ইউপিডিএফের হুমকিতে বাঘাইছড়ির ৫২ পরিবারের ১৩৩ সদস্য বাস্তচ্যুত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে


বাঘাইছড়ি প্রতিনিধি:
রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় প্রতিপক্ষ ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের নির্যাতন, হামলা ও হুমকিতে জেএসএস (এমএন) গ্রুপের নেতকর্মী-সমর্থকদের ৫২ পরিবারের ১৩৩ জনকে বাড়ি-ঘর ছেড়ে বাঘাইছড়ি সদরে আশ্রয় নিতে হয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী, শিশু ও বৃদ্ধ রয়েছে। সন্ত্রাসীরা শুধু নিপীড়ন ও নির্যাতন করে ক্ষান্ত হয়নি, কেড়ে নিয়েছে মোবাইল ফোন এমনকি নগদ অর্থও।

শুক্রবার (২০এপ্রিল) দুপুরে বাঘাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পালিয়ে আসা এসব উদ্বাস্ত পরিবারের সদস্যরা সন্ত্রাসী হামলা থেকে রক্ষার জন্য পার্বত্যনিউজ প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন। এসময় উপজেলার জীবঙ্গছড়া কমিউনিটি সেন্টারে এক সাংবাদিক সম্মেলন এর আয়োজন করে।

জেএসএস এমএন লারমা পন্থী বাঘাইছড়ি থানা কমিটির সভাপতি সুরেশ কান্তি চাকমা পার্বত্যনিউজকে বলেন, বাঘাইছড়ির বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে মোট ৫২ পরিবারের ১৩৩ জন সদস্য ভিটেছাড়া হয়ে মারিস্যাতে আশ্রয় নিয়েছে। এদের মধ্যে ৩৬ পরিবার জীবঙ্গতলী কমিউনিটি সেন্টারে আশ্রয় নিয়েছে। বাকিরা আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। সুরেশ কান্তি চাকমার বাড়ি বঙ্গলতলী ইউনিয়নের ঝগড়াবিল এলাকায়।

নিজের এলাকা ছাড়ার কারণ হিসাবে তিনি পার্বত্যনিউজকে বলেন, ইউপিডিএফের প্রাণনাশের হুমকির মুখে তিনি এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। তিনি আরো বলেন, ভিটেমাটি ছাড়া জনগণ এখানে এসে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। যারা আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে আছেন, দরিদ্র আত্মীয়রা দীর্ঘদিন তাদের ভরণপোষণ করতে পারছে না। যারা কমিউনিটি সেন্টারে আছে তারা স্থানীয়দের সাহায্য সহযোগিতার কোনোমতে টিকে আছে। বেশী সমস্যা হচ্ছে, নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন হুমকির মুখে। তিনি অতিশীঘ্র এই অবস্থার নিরসনে প্রশাসনের সহায়তা চান।

এম এন লারমা বাঘাইছড়ি উপজেলা শাখা’র সাংগঠনিক সম্পাদক জ্যোসি চাকমা লিখিত বক্তব্য বলেন, বৈসাবি উৎসব চলাকালে ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের সন্ত্রাসীরা বাঘাইছড়ি সদর, রুপকারী, বড়াদম, বঙ্গলতলী করেঙ্গাতলী, বারিবিন্দু ঘাট ও বাঘাইহাটের দুর্গম এলাকাগুলোতে হানা দিয়ে জেএসএস(এম এন লারমা)সংগঠনের কর্মী, সমর্থক ও আত্নীয় স্বজনের উপর হামলা, নির্যাতন শুরু করে এবং এক ঘন্টার মধ্যে এলাকা না ছাড়লে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। ফলে প্রাণের ভয়ে অনেকে এক কাপড়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।

এ সময় সন্ত্রাসীরা উপরে উল্লেখিত লোকজনদের মারধর,পাশবিক নির্যাতন করে মোবাইল ফোন ও টাকাসহ মূল্যবান জিনিসপত্রও কেড়ে নেয়। তাদের অপরাধ, তাদের আত্মীয়-স্বজনরা জেএসএস (এমএন)দলের রাজনীতির সাথে জড়িত।

বিতাড়িত হওয়া লোকদের মধ্যে অনেক জনপ্রতিনিধিও রয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছে বিবেকা রঞ্জন চাকমা(বর্তমান মেম্বার)বঙ্গলতলী ইউনিয়ন, সমর বিজয় চাকমা(বর্তমান মেম্বার) রুপকারী ইউনিয়ন। তারাও পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। পরিবারের মধ্যে রয়েছে সুদর্শন চাকমা’র স্ত্রী-কন্যা ও পিতা- মাতা; দুলুবনিয়া, করেঙ্গাতুলি থেকে জগদীশ চাকমা’র পিতা- মাতা; এ ব্লক থেকে সোহেল চাকমা’র পিতা- মাতা; উত্তর বঙ্গলতুলী থেকে চয়ন চাকমা’র পিতা- মাতা; মাচালং থেকে দোরবান্যা চাকমা’র পরিবার; ডাঙ্গাছড়া থেকে অশোক কুমার চাকমা’র পরিবার; ডাঙ্গাছড়া থেকে আদর কুমার চাকমা’র পরিবার; কাট্টলী থেকে ননা চাকমা’র পরিবার; কাট্টলী থেকে মেনন চাকমা’র পরিবার; বালুখালী থেকে জ্ঞান সিন্ধু চাকমা’র পরিবার(বর্তমান মহিলা মেম্বার); যশোকান্তি চাকমা’র পরিবার; প্রিয় মনি চাকমা’র পরিবার; বি ব্লক থেকে রিপেল চাকমা’র পরিবার; ধীরেন্দ্র চাকমা’র পরিবার; সাজেক রেটকাবা থেকে বৃষমতি চাকমা ।

তারা পার্বত্যনিউজ প্রতিনিধির কাছে অভিযোগ করে বলেন, ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে রাজনীতির নামে সাধারণ মানুষের উপর অমানবিক শারীরিক নির্যাতন, লুট-পাট ও সামাজিক বিচারের নামে মোটা অংকের টাকা আদায় করছে বলে অভিযোগ করে।

বাঘাইছড়ি উপজেলার বঙ্গলতলী ইউনিয়ের মহিলা মেম্বার শেফালি চাকমা অভিযোগ করেন, তিনি একজন মেম্বার কোন আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত নন। অথচ গত রবিবার সকালে ইউপিডিএফ’র সন্ত্রাসীরা তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়।

এম এন লারমা বাঘাইছড়ি উপজেলা শাখা’র সাধারণ সম্পাদক-জ্ঞানজীব চাকমা বলেন, ইউপিডিএফ যেহেতু আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল, সেহেতু প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মীবাহিনীর পরিবার-আত্নীয় স্বজনের উপর ইউপিডিএফের এমন ন্যক্কারজনক হস্তক্ষেপ ও এমন অনাকাঙ্কিত ঘটনার তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে উদ্বাস্তু পরিবার,আত্নীয়-স্বজনদের নিশ্চিত নিরাপত্তাসহ স্ব-সম্মানে পুনর্বাসনের জোর দাবি জানাচ্ছি।

২০ এপ্রিল জীবঙ্গছড়া কমিউনিটি সেন্টারে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নারী শিশুসহ অনেক লোক মারাত্বক অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এরমধ্যে অনেক শিক্ষার্থী ও রয়েছে। এমতাবস্থায় আশ্রিত লোকজনের দুঃখ দূর্দশা দেখে স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় টাকা উত্তলন করে ত্রাণ সরবরাহ করা হয়।

হামলা হুমকির ঘটনায় বাঘাইছড়ি থানার ওসি মো: আমির হোসেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করাহলে তিনি বলেন, আমি ঘটনাটি অবগত হয়েছি তবে থানায় কেউ অভিযোগ নিয়ে আসেনি। কেউ অভিযোগ দিলে প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জেএসএস এমএন লারমা সমর্থিত লোকজনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইউপিডিএফ’র বাঘাইছড়ি সমন্নয়ক জুয়েল চাকমার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এটি তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে হয়ে থাকতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *