এবার অস্ত্র রফতানি করবে বাংলাদেশ


Capture

ডেস্ক রিপোর্ট:
প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ রফতানি করা হচ্ছে। এ সংক্রান্ত প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাণিজ্য ও কূটনীতিসহ অন্যান্য আইনে কোনো বাধা না থাকলে খুব শীঘ্রই শুরু হবে রফতানি প্রক্রিয়া।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করতে তৈরি করা হয়েছে অত্যাধুনিক বিডি-০৮ রাইফেল ও বিভিন্ন ধরনের গোলাবারুদ। এগুলো উত্পাদন করেছে বাংলাদেশ স্বশস্ত্র বাহিনী বিভাগ পরিচালিত জয়দেবপুর সমরাস্ত্র কারখানা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্রবাহিনী বিভাগ সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য। সংশ্লিষ্টরা জানান, বিদেশ থেকে অস্ত্র আমদানিতে সরকারকে নানা রকম বাধার সম্মুখীন হতে হতো। আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিবন্ধকতা ছিল উল্লেখ করার মতো। পাশাপাশি অস্ত্র আমদানিতে উচ্চ হারের সুদ ও নানা শর্ত পূরণের ঝামেলা তো ছিলই। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অস্ত্র আমদানিতে কোনো কোনো দেশের কাছে জবাবদিহির বিষয়টিও থাকে। মূলত এসব প্রতিবন্ধকতা এড়াতে বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় প্রযুক্তিতে সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদ তৈরির কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানার কমান্ডেন্ট মেজর জেনারেল আনোয়ারুল মোমেন বলেন, ‘অস্ত্র ও গোলাবারুদ রফতানির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি মিলেছে। আইনি, কূটনীতিক ও বাণিজ্যিক দিক পর্যালোচনায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ইতিবাচক মতামত দিলেই অস্ত্র ও গোলাবারুদ রফতানির চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। এখন অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিক্রির বাজার ও ক্রেতা খুঁজছি আমরা। এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত ‘অস্ত্র বাণিজ্য মেলায়’ অংশ নেয়ারও পরিকল্পনা করছি।’

                                                                          Capture 2

সরকারের কাছে উপস্থাপিত এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা এখন অতি উন্নতমানের ৭ দশমিক ৬২ মি.মি. অটোমেটিক অ্যাসল্ট রাইফেল বিডি-০৮ উৎপাদন করছে। এ রাইফেলটির বার্ষিক উৎপাদন বাড়িয়ে ১৪ হাজারে উন্নীত করা হয়েছে। এছাড়া নতুন কার্তুজ কারখানা চালু হওয়ায় সামগ্রিক ক্ষুদ্রাস্ত্র কার্তুজ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বর্তমানে ওই কারখানার মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৬০ মিলিয়নে উন্নীত হয়েছে। অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গ্রেনেড ফ্যাক্টরির বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ২ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখে উন্নীত করা হয়েছে। ওই কারখানার সামগ্রিক উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংযোজনের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা গ্রেনেড ফিউজ কম্পোনেন্ট উৎপাদনের প্রযুক্তি অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এছাড়া বিদ্যমান টিএনটি ফিলিং প্লান্টটি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে বহুমুখী উৎপাদন উপযোগী হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানায় ১০৫ মি.মি. ও ১২২ মি.মি. আর্টিলারি শেল এবং ৬০ মি.মি. ও ৮২ মি.মি. মর্টারের টিএনটি ফিলিং কার্যক্রম সম্পাদন করা সম্ভব। এরই মধ্যে সমরাস্ত্র কারখানা নিজস্ব প্রযুক্তি ও কারিগরি উদ্ভাবনী ক্ষমতার মাধ্যমে ৬০ মি.মি. মর্টার শেল প্রস্তুত করে ফায়ারিং কার্যক্রম সম্পাদন করেছে।

এছাড়াও বর্তমানে গবেষণার মাধ্যমে ৮২ মি.মি. মর্টার শেল বডি তৈরির কার্যক্রম চলছে। হাই ক্যালিবার অ্যামুনিশন শেল বডি (১০৫ মি.মি. থেকে ১৩০ মি.মি. পর্যন্ত আর্টিলারি শেল এবং ৬০ মি.মি. ও ৮২৫ মি.মি. মর্টার) তৈরি করতে প্রয়োজনীয় কারিগরি কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিজস্ব প্রযুক্তি ও কারিগরি উদ্ভাবনী ক্ষমতার মাধ্যমে ৭ দশমিক ৬২ মি.মি. লাইট মেশিনগান এবং ২৬ মি.মি. সিগন্যাল পিস্তলের পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হয়েছে।

                                                                               BD-08_Firing

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘অস্ত্র ও গোলাবারুদ রফতানি ইতিবাচক উদ্যোগ। নিজস্ব চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত অস্ত্র বিদেশে রফতানি করা যুক্তিযুক্ত। আমার জানা মতে, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে অস্ত্র ও গোলাবারুদ রফতানির বাজার রয়েছে।’ এই নিরাপত্তা বিশ্লেষকের পরামর্শ— অস্ত্র ও গোলাবারুদ রফতানির ক্ষেত্রে জি টু জি (সরকার হতে সরকার) পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। ‘দেশে ব্যবহৃত বেশিরভাগ অস্ত্রই ক্ষুদ্রাস্ত্র। ভারি অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন খুব কম। তাই ক্ষুদ্রাস্ত্র তৈরির ওপরই বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, সামরিক খাতে বেশিরভাগ অর্থ ব্যয় হয় ভারি অস্ত্র আমদানিতে। দেশীয় প্রযুক্তিতে ভারি অস্ত্র তৈরি করা গেলে অনেক অর্থ সাশ্রয় হবে। বিশেষ করে এয়ার ক্রাফট ও ট্যাঙ্ক তৈরির উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।’

এদিকে আইন, স্বরাষ্ট্র, বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর আর্মড ফোর্সেস ডিভিশানের চিঠির প্রেক্ষিতে রফতানি সংক্রান্ত বিভিন্ন আইন ও বাণিজ্যিক দিক পর্যালোচনা করছে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়। তারা মতামত জানিয়ে দ্রুত চিঠি দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশ বছরে ১৪ হাজার উন্নতমানের বিডি-০৮ রাইফেল উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আফ্রিকা মহাদেশসহ বাংলাদেশি কর্মীদের অবস্থান করা শান্তি মিশনের বিভিন্ন দেশে অস্ত্র রফতানির সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে কূটনৈতিক তত্পরতার মাধ্যমে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিক্রি করে বাণিজ্যিক সুবিধা নিতে পারে বাংলাদেশ। এ ছাড়া অস্ত্র ক্রয় প্রক্রিয়া থেকেও মোটা অংকের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারবে বাংলাদেশ। জানা গেছে, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে এখন ভারত ও পাকিস্তান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অস্ত্র ও গোলাবারুদ রফতানি করে আসছে। তৃতীয়তম দেশ হিসেবে এখন বাংলাদেশ অস্ত্র ও গোলাবারুদ রফতানি ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছে।

প্রসঙ্গত, সমরাস্ত্র কারখানা ১৯৬৮ চীন সরকারের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭০ সালের ৬ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয় এ প্রতিষ্ঠান। মুক্তিযুদ্ধের পর সংস্কার করা হয় সমরাস্ত্র কারখানাটি। ১৯৮২-৮৩ অর্থবছরে আধুনিকতার কাজ শুরু হয়, চলে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত। ২০০৪-০৫ অর্থবছরে রাইফেল বিডি-০৮ প্রস্তুতের প্রক্রিয়া শুরু হয়। যা সফলতা পায় ২০০৮ সালে।

সমরাস্ত্র কারখানার মেশিনারি উত্পাদন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করছে চীন। এর বাইরেও রয়েছে অস্ট্রিয়া, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, জার্মানী ও ইতালীর সহায়তা। প্রতিষ্ঠানটি কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে পরিচালিত স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। যার অবস্থান এখন ঈর্ষণীয়।

বর্তমানে সমরাস্ত্র কারখানার অধীন একটি ছোট অস্ত্র কারখানা, একটি ছোট গোলাবারুদ কারখানা, একটি গ্রেনেড কারখানা, একটি কামান গোলাবারুদ ফ্যাক্টরি এবং অস্ত্র তৈরির উপাদান কারখানা পরিচালিত হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *