রহস্যঘেরা কল্পনা চাকমা ‘অন্তর্ধান ইস্যু’


২১ বছর ধরে পার্বত্য অঞ্চলকে উত্তপ্তের চেষ্টা চালাচ্ছে একটি মহল

বিশেষ প্রতিনিধি: 
কল্পনা চাকমার ‘অন্তর্ধান ইস্যু’ নিয়ে সুবিধা নিয়েছে পার্বত্য অঞ্চলের একটি মহল। গত ২১ বছর পার্বত্য অঞ্চলকে অস্থির করার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল ওই মহলটি। এই ইস্যুকে পুঁজি করে বিদেশিদের কাছ থেকেও টাকা এনেছেন। এই ইস্যু জিইয়ে রাখতে দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে আসছেন নানা প্রচারণা। পাহাড়ি-বাঙালিদের সহাবস্থান আর ভালো সম্পর্কের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন হিংসার বিষ। এই ঘটনা নিয়ে ওই মহলটি দেশের অখণ্ডতার ধারক-বাহক সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্টের চেষ্টা হচ্ছে।

১৯৯৬ সালের ১১ জুন কল্পনা চাকমা নিখোঁজ হয়েছিল। অবশ্য কেউ বলেন অপহরণ করে তাকে গুম করা হয়েছে। আবার কেউ বলেন স্বেচ্ছায় অন্তর্ধান হয়েছেন। এই বিষয়টি আজও রহস্য ঘেরা। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, কল্পনা চাকমার এই ইস্যুকে পুঁজি করে অনেকেই এখন অনেক টাকার মালিক হয়েছেন।

জানা যায়, ১৯৯৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সরকার সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. আবদুল জলিলকে সভাপতি করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি কল্পনা চাকমা নিজ ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক অপহূত হয়েছে বলে মতামত দেন। কিন্তু কার দ্বারা অপহূত হয়েছে তা নির্ণয় করতে অক্ষমতা প্রকাশ করেন। এ প্রেক্ষিতে তারা কারও বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করেনি।

১৯৯৭ সালের ১৭ জানুয়ারি বাঘাইছড়ি থানার মামলাটি জেলার বিশেষ শাখায় হস্তান্তর করা হয়। এরপর ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর মামলাটি আবারও বাঘাইছড়ি থানা গ্রহণ করে দীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়ে ২০১০ সালের ২১ মে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। মামলার বাদী কালিন্দী কুমার চাকমার বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি আবেদন করলে আদালত ২০১০ সালের ২ সেপ্টেম্বর মামলাটি তদন্তে সিআইডির চট্টগ্রাম জোনকে নির্দেশ দেয়। সিআইডি দীর্ঘ ২ বছর তদন্ত করে ২০১২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে।

ওই প্রতিবেদন কালিন্দী চাকমার মনঃপূত না হওয়ায় তিনি আবারও নারাজি দেন। আদালত আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ১৬ জানুয়ারি রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপারকে তদন্ত ভার দিয়ে ৪ দফা নির্দেশনা দেয়। পুলিশ সুপার দীর্ঘ তদন্ত চালান। তদন্তের খাতিরে কল্পনা চাকমার দুই বড় ভাইয়ের ডিএনএ সংগ্রহের জন্য অনুমতি চাইলে আদালত ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর নমুনা সংগ্রহের আদেশ দেন।

কিন্তু কালিন্দী কুমার চাকমা এবং লালবিহারি চাকমা (ক্ষুদিরাম) ডিএনএ দিতে রাজি হননি। তারা ২০১৪ সালের ৬ মার্চ আদালতের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের আদেশ প্রত্যাহারের আবেদন করেন। কিন্তু আদালত তার আদেশ বহাল রাখেন। পরে পুলিশ দীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়েও কল্পনা চাকমার অপহরণ সংক্রান্ত কোনো তথ্য প্রমাণ এবং সাক্ষী পায়নি।

এ প্রেক্ষিতে গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর মামলার কার্যক্রম বন্ধের জন্য আদালতে আবেদন করে। আবেদনটি এখন আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। এদিকে কল্পনা চাকমা ইস্যু নিয়ে কাজ করা একটি তদন্ত সংস্থা জানিয়েছে, ঘটনার তদন্তে পুলিশ কল্পনা চাকমার বাসায় গেলে তার ব্যবহার্য পোশাক থেকে শুরু করে বই-পুস্তক তৈজসপত্র কিছুই খুঁজে পায়নি।

এমনকি কল্পনা চাকমার মা বাধুনি চাকমা পর্যন্ত বলেছিলেন, কল্পিত অন্তর্ধানের পরও তার মেয়ে দু’বার তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালের ১ আগস্ট সে যোগাযোগ করেছিল। কল্পনা চাকমার অপহরণ ঘটনা নিয়ে মামলায় বলা হয়, ১৯৯৬ সালের ১১ জুন রাত একটায় লেফটেন্যান্ট ফেরদৌসের নেতৃত্বে একদল সৈনিক কল্পনা চাকমাসহ তার দুই ভাইকে অপহরণ করে। তার ভাইয়েরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও ২৩ বছর বয়সী কল্পনা চাকমাকে গুম করা হয়েছে।

কালিন্দী কুমার চাকমা ঘটনার পরদিন ১২ জুন বাঘাইছড়ি থানায় যে মামলা করে (মামলা নং-২/৯৬১) সেখানে কিছু অপরিচিত লোকের কথা থাকলেও সেনাবাহিনী এবং গোলাগুলির কথা বলা হয়নি। অথচ বিশেষ ওই মহলের ইন্ধনে ১৩ জুন লালবিহারি চাকমা দাবি করে, রাতের আঁঁধারে কিংবা টর্চ লাইটের আলোয় লেফটেন্যান্ট ফেরদৌসসহ তিনজন সেনা সদস্যকে চিনতে পেরেছে। মামলায় এসব কথা যোগ করা হলে কয়েক দফা তদন্তে এসবের সত্যতা পায়নি সংশ্লিষ্ট তদন্ত কমিটির সদস্যরা।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, কল্পনা চাকমা ইস্যুতে বছরের পর লাভবান হচ্ছেন এমন পাহাড়ি সংগঠনগুলো সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ক্রমাগত অপপ্রচার চালিয়ে আসছে। ঘৃণার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে পাহাড়ি-বাঙালির মাঝে।

সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *