অসহযোগ আন্দোলনে সরকার যে ভাষায় বাধা দেবে সে ভাষায় জবাব দেয়া হবে- সন্তু লারমা


15241367_1723467561304414_5839784441238540013_n
নিজস্ব প্রতিবেদক:
২ ডিসেম্বর ২০১৬ সকাল ১০ টায় “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী সকল ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ জোরদার করুন” এ স্লোগানে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ১৯ তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি কর্তৃক ঢাকার সুন্দরবন হোটেলে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার বিভাগের সদস্য দীপায়ন খীসার সঞ্চালনায় এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার সভাপতিত্বে সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক, শক্তিপদ ত্রিপুরা।
বক্তব্য রাখেন ঐক্যন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া, ওয়ার্কাস পার্টির পলিট ব্যুারোর সদস্য নূর আহমেদ বকুল, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের সদস্য ব্যারিষ্টার সারা হোসেন, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মেজবাহ কামাল ও অধ্যাপক সৌরভ শিকদার, বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সিমন চিসাম, এডভোকেট প্রকাশ বিশ্বাস প্রমুখ। এছাড়াও সভায় উপস্থিত ছিলেন নাগরিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ এবং  বিভিন্ন  প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির ১৯ বছর অতিক্রান্ত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কার্যাবলী হস্তান্তর, পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ; অপারেশন উত্তরণ’সহ অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার; ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিকরণ, ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ উদ্ভাস্তদের স্ব স্ব জায়গা-জমি প্রত্যর্পণসহ পুনর্বাসন; পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল চাকুরিতে জুম্মদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়োগ, চুক্তির সাথে সঙ্গতি বিধানকল্পে পুলিশ এ্যাক্ট, পুলিশ রেগুলেশন ও ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রযোজ্য অন্যান্য আইন সংশোধন; সেটেলার বাঙালীদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনক পুনর্বাসন ইত্যাদি চুক্তির মৌলিক বিষয়সমূহ এখনো অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে। বক্তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে একটি জাতীয় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে জাতীয়ভাবেই সমাধান করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা আক্ষেপের সুরে বলেন, ১৯ বছর আগের যে অনুভূতি সেই অনুভূতির সাথে আজকের অনুভূতির যোজন যোজন পার্থক্য অনুভূত হচ্ছে। সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ক্রোড়পত্রে অধিকাংশই মিথ্যার বুলি আউরানো হয়েছে বলে তিনি দাবী করেন।
তিনি বলেন, ৪৬ বছর আগে বঙ্গবন্ধুর সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের যে অবস্থা ছিল তা ২০১৬ তে এসে আরো খারাপ হয়েছে। ৪৬ বছর ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে অলিখিত সেনাশাসন চলছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি শাসকগোষ্ঠীকে সতর্ক করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ নতুন করে জেগেছে। সরকার যদি এখনো জুম্ম জনগোষ্ঠীকে ঘুমিয়ে আছে মনে করে তবে ভুল করবে।
তিনি পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি কর্তৃক ঘোষিত অসহযোগ আন্দোলনে ১০ দফা কর্মসূচীতে সরকার যে ভাষায় বাধা দেবে সে ভাষায় জবাব দেওয়া হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
ঐক্যন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য্য পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে একটি রাজনৈতিক সমস্যা বলে উল্লেখ করে বলেন, রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করতে হবে। সরকারের কলুষিত মনোভাবের নিন্দা করে তিনি বলেন, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য কাজ না করে চুক্তিবিরোধী  তথাকথিত সমঅধিকার, হেফাজত ইসলামকে সমর্থন দিয়ে চলেছে। তিনি আজকের সমাবেশকে জাতীয় প্রতারণা, মিথ্যাচার বিরোধী সমাবেশ বলেও উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, যে দিনটি অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণ করে পালন করার কথা ছিল সেই দিনটি পালন করতে হচ্ছে বেদনাহত মন নিয়ে। এর জন্য সরকারের কথা দিয়ে কথা না রাখার কলুষিত চরিত্রকে  দায়ী করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্দোলন সেখানকার স্থায়ী সকল জুম্ম আদিবাসী, বাঙালী জাতিগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য করা হয়েছিল বিধায় এ আন্দোলন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, সরকারের দোয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগোষ্ঠীর রক্তঝরা সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে সরকারকে বাধ্য করা হয়েছিল চুক্তিতে উপনিত হওয়ার জন্য। সরকারের থেকে বিভিন্ন সময় ৪৮ টির অধিক ধারা বাস্তবায়নের যে মিথ্যা প্রচার তিনি তার নিন্দা জানান এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগোষ্ঠীকে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে ষড়যন্ত্রকারী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বর্ষপূর্তি পালন করছে চুক্তির এক পক্ষকে উপেক্ষা করে। সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়নের নামে প্রহসন করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অধ্যাপক মেজবাহ কামাল বলেন,  এটা স্পষ্টত যে, সরকার পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে প্রতারণা করছে। সরকারের সদিচ্ছার অভাবে চুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছেনা। দীর্ঘ ১৯ বছর অতিবাহিত হয়েছে। সামনের বছর দুই দশক পূর্ণ হবে। অথচ সরকার এখনো তারা বলছে চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঝখানে তারা সময় পাইনি। বিএনপি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাদ দিলে দীর্ঘ ১৫ বছর এই সরকার ক্ষমতায় ছিল। তাহলে ১৫ বছর কি কম সময়। আর কত বছর লাগবে?
অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের উপনিবেশে পরিণত করে জাতিগত নিপীড়নের মধ্যে দিয়ে জাতিগত নিধনের সাথে ইসলামীকরণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সংগ্রামকে কখনো অস্ত্র দিয়ে দাবিয়ে রাখা যায়না। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগোষ্ঠীর এ যৌক্তিক রাজনৈতিক আন্দোলনকেও দমিয়ে রাখা যাবেনা।
বাংলাদেশ ওয়ার্কাস পার্টি, পলিট ব্যুরোর সদস্য নূর আহমেদ বকুল বলেন, ধর্মনীরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র এ চার নীতির ভিত্তিতে যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল তা আজ ভুলন্থিত। ধর্মনীরপেক্ষতার নামে ইসলামীকরণ, গণতন্ত্রের ভোটের রাজনীতি, জাতীয়তবাদের নামে উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদ এবং সমাজতন্ত্রের নামে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েক করা হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের সদস্য ব্যারিষ্টার সারা হোসেন বলেন, পার্বত্য চুক্তিকে বানচাল করার ষড়যন্ত্র হিসেবে পার্বত্য চুক্তির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। যে ভিত্তিতে মামলা করা হয়েছিল তা ভিত্তিহীন বলেও উল্লেখ করেন। তিনি আরো বলেন সরকারের চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা নিয়ে যেখানে চুক্তি বাস্তবায়নে কাজ করার কথা, সেই যায়গায় চুক্তি বাস্তবায়ন না করে কালক্ষেপন করা অত্যন্ত দু:খজনক।
স্বাগত বক্তব্যে শক্তিপদ ত্রিপুরা বলেন, চুক্তি মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়িত না হওয়ার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম আদিবাসীরা এখনো প্রতিনিয়ত শাসক গোষ্ঠী কর্তৃক নিপীড়ন, নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। চুক্তির ধারাগুলোকে উপেক্ষা করে এখনো পার্বত্য চট্টগ্রামে অলিখিত সেনাশাসন বিরাজ করছে। এমতাবস্থায় যে কোন সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম আবারো অশান্ত হয়ে উঠতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সেক্ষেত্রে সরকারকেই সব দায়িত্ব নিতে হবে বলেও তিনি ঘোষণা করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *