একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: খাগড়াছড়িতে নিরাপত্তায় প্রধান চ্যালেঞ্জ


এইচ এম প্রফুল্ল, খাগড়াছড়ি:
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশে মতো পাহাড়ি জনপদ খাগড়াছড়িতেও আমেজ বইতে শুরু করেছে। জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক সংগঠনগুলোও নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে সাথে চার আঞ্চলিক পাহাড়ি সংগঠনের এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে রক্তাক্ত হচ্ছে সবুজ পাহাড়। প্রাণ হারাচ্ছে সংগঠনের নেতাকর্মী ছাড়াও জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষ।

পাহাড়ী সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো সশস্ত্রাবস্থায় পাড়া বৈঠক, উঠান বৈঠক করে তাদের সমর্থিত প্রার্থিদের পক্ষে ভোট দেয়ার জন্য ভোটারদের নির্দেশ দিচ্ছে। তাদের কথা না শুনলে প্রতিফল স্বরূপ কী হতে পারে তা মনে করিয়ে দিয়ে হুমকিও দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে এই জেলার দূর্গম পাহাড়ী প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী পাহাড়ী সাধারণ বাসিন্দারা এসকল আঞ্চলিক পাহাড়ী সংগঠনগুলোর সশস্ত্র গ্রুপগুলোর কাছে প্রবলভাবে জিম্মী। তাদের জীবনে এ সন্ত্রাসীরাই সরকার, হর্তা কর্তা, ভাগ্য বিধাতা।

নিরাপত্তার সকল ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও এসকল সাধারণ পাহাড়ীদের জীবন এখনো পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের বন্দুকের নলের টার্গেট থেকে সরানো যায়নি। চাঁদা দিয়ে, অত্যাচারিত, নির্যাতিত হয়েও তাদেরকে এসব সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রিত ছকেই চলতে হয়। ফরে তারা কখনোই তাদের পছন্দের প্রার্থিকে ভোট দিতে পারে না।

এদিকে নিত্য নতুন নানা ইস্যু ও ফ্রন্ট খুলে সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাধারন মানুষের স্বঃ:স্ফূর্ত ও পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

৯টি উপজেলা ও ৩ পৌরসভা নিয়ে গঠিত খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসনে এবার ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৪১ হাজার,৭৪৪ জন। তার মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২৬ হাজার ৪৯১ এবং নারী ভোটার ২ লাখ ১৫ হাজার ২৫৩ জন। ভোট কেন্দ্র ১৮৭টি। তিনটি কেন্দ্রে নির্বাচনী কাজে সহায়তায় ব্যবহার হবে হেলিকপ্টার।

এদিকে নির্বাচনের আগ মুহুর্তে এসেও আঞ্চলিক পাহাড়ি সংগঠনগুলোর আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে প্রায়ই গর্জে উঠে তাদের বন্দুক। রক্তাক্ত হয় সবুজ পাহাড়ের এ জনপদটি।১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পর পাহাড়ে জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় ওরফে সন্তু লারমরা নেতৃত্বাধীন শান্তিবাহিনীর রাজনৈতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ভাগ হয়ে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবীতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) গঠিত হয়। সে থেকে পাহাড়ে শুরু হয় দুই সংগঠনের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। সংঘাত-সংঘর্ষে প্রাণ হারায় দুই সংগঠনের অংসখ্য নেতাকর্মী।

পাশাপাশি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন না থাকলেও ২০০১ সাল থেকে খাগড়াছড়ির ২৯৮ নং আসনে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ। সর্বশেষ নির্বাচনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬৭ হাজার ৭ শ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থী প্রসিত বিকাশ খীসা। এ নির্বাচনে ইউপিডিএফের পাশাপাশি জনসংহতি সমিতির মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা(এমএন)সমর্থিতরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।

২০০৮ সালে জেএসএস ভেঙ্গে সুধা সিন্দু খীসার নেতৃত্বে গঠিত হয় জেএসএস(এমএন) গ্রুপ। এবার শুরু হয় ত্রিমুখী সংঘাত। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির(এমএন) গ্রুপর অংশ নেয়। সর্বশেষ গত বছরের ১৫ নভেম্বর প্রসীত বিকাশ খীসার ইউপিডিএফ ভেঙ্গে গঠিত হয় ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক। এ চারটি গ্রুপের সংঘাতে গত ২১ বছরের জনপ্রতিনিধিসহ প্রাণ হারিয়ে প্রায় ৬ শতাধিক। অপহরণ হয়েছে কয়েক হাজার। নিখোঁজের তালিকায় পাহাড়িদের পাশাপাশি বহু বাঙালি রয়েছে। চাঁদাবাজি চলছে প্রতিযোগিতা দিয়ে।

নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে সন্ত্রাসীরা বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্রসহ দফায় দফায় গ্রেফতার হলেও থামছে বন্দুক যুদ্ধ, খুন, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও চাঁদাবাজি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোও প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশাপাশি আধিপত্য বিস্তারের জেরে পাল্টাপাল্টি হত্যাকাণ্ড, অপহরণ ও হামলায় জড়িয়ে পড়ছে আঞ্চলিক দলগুলো। ফলে নির্বাচন আদৌ প্রভাবমুক্ত ও অবাধ-সুষ্ঠু হবে কিনা এ নিয়ে প্রবল সংশয় রয়েছে জনমনে।

জেলা সদরের এনজিও কর্মী শেফালিকা ত্রিপুরা চার সশস্ত্র গ্রুপের তৎপরতায় সাধারণ মানুষ ভালো নেই বলে জানিয়েছে। প্রবীণ সাংবাদিক তরুণ কুমার ভট্টাচার্য বলেন, আঞ্চলিক দলগুলো অতীতে স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনগুলোতে অংশ নিয়ে ভালো ফলাফল করলেও চাঁদাবাজি ও অপহরণসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তেমন প্রভাব ফেলতে পারবে না।

ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের সংগঠক অংগ্য মারমা বলেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও প্রার্থী নির্ধারণের প্রস্তুতি তাদেরও রয়েছে। অপর দিকে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মিঠুন চাকমা বলেন, সাধারণ মানুষের মাঝে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু অর্জন হয়েছে তা প্রমাণের জন্য তারাও নির্বাচনে অংশগ্রহণের কথা ভাবছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম অধিকার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি এডভোকেট আব্দুল মালেক মিন্টু নির্বাচনের আগে পাহাড়ে চিরুনী অভিযান চালানোর দাবী জানিয়ে বলেন, খাগড়াছড়ির অধিকাংশ ভোট কেন্দ্র দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়। ঐ সব এলাকা সশস্ত্র গ্রুপগুলোর নিয়ন্ত্রণে। এখানে প্রায়ই এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য লড়াই চলছে। প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। ফলে নির্বাচনে সাধারণ মানুষ তাদের প্রার্থীর পক্ষে ভোটাধিকার আদৌ করতে পারবে কিনা সংশয় রয়েছে।

খাগড়াছড়ি জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো: জাহিদ হোসেন বলেন, নির্বাচনে সকল প্রস্তুতি রয়েছে। তিনি খাগড়াছড়ি আসনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর দাবী করে বলেন, সাধারণ মানুষ যাতে তার পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে পারে কমিশন যথা সময়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *