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার লে. ফেরদৌসকে দায়ী করেন। সংগঠনগুলোর ভাষ্য মতে, ঐদিন দিবাগত রাতে উক্ত কর্মকর্তাসহ নিরাপত্তাবাহিনীর ৮/৯ জন সদস্য উগলছড়ি আর্মি ক্যাম্প থেকে নিউ লাইল্লাঘোনায় এসে জোরপূর্বক কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করে।

ঘটনার সময় খাগড়াছড়িতে কর্মরত ছিলেন এমন একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা পার্বত্যনিউজকে বলেন, লে. ফেরদৌস কচুছড়ি আর্মি ক্যাম্পে ক্যাম্প কমান্ডারের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন । তিনি ১১ জুন ১৯৯৬ তারিখে কচুছড়ি সেনা ক্যাম্প থেকে একটি টহল দলকে নেতৃত্ব দিয়ে উগলছড়ি সেনা ক্যাম্পে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডিউটির জন্য আসেন। তার সাথে আরও তিনজন কর্মকর্তা উগলছড়ি ক্যাম্পে রাত্রিযাপন করেন । ফেরদৌস তার টহলদল ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিয়ে ১২ জুন ১৯৯৬ তারিখ সকাল সাতটায় নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে ক্যাম্প থেকে পোলিং সেন্টারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান।

তিনি আরো বলেন, লে. ফেরদৌস শান্তিবাহিনীর অবৈধ কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সাফল্যজনক কয়েকটি অপারেশন পরিচালনা করেন । ঘটনার কিছুদিন পূর্বে বাঘাইছড়ি ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান সম্রাট সুর চাকমার বাড়ীতে অবৈধ চাঁদা আদায়কারীদের অবস্থানের খবর পেয়ে তিনি একটি তল্লাশী অভিযান চালান । এছাড়াও তিনি আরেকটি অপারেশন চালিয়ে পিসিপির দুইজন অবৈধ চাঁদাবাজকে হাতেনাতে গ্রেফতার করেন । এরপর থেকে সম্রাট সুর চাকমা ও পিসিপি লে. ফেরদৌসকে শায়েস্তা করার জন্য নানা চেষ্টা করে আসছিলেন। তার এই অপারেশন কার্যক্রমে দিশেহারা হয়ে শান্তিবাহিনী ও পিসিপি তার পেট্রোল এর উপর বেশ কয়েকবার এম্বুশ করেও তার কোন ক্ষতি করতে পারেনি। দুঃসাহসিক ও নিবেদিত প্রাণ এই কর্মকর্তা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার অপারেশনাল কর্মকাণ্ড নিষ্ঠার সাথে পালন করে যাচ্ছিলেন।  উপায়ান্তর না দেখে উক্ত অফিসার তথা সেনাবাহিনীকে ঘায়েল করার ভিন্ন পথ খুঁজে নেয় পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা। তারা মিথ্যা অভিযোগ ও অপপ্রচারের অস্ত্র ব্যবহার করার পরিকল্পনা ফাঁদে।

তবে পার্বত্য নাগরিক পরিষদের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আলকাস আল মামুন ভুঁইয়া পার্বত্যনিউজকে বলেন, আমরা শুনেছিলাম, কল্পনা চাকমার তৎকালীন প্রেমিক ও পরবর্তীতে স্বামী অরুণ বিকাশ চাকমা ভারতের অরুণাচল প্রদেশের ভারতীয় যুব কংগ্রেসের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। তারা উভয়েই দূরসম্পর্কের আত্মীয়। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। কিন্তু তাদের প্রেমের ব্যাপারে পারিবারিক বাঁধা থাকায় অরুণ বিকাশ কল্পনাকে অপহরণ করে বলে বিভিন্ন সূত্র অবগত করে। আর এই সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছিল তৎকালীন শান্তিবাহিনী আর পিসিপি’র সদস্যরা। তিনি বলেন, কল্পনা চাকমার প্রেমিক পিসিপি’র সহযোগিতায় এই অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে। বিষয়টি তার পরিবারের সকলেই অবগত।

ঘটনার পর তদন্ত করতে গিয়ে কল্পনা চাকমার বাড়ীতে তার পরিধেয় বস্ত্র, বইপুস্তক ও নিত্য ব্যবহার্য কোন সামগ্রী খুঁজে পায়নি তদন্ত কমিটি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে তিনি অপহৃত হয়েছেন, নাকি স্বেচ্ছায় আত্মগোপন করে নিরাপত্তা বাহিনীকে জড়িয়ে একটি ইস্যু তৈরি করেছেন । এ যাবত পরিচালিত কোন তদন্তেই কল্পনা চাকমা অপহৃত হয়েছেন এমন কোন আলামত পাওয়া যায়নি। পাওয়া যায়নি কথিত অপহরণের সাথে নিরাপত্তাবাহিনীর সংশ্লিষ্টতার কোন প্রমাণ।

কল্পনা চাকমার অপহরণ ঘটনা নিয়ে একটি স্বতন্ত্র তদন্ত করেছিল তৎকালীন মানবাধিকার কমিশন। এ তদন্তের বিষয়ে ১৯৯৬ সালের ৮ আগস্ট রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তদন্তের নানা তথ্য, উপাত্ত, ভিডিও প্রদর্শন করেন। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক ও জাতীয় সমন্বয়কারী এডভোকেট কে এম হক কায়সার বলেছেন, “পূর্ব পরিকল্পিতভাবে তারই লোকজন দ্বারা কল্পনা চাকমা নিখোঁজ রয়েছে।  লে. ফেরদৌস অথবা অন্য কোনো সামরিক বাহিনীর সদস্যই যে, এই ঘটনার সাথে জড়িত নয় তা কল্পনা চাকমার মা, আত্মীয় স্বজন ও স্থানীয় জনগণের বক্তব্যে প্রকাশ পায়। তিনি আরো বলেন, কল্পনা চাকমা বর্তমানে ত্রিপুরা রাজ্যের গণ্ডাছড়া মহকুমার শুক্রে নামক স্থানে অবস্থান করছে। ….বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত প্রতিবেদন পাঠ করেন, সংগঠনের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক ও জাতীয় সমন্বয়কারী এডভোকেট কে এম হক কায়সার। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসোসিয়েট প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ, সাইফুল ইসলাম দিলদার, মুনির উদ্দীন খান, সুপ্রীম কোর্টের এডভোকেট ইতরাত আমিন, মানবাধিকার গবেষণা সহকারী সাহেলা পারভীন লুনা। বিভিন্ন তথ্য প্রমাণসহ লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, কল্পনা চাকমা শেষ কবে মার সাথে যোগাযাগ করেছে, এই প্রশ্নের জবাবে মা বাধনী চাকমা জানান, নিখোঁজ হওয়ার পর দুই বার যোগাযোগ করেছে, এবং সর্বশেষে যোগাযোগ হয়েছে ১ আগস্ট ’৯৬। এতে প্রমাণিত হয় যে, কল্পনা চাকমা বেঁচে আছেন এবং কোথায় আছেন তা তার মা বেশ ভাল ভাবেই জানেন।”(দৈনিক মিল্লাত ৯ আগস্ট, ১৯৯৬)।

এ প্রেস কনফারেন্সের পরদিন ৯ আগস্ট ১৯৯৬ সালে বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টের শিরোনাম দেখা যেতে পারে। ‘মায়ের স্বীকারোক্তি কল্পনা চাকমা এখন ত্রিপুরায়’- দৈনিক মিল্লাত, ‘কল্পনা চাকমা এখন ত্রিপুরায়: মা’র সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে তার’- দৈনিক দিনকাল, ‘কল্পনা চাকমা জীবিত এবং কোথায় আছেন তা তার মা ভালভাবেই জানেন’- দৈনিক ইনকিলাব, ‘কল্পনা চাকমা ত্রিপুরায় আছেন, অপহরণ সাজানো নাটকঃ মানবাধিকার কমিশনের তথ্য প্রকাশ’- দৈনিক পূর্বকোণ, ‘বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের ভাষ্য কল্পনা চাকমা ত্রিপুরায়’- দৈনিক ভোরের কাগজ, ‘কল্পনা চাকমা ভারতে আছেন’- দৈনিক সংগ্রাম, ‘সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, কল্পনা চাকমা ভারতের ত্রিপুরায়।। অপহরণ ঘটনার সাথে সামরিক বাহিনী জড়িত নয়’- দৈনিক আজাদী, ‘অবশেষে রহস্য ফাঁস কল্পনা চাকমা ভারতে’- দৈনিক দেশজনতা, ‘মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ পরিকল্পিতভাবে কল্পনা চাকমাকে নিখোঁজ রাখা হয়েছে’- দৈনিক সবুজ দেশ, ‘সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকার কমিশন, কল্পনা চাকমা এখনো বেঁচে আছেন’- দৈনিক লাল সবুজ, ‘কল্পনা চাকমা ত্রিপুরার গঙ্গাছড়া এলাকায় রয়েছে।। মানবাধিকার কমিশন’- দৈনিক সকালের খবর, `Kalpana Chakma Traced, living in Tripura’- The New Nation.

কল্পনা চাকমাকে গঠিত একটি তদন্ত কমিটির সদস্য ভারতের অরুণাচলে অবস্থিত কল্পনা চাকমার সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি কল্পনা চাকমাকে বাংলাদেশে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন।  কল্পনা চাকমা ফিরতি চিঠিতে তাকে জানান, তিনিও দেশে ফিরতে আগ্রহী। কিন্তু তিনি দেশে ফিরলে তাকে পাহাড়ীদের পক্ষ থেকে হত্যা করা হতে পারে আশঙ্কা করেন।

প্রকৃতপক্ষে কল্পনা চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে একটি মিস্টিরিয়াস ক্যারেক্টার। প্রকৃতপক্ষে তিনি অপহৃত হয়েছেন, পালিয়ে গিয়েছেন, ধর্ষিতা হয়েছিলেন, মারা গিয়েছেন নাকি বেঁচে আছেন এ নিয়ে রয়েছে রহস্যের বিশাল ধুম্রজাল। দেশের স্বার্থে, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, জাতীয় মর্যাদার স্বার্থে এই রহস্যের উদঘাটন জরুরী। কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলা ঝুলে থাকা জাতির জন্য কল্যাণকর হচ্ছে না। তাই দ্রুত গতিতে এই মামলার তদন্ত ও বিচারকাজ সমাপ্ত করে এই ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান জরুরী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *