parbattanews bangladesh

কল্পনা চাকমা ইস্যুতে পার্বত্যাঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি চেষ্টা চালিয়ে আসছে একটি মহল

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাঙামাটি থেকে ফিরে:

কল্পনা চাকমার অন্তর্ধান ঘটেছে ২১ বছর আগে। সেই সময় থেকে এ ইস্যুতে পার্বত্য অঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে আসছিল একটি মহল যা এখনো অব্যাহত আছে। সূত্র বলছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করে বিদেশি সাহায্য আনার স্বার্থেই কল্পনা চাকমা ইস্যুটিকে এতদিন ধরে তারা জিইয়ে রেখেছেন।

সূত্রমতে, প্রতিবছর সভা-সমিতি, বক্তৃতা আর বিবৃতির মাধ্যমে ইস্যুটি টিকিয়ে রাখা হয়েছে। পার্বত্য তিন জেলায় পাহাড়ি-বাঙালির সম্প্রীতির মাঝে এ ইস্যুতে এখনো ছড়ানো হচ্ছে হিংসার বিষবাষ্প। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের চেষ্টাও চালানো হচ্ছে। কল্পনা চাকমা অন্তর্ধান প্রসঙ্গ নিয়ে রাঙামাটির অর্ধশতাধিক মানুষের সঙ্গে আমাদের সময়ের আলাপকালে একই তথ্য জানা গেছে।

আজ ১২ জুন, কল্পনা চাকমার অন্তর্ধান দিবস হিসেবে পালন করে আসছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষদের নিয়ে গড়া কয়েকটি সংগঠন। ১৯৯৬ সালের এই দিনে কল্পনা চাকমা নিখোঁজ হন। এ প্রসঙ্গে দুই ধরনের মত পাওয়া যায় পাহাড়ে। একপক্ষ বলে, অপহরণ করে গুম করা হয় কল্পনা চাকমাকে। অপর পক্ষের দাবি, স্বেচ্ছায় অন্তর্ধান হন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক কল্পনা চাকমা। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মূলত কল্পনা চাকমাকে পুঁজি করে অনেকেই এখন আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. আবদুল জলিলকে সভাপতি করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি কল্পনা চাকমা স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক অপহৃত হয়েছে বলে মতামত দেন। কিন্তু কার বা কাদের দ্বারা অপহৃত হয়েছেন, তা নির্ণয়ে অক্ষমতা প্রকাশ করেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে তারা কারো বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেননি।

১৯৯৭ সালের ১৭ জানুয়ারি বাঘাইছড়ি থানার মামলাটি জেলার বিশেষ শাখায় হস্তান্তর করা হয়। এরপর ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর মামলাটি আবারও বাঘাইছড়ি থানায় চলে আসে। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ২০১০ সালের ২১ মে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে বাঘাইছড়ি থানা। মামলার বাদী কালিন্দী কুমার চাকমা এর বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি আবেদন করলে আদালত ২০১০ সালের ২ সেপ্টেম্বর মামলাটি তদন্তে সিআইডির চট্টগ্রাম জোনকে নির্দেশ দেন। সিআইডি টানা দুবছর তদন্ত শেষে ২০১২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে। কিন্তু বাদী কালিন্দী চাকমার তা মনঃপূত না হওয়ায় তিনি আবারও নারাজি দেন।

আদালত তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ১৬ জানুয়ারি রাঙামাটির পুলিশ সুপারকে তদন্তভার দিয়ে ৪ দফা নির্দেশনা দেন। পুলিশ সুপার তদন্ত চালান। তদন্তের খাতিরে কল্পনা চাকমার দুই বড় ভাইয়ের ডিএনএ সংগ্রহের জন্য অনুমতি চাইলে আদালত ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর নমুনা সংগ্রহের আদেশ দেন।

কিন্তু কালিন্দী কুমার চাকমা এবং লালবিহারি চাকমা (ক্ষুদিরাম) ডিএনএ দিতে রাজি হননি। তারা ডিএনএ নমুনা সংগ্রহে আদালতের দেওয়া আদেশ প্রত্যাহারের আবেদন করেন ২০১৪ সালের ৬ মার্চ। কিন্তু আদালত আগের আদেশই বহাল রাখেন। পরে পুলিশ দীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়েও কল্পনা চাকমার অপহরণ সংক্রান্ত কোনো তথ্যপ্রমাণ এবং সাক্ষী পায়নি। এরপর গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর মামলার কার্যক্রম বন্ধের জন্য আদালতে আবেদন করা হয় যা এখন আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।

এদিকে কল্পনা চাকমা ইস্যু নিয়ে কাজ করা একটি তদন্ত সংস্থা আমাদের সময়কে জানিয়েছে, ঘটনার তদন্তে পুলিশ কল্পনা চাকমার বাসায় গেলে তার ব্যবহার্য পোশাক থেকে শুরু করে বইপুস্তক, তৈজসপত্র কিছুই খুঁজে পায়নি। এমনকি কল্পনা চাকমার মা বাধুনি চাকমা পর্যন্ত জানিয়েছিলেন যে, কল্পিত অন্তর্ধানের পরও তার মেয়ে দুবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালের ১ আগস্ট তিনি যোগাযোগ করেছিলেন বলে জানান তিনি।

কল্পনা চাকমাকে অপহরণের অভিযোগ এনে করা মামলায় বলা হয়, ১৯৯৬ সালের ১১ জুন রাত ১টায় সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ফেরদৌসের নেতৃত্বে একদল সৈনিক কল্পনা চাকমাসহ তার দুই ভাইকে অপহরণ করে। তার ভাইয়েরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও ২৩ বছর বয়সী কল্পনা চাকমাকে গুম করা হয়।

কালিন্দী কুমার চাকমা ঘটনার পরদিন ১২ জুন বাঘাইছড়ি থানায় যে মামলা করে (মামলা নং-২/৯৬১, ধারা-৩৪৬, ১২ জুন ১৯৯৬) সেখানে কিছু অপরিচিত লোকের কথা থাকলেও সেনাবাহিনী এবং গোলাগুলির কথা বলা হয়নি।

অথচ বিশেষ ওই মহলের ইন্ধনে ১৩ জুন লালবিহারি চাকমা দাবি করেন, রাতের আঁধারে কিংবা টর্চলাইটের আলোয় লেফটেন্যান্ট ফেরদৌসসহ তিন সেনাসদস্যকে চিনতে পেরেছেন। মামলায় এসব কথা যোগ করা হলেও কয়েকদফা তদন্তে এর সত্যতা পাননি সংশ্লিষ্ট তদন্ত কমিটির সদস্যরা।

এ প্রসঙ্গে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা আমাদের সময়কে জানান, লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস ঘটনার দিন সকালে নির্বাচন উপলক্ষে দায়িত্ব পালনের জন্য উগলছড়ি ক্যাম্পে আসেন। যা কল্পনা চাকমার বাড়ির কাছেই ছিল। আর সেই ক্যাম্পে লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস একা নন, তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, একজন মেজরসহ আরও দুজন অফিসার এবং প্রায় ৯০ জন সৈনিক ছিলেন। সেনাবাহিনীর সদস্যরা ছাড়াও নির্বাচন পরিচালনার কাজে নিয়োজিত প্রিসাইডিং অফিসার জ্ঞানময় চাকমা, পুলিশের সুবেদার ইদ্রিস আলীসহ ৬ পুলিশ কনস্টেবল ওইদিন উগলছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাতযাপন করেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, এতজন লোকের মাঝে লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস কয়েকজন সৈনিক নিয়ে একটা অপহরণের ঘটনা ঘটাল, গোলাগুলি করল অথচ কেউ সেই গুলি বা চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনল না! অথচ কে না জানে পার্বত্য এলাকার রাতের নিস্তব্ধ নিরিবিলি পরিবেশে এ ধরনের শব্দ অনেকদূর পর্যন্ত শুনতে পাওয়ার কথা। বলা হয়, কল্পনা চাকমার ভাইদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে কারো গায়ে গুলির আঁচড় পর্যন্ত নেই কেন?

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রশ্ন আসতে পারে, সেনা ক্যাম্পে বেশ কয়েকজন অফিসার থাকতে কেন লেফটেন্যান্ট ফেরদৌসকে নিয়ে এই অপপ্রচার। আসলে লেফটেন্যান্ট ফেরদৌসের ওপরে শান্তিবাহিনীর ক্ষোভ অনেক পুরনো। সে সময় বাঘাইছড়ি এলাকায় অনেক সফল অভিযানের নায়ক তিনি। এ কারণেই তার ওপর প্রতিশোধ নিতে এ অপহরণের নাটক করা হয়।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, কল্পনা চাকমা ইস্যুতে বছরের পর লাভবান হচ্ছে এমন পাহাড়ি সংগঠনগুলো সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ক্রমাগত অপপ্রচার চালিয়ে আসছে। ঘৃণার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে পাহাড়ি-বাঙালির মাঝে।

সূত্র: আমাদের সময়।