অসংখ্য রোহিঙ্গার জীবন বাঁচিয়েছে তাদের বহন করে আনা সোলার প্যানেল!



ডেস্ক প্রতিবেদন:
আগস্টের শেষের দিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আগমন শুরু হয়। রাখাইন থেকে পালানোর সময় অনেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি জিনিস নিয়ে আসে- ছোট সোলার প্যানেল। বাংলাদেশের স্থানীয়রা রোহিঙ্গাদের এই ছোট ছোট সোলার প্যানেল নিয়ে আসতে দেখে অনেকটা হতচকিতই হয়েছিল। নিজের প্রাণ বাঁচাতে জন্মভূমি ছেড়ে আসা রোহিঙ্গারা এতকিছু থাকতে সোলার প্যানেল নিয়ে কেন পালাবে এ প্রশ্ন জেগে উঠে অনেকের মনে।

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার এক চা-স্টলের মালিল জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা তাদেরকে সোলার প্যানেল নিয়ে আসতে দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। এরকম পরিস্থিতিতে আমি কখনোই এমন কিছু করতাম না।’ রোহিঙ্গা ঢলের সময় উখিয়ায় নিযুক্ত সরকারী কর্মকর্তা মইন উদ্দিন বলেন, ‘সীমান্তের ওপারে গুলি চালানোর আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। স্থলবোমা পেতে রাখার খবর পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু এসব সত্তেও তারা সোলার প্যানেল নিয়ে আসছিল।’ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে রোহিঙ্গাদের সোলার প্যানেল নিয়ে পালানোর পেছনের গল্প।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসতে অনেক রোহিঙ্গার ৫ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত সময় লেগেছে। পায়ে হেঁটে পার করতে হয়েছে কখনো পাহাড়ি আবার কখনো জলমগ্ন রাস্তা। কিন্তু তবুও সোলার প্যানেল হাতছাড়া করেনি অনেকে। এ বিষয়ে আলোকপাত করে রোহিঙ্গা আয়াতুল্লাহ বলেন(১৮), ‘এই সোলার প্যানেল আমার জীবন বাঁচিয়েছে।’ তিনি জানান, মিয়ানমার থেকে পালানোর সময় তাকে সতর্ক থাকতে হয়েছে, যেন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সামনে না পড়তে হয়।

তিনি বলেন, ‘তারা যাকে সামনে পেয়েছে সবাইকে হত্যা করেছে। নিরাপদ রাস্তা ঠিক করতে আমাদের অন্যের দেয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। আর এজন্য একটা মুঠোফোনের দরকার ছিল। আমাদের ওই মুঠোফোন চার্জ দেয়ার জন্য এই সোলার প্যানেল দরকার ছিল।’

আয়াতুল্লাহ পূর্বে মিয়ানমারের মংডু পৌরসভার বাসিন্দা ছিলেন। বর্তমানে তার নিবাস বাংলাদেশের থাইংখালী শরণার্থী শিবির। আয়াতুল্লাহ জানান, তিনি রাখাইন থেকে শুধুমাত্র কিছু কাপড় আর এই সোলার প্যানেল নিয়ে পালান। তিনি বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, আমি আর কিছু নিতে না পারলেও আমাকে এই সোলার প্যানেলটি নিতেই হবে।’

উখিয়া’র বালুখালি ও থাইংখালী শিবিরের ৫০ জনের বেশি শরণার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে রয়টার্স। সেখানের বেশিরভাগ রোহিঙ্গাই সঙ্গে করে একটি করে ল্যাপটপের সমান দেখতে ব্যাটারি ভর্তি সোলার প্যানেল ও একটি ছোট লাইট নিয়ে এসেছে। যাতে করে মোবাইল চার্জ দেয়া যায় আর রাতে পাহাড়ি রাস্তায় হাটার সময় কিছু আলো পাওয়া যায়। অনেক শরণার্থী বলেছেন, তারা ভেবেছিলো যে সোলার প্যানেলগুলো বাংলাদেশে আসার পরে এখানে থাকতে হলেও কাজে লাগবে। এমন একজন হচ্ছেন ৪৫ বছর বয়সী রাশিদা বেগম। মিয়ানমারের নাপুরা গ্রাম থেকে তিন ছেলে, তিন মেয়ে ও একটি সলার প্যানেল নিয়ে পাঁচদিন হেটে বাংলাদেশে পৌঁছান তিনি। সঙ্গে আর কিছুই নিয়ে আসেননি। তিনি বলেন, ‘সোলার প্যানেলটি জঙ্গলে রাত কাটানোর সময় আমাদের অনেক সাহায্য করেছে। এটি ছাড়া, আমরা হয়তো বাংলাদেশেই পৌঁছাতে পারতামনা।’ তিনি আরো বলেন, ‘এটা বহন করা আমার জন্য বেশ কষ্টসাধ্য কাজ ছিল। তবে এটা আমার কাজে আসবে এমনটা ভেবেই আমি এটি নিয়ে আসি।’

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে কোন তার-ভিত্তিক বৈদ্যুতিক সংযোগ নেই। শরণার্থীরা রাতে আলোর প্রয়োজন মেটাতে সোলার প্যানেল, মোমবাতি ও কুপি ব্যাবহার করে থাকে। বাংলাদেশ সরকার শিবিরে ৫০০ সৌরশক্তি-চালিত সড়কবাতি ও বাসা-বাড়িতে ব্যবহারের উপযোগী এমন ২০০০ সোলার-প্যানেল সরবরাহ করেছে। এসবের পাশাপাশি পানি বিশুদ্ধিকরণের জন্যও সোলার প্যানেলের ব্যবহার করা হচ্ছে। একইভাবে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা সৌর-শক্তি ব্যবহার করে কুটুপালং ও বালুখালি শিবিরে শরণার্থীদের ২৪ ঘন্টা চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে।

সূত্র: মানবজমিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *