আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের অভাবে ধুঁকছে রাঙ্গামাটি টেক্সটাইল মিল, লোকসান গুনছে প্রতিবছর


আবাসিক ব্যবস্থা অকেজো, ঝুঁকিতে কাজ করছে শ্রমিকরা, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের অভাবে ধুঁকছে রাঙ্গামাটি টেক্সটাইল মিল, লোকসান গুনছে প্রতিবছর।

কাউখালী প্রতিনিধি:

দক্ষ জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ধুঁকছে কাউখালীতে অবস্থিত পার্বত্য অঞ্চলের একমাত্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান রাঙ্গামাটি টেক্সটাইল মিল। অকেঁজো অবস্থায় পড়ে আছে ২২টি মেশিন, আবাসিক ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন  ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করছে শ্রমিকরা। এমন পরিস্থিতিতে বিস্তর সমস্যা মাথায় নিয়ে মিল চালাতে গিয়ে প্রতিবছর লোকসান গুনছে প্রতিষ্ঠানটি।

জানাযায়, স্বাধীনতা পরবর্তী পার্বত্য অঞ্চলের বেকারত্ব কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ১৯৭৭ সালে কাউখালীর ঘাগড়ায় ২৬.২৪ একর জমির উপর স্থাপিত হয় পার্বত্য অঞ্চলের প্রথম এবং একমাত্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান রাঙ্গামাটি টেক্সটাইল মিল। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণে চালু হওয়া প্রতিষ্ঠানে যুক্ত করা হয় ২৯টি সুতার কল। স্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয় প্রায় সাড়ে ৪’শ শ্রমিক এবং ৬০ কর্মকর্তা কর্মচারী। মিলে তৎসময়ে প্রতি অর্থবছরে উৎপাদন হতো প্রায় ১২ লক্ষ কেজি সুতা। বাজারে সুতার চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৯৭ সালে মিলে যুক্ত করা হয় আরো ১৪টি সুতার কল। বাড়ানো হয় শ্রমিক সংখ্যাও।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে লোকসান গুনতে থাকায় ৯৭ সালে শ্রমিকদের স্থায়ী নিয়োগ বাতিল করে বিটিএমসি। কাজ নেই মুজুরী নেই এমন শর্তে সার্ভিস চার্জের ভিত্তিতে মিল চালানোর ঘোষণা দেয়ায় শুরু হয় শ্রমিক আন্দোলন। মিলে কর্মকর্তা কর্মচারীদের দূর্ণীতি, অব্যবস্থাপনা ও শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ২০০৮ সালের এপ্রিলে হঠাৎ কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে বিটিএমসি।

দীর্ঘ আট বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৫ সালের ২৯ এপ্রিল পূণরায় মিলটি চালু করে বিটিএমসি। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় ৪৩ মেশিনের মধ্যে প্রায় ২২টি মেশিনই একরকম নষ্ট হয়েগেছে। অবশিষ্ট ২১টি পুরাতন মেশিন নিয়ে একরকম খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে মিলটি। বর্তমানে মিলে ১২৯জন শ্রমিক রয়েছে। কাজ নেই মুজুরী নেই এমন শর্তে কাজ করছে এসব শ্রমিক। কেটাগরি হারে দৈনিক ১২০ থেকে ১৮০ পর্যন্ত মুজুরীতে কাজ করা শ্রমিকরা। দীর্ঘদিন শ্রমিকদের আন্দোলনের মূখে অবশেষে মাথাপিছু ১০ টাকা হারে মুজুরী বৃদ্ধি করে বিটিএমসি। যা শ্রমিকদের সাথে ঠাট্টা হিসেবে মন্তব্য করেন সমিতির সভাপতি অরুন বিকাশ চাকমা।

বর্তমানে ৩জন কর্মকর্তা ও ২৯জন কর্মচারী দিয়ে চলা মিলে প্রতি বছর উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৪ লাখ ৫ হাজার কেজি সুতা। অর্থাৎ কোন প্রতিবন্ধকতা না থাকলে প্রতিদিন দৈনিক গড়ে ৪ বেল সুতা উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন মিলটির ব্যবস্থাপক মো. নুরুল ইসলাম। তাতেও লাভের মুখ দেখছেন না মিল কর্তৃপক্ষ। উৎপাদিত সুতা প্রতি বেল ৭,৮০০ টাকায় বিক্রি হয় বাজারে। কিন্তু উৎপাদিত সুতা তৈরি করতে খরচ হচ্ছে প্রায় ১৪ হাজার টাকা। অবশিষ্ট ঘাটতি পুরণ করতে প্রতি বছর দেয়া হচ্ছে ভুর্তুকি।

মিলকে লাভের মুখ দেখাতে হলে বাড়াতে হবে সার্ভিস চার্জ, পরিবর্তন করতে হবে মান্দাত্মার আমলে যন্ত্রপাতি। এমন কথা জানালেন মিলের হিসাব রক্ষক মো. মাহবুব হোসাইন। তিনি জানান, একটি নতুন আধুনিক মেশিন দৈনিক গড়ে যেখানে ৩০ হাজার আরপিএম রান করে থাকে। সেখানে বর্তমানে যে মেশিন রয়েছে তা দিয়ে দৈনিক সর্বোচ্চ ৯ হাজার আরপিএম বেশি রান করানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কোন ক্রমেই উঠে দাঁড়াতে পারছেনা প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়াও রয়েছে বিদ্যুৎ সমস্যা। মিলে সহকারী ব্যবস্থাপক অমর বিকাশ চাকমা জানান, ক্রমহারে লোকসান দেয়া মিল কেবল ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ৭১০ ঘন্টা বিদ্যুৎবিহীন ছিল। শুধু বিদ্যুতের কারণে বছর ক্ষতি প্রায় দশ লক্ষাধিক টাকা।

এছাড়া ৪০ বছর আগে তৈরি হওয়া মিলের ভিতরে অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে। ছাদ থেকে পানি চুষে পড়ছে মেশিনগুলোর উপর। এসব মেশিন রক্ষা করতে ব্যবহার করা হচ্ছে পলিথিন।

মিলের ভিতরে ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি মেশিনের উপর টাঙ্গানো আছে কালো পলিথিন। টানা বৃষ্টিতে মেশিন রক্ষা করতে বন্ধ রাখতে হচ্ছে কাজ। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় প্রতিদিন কাজ করছে শতাধিক শ্রমিক।

কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য গড়া আবাসিক এলাকা যেন ভুতরে নগরী। চতুর্দিকে ময়লা আবর্জনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। জঙ্গল হয়ে আছে আশপাশের পুরো এলাকা। আবাসিক ভবনের ছাদ নষ্ট হয়ে পানি পড়ছে প্রতিটা কক্ষে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করছে মিলের কর্মকর্তা কর্মচারীরা। এসব মেরামতের তেমন উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্টদের।

এব্যাপারে কথা হয় মিলের ব্যবস্থাপক (কারিগরি) ও মিল ইনচার্জ মো. নুরুল ইসলামের সাথে। তিনি জানান, মিলকে লাভজনক করতে হলে সার্ভিস চার্জ বৃদ্ধি ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজনের মাধ্যমে দক্ষ শ্রমিক নিয়োগ দিতে হবে। তিনি জানান, শ্রমিকদের মুজুরী কম হওয়ায় দক্ষ শ্রমিকরা এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে চায় না। ফলে নতুন অদক্ষ শ্রমিক দ্বারা মিলের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। যার দরুন লাভের পরিবর্তে লোকসানের পাল্লাটাই ভারী হচ্ছে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *